মানবতাবিরোধী অপরাধ : ২ জনের ফাঁসি ৩ জনের আমৃত্যু কারাদ-

0
27

নিজস্ব প্রতিবেদক: একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৌলভীবাজারের পাঁচ আসামির মধ্যে দুইজনকে ফাঁসি ও তিনজনকে আমৃত্যু কারাদ- দিয়েছে ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। গতকাল বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে এ আদেশ দেন চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. শাহীনুর ইসলামের নেতৃত্বাধীন তিন সদসের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। রায়ে বলা হয়, প্রসিকিউশনের আনা পাঁচ অভিযোগের সবগুলোই প্রমাণিত হয়েছে। মৃত্যুদ-ের দুই আসামির সাজা ফাঁসিতে ঝুলিয়ে কার্যকর করতে হবে। সেইসঙ্গে পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার করে সাজা কার্যকর করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের আইজিকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। মৃত্যুদ-প্রাপ্ত দুই আসামি হলেন মো. নেছার আলী ও ওজায়ের আহমেদ চৌধুরী। আমৃত্যু কারাদ- পেয়েছেন শামসুল হোসেন তরফদার, ইউনুস আহমেদ, মোবারক মিয়া। আসামিদের মধ্যে ইউনুস আহমেদ ও ওজায়ের আহমেদ চৌধুরী কারাগারে আছেন। বাকিরা পলাতক রয়েছেন। গত মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনাল এ মামলায় রায় ঘোষণার জন্য গতকাল বুধবার দিন ধার্য করেন। এদিন আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন, আবুল কালাম ও রেজিয়া সুলতানা চমন। আসামিদের পক্ষে ছিলেন রাষ্ট্রপক্ষে আইনজীবী গাজী এমএইচ তামিম। ২০১৬ সালের ৮ ডিসেম্বর মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার শামসুল হোসেন তরফদারসহ পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। তাঁদের বিরুদ্ধে হত্যা, গণহত্যা, আটক, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের পাঁচটি অভিযোগ গঠন করা হয়।  ২০১৬ সালের ২৬ মে এই পাঁচজনের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়। ২০১৪ সালের ১২ অক্টোবর আসামিদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে তদন্ত সংস্থা। গত বছরের ১৩ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলে ওই দিন বিকেলেই রাজনগর উপজেলার গয়াসপুর গ্রামের ওজায়ের আহমেদ চৌধুরীকে মৌলভীবাজার শহরের চৌমোহনা থেকে ও সোনাটিকি গ্রামের মৌলভি ইউনুস আহমেদকে তাঁর বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর ২০ জানুয়ারি তাদের বিরুদ্ধে তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।
কোন অপরাধে কী সাজা, ঘটনাস্থল, অভিযোগ, আসামি, সাজা-
অভিযোগ ১: মৌলভীবাজারের রাজনগর থানার বালিগাঁও গ্রাম
মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক  দানু মিয়াকে অপহরণ, আটকে রেখে নির্যাতন, হত্যা, বাড়িতে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ: সামছুল হোসেন তরফদার ওরফে আশরাফ, মো. নেছার আলী, ইউনুছ আহমেদ, উজের আহমেদ চৌধুরী ও মোবারক মিয়া, সবার আমৃত্যু কারাদ-
অভিযোগ ২: ফকিরতোলা ও রাজাপুর গ্রাম, ডা. যামিনী মোহনকে অপহরণ, আটকে রেখে নির্যাতন ও হত্যা; বাড়িতে লুটপাট, নেছার, ইউনুছ ও উজের সবার আমৃত্যু কারাদ-।
অভিযোগ ৩: রাজনগর থানার উত্তরবাগ গ্রাম, তিনজনকে তুলে নিয়ে আটকে রেখে নির্যাতন; বাড়িতে লুটপাট, নেছার, ইউনুছ ও উজের, ইউনুছ খালাস। বাকি দুজনের ৫ বছরের সাজা।
অভিযোগ ৪: নয়াটিলা গ্রাম, নোজাবত আলী ও আবদুল বাসিতকে অপহরণ, আটকে রেখে নির্যাতন ও হত্যা; বাড়িতে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, সামছুল, নেছার, ইউনুছ, উজের ও মোবারক, সবার আমৃত্যু কারাদ-।
অভিযোগ ৫: নয়াটিলা গ্রাম, কয়েক ডজন হিন্দু বাড়িতে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, মন্দির ভাংচুর, আটকে রেখে নির্যাতন ও গণহত্যা, সামছুল, নেছার, ইউনুছ, উজের ও মোবারক, নেছার ও উজেরের মৃত্যুদ-, বাকিদের আমৃত্যু সাজা। গতকাল বুধবার বেলা সাড়ে ১০টার আদালত বসার পর মৌলভীবাজারের পাঁচ আসামির রায়ের কার্যক্রম শুরু হয়। গ্রেপ্তার দুই আসামিকে তার আগেই কারাগার থেকে আদালতে নিয়ে আসা হয়। তিন সদস্যের এ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি শাহিনুর ইসলাম প্রারম্ভিক বক্তব্যে জানান, এ মামলায় তারা যে রায় দিচ্ছেন, তা ২০২ পৃষ্ঠার। পরে ট্রাইব্যুনালের বিচারক আবু আহমেদ জমাদার রায়ের সার সংক্ষেপের প্রথম অংশ পড়া শুরু করেন। বিচারপতি আমির হোসেন পড়েন রায়ের দ্বিতীয় অংশ। সবশেষে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান সাজা ঘোষণা করেন। রায়ের পর আসামি ইউনুছ আহমেদ ও  উজের আহমেদ চৌধুরীকে আদালত থেকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।
মামলার ইতিবৃত্ত: ২০১৪ সালের ১২ অক্টোবর ওই পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরুর পর ২০১৬ সালের ২৬ মে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। সেখানে বলা হয়, আসামিদের মধ্যে সামছুল হোসেন তরফদার একাত্তরে আল-বদর বাহিনীর এবং নেছার আলী রাজাকার বাহিনীর স্থানীয় কমান্ডার ছিলেন। বাকি তিনজন রাজাকার বাহিনীর সদস্য হিসেবে বিভিন্ন যুদ্ধাপরাধে লিপ্ত হন।
প্রসিকিউশনের আবেদনে ২০১৬ সালের ১৩ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। ওইদিন বিকালেই রাজনগর উপজেলার গয়াসপুর গ্রামের উজের আহমেদ চৌধুরীকে মৌলভীবাজার শহরের চৌমোহনা থেকে ও ইউনুছ আহমদকে তার সোনাটিকি গ্রামের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।একই বছর ৮ ডিসেম্বর আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরু করে। ২০১৭ সালের ১৫ জানুয়ারি শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ। আদালতে এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন ও তাপস কান্তি বল; আর ইউনুছের পক্ষে আইনজীবী আবদুস সোবহান তরফদার ও ওজায়েরের পক্ষে আইনজীবী মুজাহিদুল ইসলাম।দুই পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে গত বছরের ২০ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল মামলাটির রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখে। এরপর মঙ্গলবার জানানো হয়, বুধবার ঘোষণা করা হবে এ মামলার রায়।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here