আমাদের ঐতিহ্য-সংস্কৃতিকে যথাযথ মর্যাদা দিতে হবে

0
72

নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রধানমন্ত্রী  শেখ হাসিনা আমাদের  গৌরবময় ইতিহাস ও কৃষ্টিকে  কেউ  যেন ভুলে না যায়  সেজন্য তা সংরক্ষণ এবং মর্যাদা  দেয়ার আহবান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা একটা জাতি, বাঙালি জাতি, আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি- আমাদের  গৌরবের অনেক কিছু রয়েছে,  সেই সব আমাদের সংরক্ষণ করতে হবে। আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি-সেগুলি  কেউ  যেন ভুলে না যায়  সেজন্য এর যথাযথ মর্যাদাও আমাদের দিতে হবে।’আগামী প্রজন্মের জন্য এগুলো প্রচার ও সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা গতকাল মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে রাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা একুশে পদক বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে একথা বলেন। সরকার প্রধান বলেন, জাতির পিতার  যে আন্দোলন- সংগ্রাম ছিল তা ছিল জাতি হিসেবে আমাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক মুক্তির জন্য। তিনি বলেন, রাজনৈতিক অধিকার অর্জনের মধ্যদিয়েই আমরা অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করতে পারি। আর আমাদের সংস্কৃতি চর্চার  ক্ষেত্র প্রসারিত হতে পারে। কাজেই আমরা জাতির পিতার আদর্শ নিয়েই সবসময় এগিয়ে  যেতে চাই। বাংলাদেশকে আমরা গড়ে তুলতে চাই বিশ্ব দরবারে একটা মর্যাদাপূর্ণ  দেশ হিসেবে।
প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে ২১ জন  দেশ বরেণ্য ব্যক্তিকে বিভিন্ন  ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ একুশে পদক-২০১৮ প্রদান করেন।
পুরস্কার হিসেবে প্রধানমন্ত্রী পদক বিজয়ীদের হাতে  সোনার  মেডেল, সম্মাননা পত্র এবং ২ লাখ টাকার  চেক তুলে  দেন। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর অনুষ্ঠানে সভাপত্বি করেন। মন্ত্রী পরিষদ সচিব  মো. শফিউল আলম পদক বিতরণ অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন এবং পদক বিজয়ীদের সংক্ষিপ্ত জীবন বৃত্তান্ত পাঠ করেন। এছাড়া সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ইব্রাহিম হোসেইন খান অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন।অনুষ্ঠানে মন্ত্রী পরিষদ সদস্যগণ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাগণ, জাতীয় সংসদের সদস্যবৃন্দ, বিচারপতিগণ, পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও অধ্যাপকবৃন্দ, রাজনিতিবিদ, কূটনিতিক, কবি, সাহিত্যিক,  লেখক, সাংবাদিকসহ আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
শেখ হাসিনা বলেন,  যে বাংলাদেশ এক সময় ক্ষুধা ও দারিদ্রে জর্জারিত ছিল। আজকে আমাদের প্রচেষ্টায় আমরা তা  থেকে মুক্তি  পেয়েছি। তিনি বলেন,  যে জাতি রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা আনতে পারে তারা কারো কাছে ভিক্ষা করে চলবে না। বিশ্ব দরবারে সম্মানের সাথে মাথা উঁচু করে চলবে।  সেটাই আমরা প্রতিষ্ঠা করতে চাই। আর  সেই  চেষ্টাটাই আমরা করে যাচ্ছি। তিনি এ সময় আমাদের জাতীয় উৎসব পহেলা বৈশাখ উদযাপনে  দেশবাসীর জন্য তাঁর সরকারের ভাতা প্রদানের প্রসঙ্গও উল্লেখ করে বলেন, আমাদের প্রত্যেকটি অর্জনের  পেছনেই কিন্তুু রক্ত দিতে হয়েছে, অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। কিছুই এমনি এমনি হয় নাই।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলা ১৪শ’ সাল উদযাপনের সময় তৎকালিন ক্ষমতাসীন বিএনপি  সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে উদযাপনের অনুমতি না দিয়ে পুলিশি  ঘেরাও দিয়ে রাখে। অথচ, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলে মিলে এই একটি দিন আমরা উদযাপন করি। সেই ব্যারিকেড  ভেঙ্গে প্রয়াত কবি সুফিয়া কামালকে সঙ্গে নিয়ে ট্রাকের ওপর  সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে উৎসবের অনুষ্ঠান করার কথাও স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, পাকিস্তানের কাছ  থেকে আমরা আলাদা হয়ে স্বাধীনতা অর্জন করলেও ঐ পাকিস্তানীদের কিছু  প্রেতাত্মা এখনও এ মাটিতে রয়ে  গেছে যারা ঐ প্রভুদের ভুলতে পারে না।  