লাশকাটা ঘরে জীবনানন্দ

0
209

তাপস রায়
জীবনানন্দ দাশ সেই মায়ের সন্তান, যিনি লিখেছেন:
‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে,
কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।’
আমাদের দেশের প্রতিটি সন্তান কথায় নয়, কাজের মধ্য দিয়ে তার মনুষ্যত্ব ফুটিয়ে তুলুক, বড় হোক- এই ছিল কবি কুসুমকুমারী দাশের মনোবাসনা। মায়ের বাসনা পূর্ণ হয়েছে ছেলে জীবনানন্দ দাশের কাব্যকর্মে। নিভৃতচারী এই কবি রবীন্দ্রপ্রভাব কাটিয়ে উঠে আপন প্রতিভার স্ফূরণ ঘটিয়ে আধুনিক কাব্যধারা নির্মাণ করে মায়ের কবিতাটিকেই যেন স্বীকৃতি দিয়ে গেলেন।
জীবনানন্দ দাশের জন্ম বরিশালে; ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। সেখানেই কেটেছে শিক্ষাজীবনের অনেকটা সময়। বরিশালের ব্রজমোহন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জগদীশ মুখোপাধ্যায় মুগ্ধ হয়েছিলেন বালক জীবনানন্দের বিদ্যানুরাগে। দেবী সরস্বতীও দিয়েছিলেন বরমাল্য। একটি বাদে জীবনের প্রতিটি পরীক্ষায় কবি প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছেন। শুধুমাত্র কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২১ সালে যেবার তিনি এমএ পরীক্ষা দেন, সেবার ডিসেন্ট্রির কারণে শয্যাশায়ী ছিলেন। ফলে প্রথম বিভাগটা ফসকে যায়। এ নিয়ে তার মনোকষ্ট ছিল।
সিটি কলেজে অধ্যাপনা দিয়ে জীবনানন্দ দাশের কর্মজীবন শুরু হয়। কিন্তু এই জীবন তাকে স্বস্তি দেয়নি। আজ আমরা অনেকেই জানি, বেকারত্বের দুর্বহ কষ্ট, নিদারুণ দারিদ্র্য, উদ্বাস্তু জীবনের যন্ত্রণা, এমনকি দাম্পত্য নিয়েও কবিকে অসহায়, বিমর্ষ, যাতনাময় এক জীবন পাড়ি দিতে হয়েছে। একটু ভদ্রভাবে জীবন কাটানোর আশায়, একটি কাজের সন্ধানে ঘুরতে হয়েছে দ্বারে দ্বারে। অথচ ততদিনে কবির বেশ কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়ে গেছে। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যময় নিসর্গ তার কাব্যে হয়ে উঠেছে চিত্ররূপময়। বিশেষ করে ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যগ্রন্থে যেভাবে আবহমান বাংলার অনুসূক্ষ্ণ সৌন্দর্য প্রকাশিত হয়েছে, তাতে তিনি ‘রূপসী বাংলার কবি’ হিসেবে খ্যাত হয়েছেন। কিন্তু এই কবিখ্যাতি বা পাঠকপ্রিয়তা মৃত্যুর মাত্র কয়েক বছর আগে থেকে পেতে শুরু করেন। ভাগ্যদেবী যেন এ সময় সকল পরীক্ষা শেষে তার দিকে মুখ তুলে