যেজন্য আমাদের ঐতিহ্যের ওপর আঘাত আসে। ভাষার ওপর আঘাত আসে। রাজনৈতিক অধিকারের ওপর আঘাত আসে। বারবার আমাদেরকে সংগ্রাম করতে হয়। তবে, আজকে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে এবং এগিয়ে যাবে। অন্তত নিজস্ব প্রচেষ্টায় বিশ্বে আমরা  সেই মর্যাদাটা অর্জনে সক্ষম হয়েছি যাতে  কেউ আমাদের এখন আর করুণা করার সাহস পায় না,  সেই মর্যাদাটা ধরে  রেখেই আমাদের বিশ্ব সভায় এগিয়ে  যেতে হবে, বলেন প্রধানমন্ত্রী। সরকার প্রধান বলেন, আজকে যাঁদেরকে আমরা এখানে পুরস্কৃত করলাম, আপনারা লক্ষ্য করেছেন আমাদের শিল্প-সাহিত্য, কলা  থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে আমাদের অনেক রতœ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বাংলাদেশে।  সেগুলো শুধু খুঁজে নিয়ে আসা এবং মর্যাদা  দেওয়া। এই মর্যাদাটা  দেওয়া একারণে  যে, আমাদের আগামী প্রজন্মও  যেন আমাদের এই ঐতিহ্যগুলি ধরে রাখতে পারে। আমাদের সংস্কৃতিকে ধরে রাখতে পারে। আমাদের শিল্প-সাহিত্যকে ধরে রাখতে পারে, আমাদের কলা-কৌশলকে ধরে রাখতে পারে এবং তারা  যেন উৎসাহিত হয়। তিনি পদক বিজয়ীদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, আজকে যাঁরা একুশে পদক  পেলেন আমি তাঁদেরকে আমার শ্রদ্ধা ও আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। আগামীতে আমরা এভাবে আরো অনেককে মর্যাদা দিতে চাই।  যেহেতু এটা একুশে  ফেব্রুয়ারি তাই আমরা  বেছে ২১ জনকেই নিয়েছি। কিন্তুু আমরা জানি আমাদের আরো  যোগ্য অনেকেই আছেন। তিনি পর্যায়ক্রমিকভাবে তাঁদেরকেও এই মর্যাদা আমরা দিতে পরবেন বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে ১৯৫২’র মহান ২১  শে  ফেব্রুয়ারি ভাষার দাবিতে রফিক, সালাম, বরকতদের রাজপথ রঞ্জিত করার  গৌরবজ্জ্বল ইতিহাস স্মরণ করে এই আন্দোলন গড়ে  তোলার  পেছনে জাতির পিতার অনন্য অবদানের সংক্ষিপ্ত বর্ননা  দেন। তিনি বলেন, ভাষার দাবিতে বঙ্গবন্ধুর  নেতৃত্বে গঠিত রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ ‘বাংলা ভাষা দাবি’ দিবস পালনের  ঘোষণা  দেয়।  সেই  থেকেই প্রকৃতপক্ষে ভাষার দাবি রাজপথে গড়ায়। তিনি বলেন, ছাত্রলীগ ঐদিন ইডেন বিল্ডিং,  জেনারেল  পোস্ট অফিস এবং অন্যান্য জায়গায় ব্যাপক পিকেটিং করে। পুলিশ ছাত্রদের লাঠিচার্জ করে এবং বঙ্গবন্ধুসহ অনেক ছাত্রকে আটক করে। প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকারের প্রচেষ্টায় ইউনেস্কো কতৃর্ক একুশে  ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের ঘটনারও বৃত্তান্ত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘প্রায় কুড়ি বছর আগে প্রয়াত রফিকুল ইসলাম, আবদুস সালামসহ কয়েকজন প্রবাসী বাঙালির উদ্যোগে এবং ১৯৯৬-২০০১  মেয়াদের আওয়ামী লীগ সরকারের প্রচেষ্টায় ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো কর্তৃক একুশে  ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি  দেয়। আমাদের একুশ এভাবে পরিণত হয় পৃথিবীজোড়া মানুষের মাতৃভাষা দিবসে।’
অনুষ্ঠানের শুরুতে শিল্পকলা একাডেমীর শিল্পীদের সহযোগিতায় সমাবেত কন্ঠে জাতীয় সঙ্গীত এবং অমর একুশের গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো পরিবেশিত হয়’।
এবার যারা একুশে পদক পেয়েছেন তারা হলেন- ভাষা আন্দোলনে আ জ ম তকীয়ুল্লাহ (মরণোত্তর) ও অধ্যাপক মির্জা মাজহারুল ইসলাম। ভাষা আন্দোলনের জন্য এবার মরণোত্তর একুশে পদক পেয়েছেন ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক আ জ ম তকীয়ূল্লাহ। ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ছেলে তকীয়ূল্লাহ বাংলাদেশের বর্তমান বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রণেতা। তার মেয়ে শান্তা মারিয়া অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে বাবার পদক গ্রহণ করেন।  তকীয়ূল্লাহর সঙ্গে ভাষা আন্দোলনে এ বছর একুশে পদক পেয়েছেন অধ্যাপক মির্জা মাজহারুল ইসলাম। ১৯৪৭ সালে ভাষা আন্দোলনের সূচনা থেকেই এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন মাজহারুল ইসলাম । ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র প্রতিনিধি হিসাবে তিনি প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদে যুক্ত ছিলেন। ১৯৫২ সালের একুশ ফেব্রুয়ারি ছাত্র মিছিলে পুলিশের গুলির পর আহত অনেক ভাষাসৈনিককে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাও দিয়েছিলেন। সংগীতে অবদানের জন্য এবার একুশে পদক পেয়েছেন শেখ সাদী খান, যিনি সংগীত পরিচালক হিসাবে তিনবার ‘বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’ পেয়েছেন এর আগে।  একই বিভাগে একুশে পদক পেয়েছেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংগীত পরিচালক ও সুরকার সুজেয় শ্যাম, ইন্দ্র মোহন রাজবংশী, মো. খুরশীদ আলম ও মতিউল হক খান। ২০১৪ সালের ২৬ মার্চ জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে তার সংগীত পরিচালনায় লাখো কণ্ঠে জাতীয় সংগীত গাওয়ার রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। নৃত্যে এবার একুশে পদক পেয়েছেন  মীনু হক। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ১৭ বছর বয়সী মীনু হক ‘বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতালে’ সেবিকার ভূমিকা পালন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃত্যকলা বিভাগের কার্যক্রম চালুর ক্ষেত্রে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।  অভিনয়ে মরণোত্তর একুশে পদক পেয়েছেন অভিনেতা হুমায়ূন ফরীদি, যার অনুষ্ঠানিক নাম হুমায়ূন কামরুল ইসলাম। চার দশকের বেশি সময় মঞ্চ, টেলিভিশন নাটক ও চলচ্চিত্রে অভিনয় করা এই শিল্পীর পক্ষে তার মেয়ে শারারাত ইসলাম প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পদক গ্রহণ করেন।  নাট্যকলায় অবদানের জন্য নিখিল সেন, চারুকলায় কালিদাস কর্মকার এবং আলোকচিত্রে গোলাম মোস্তফা একুশে পদক পেয়েছেন। কালিদাস কর্মকার বাংলাদেশের সমকালীন চিত্রশিল্পে বিভিন্ন মাধ্যম ও আঙ্গিকের প্রবর্তন করেছেন। বাংলাদেশে তিনিই প্রথম মিশ্র মাধ্যম শিল্প, পরিবেশ শিল্প, স্থাপন শিল্প ও পারফরমেন্স শিল্পের সূচনা করেন।  গবেষণার জন্য এবার মরণোত্তর একুশে পদক পেয়েছেন ভাষাসৈনিক অধ্যাপক জুলেখা হক। তার মেয়ে তুষা হক প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পদক গ্রহণ করেন।  সাংবাদিকতায় এবারের একুশে পদক পাওয়া রণেশ মৈত্র একাধারে সাংবাদিক, আইনজীবী, রাজনীতিবিদ, লেখক ও সংগঠক। ১৯৫৪ সাল থেকে তিনি বিভিন্ন মেয়াদে মোট দশবার কারারুদ্ধ হয়েছেন। কারাগারেই তিনি বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে আসেন। রণেশ মৈত্র দেশের বাইরে থাকায় তার পক্ষে পদক গ্রহণ করেন তার ছেলে প্রলয় মৈত্র। সমাজসেবায় এ বছর একুশে পদক পেয়েছেন অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চন। ১৯৯৩ সালের ২২ অক্টোবর স্ত্রী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার পর তিনি শুরু করেন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন। ২৪ বছরে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে তিনি সচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করেছেন। পাঁচশর বেশি এসএসসি পাস বেকার যুবককে বিনামূল্যে গাড়ি চালনার প্রশিক্ষণ দিয়েছে তার সংগঠন।  অর্থনীতিতে ড. মইনুল ইসলাম, ভাষা ও সাহিত্যে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ও কবি হায়াৎ সাইফ , সুব্রত বড়ুয়া, রবিউল হুসাইন এবং প্রয়াত খালেকদাদ চৌধুরীর পক্ষে তার ছেলে হায়দারদাদ চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পদক গ্রহণ করেন।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here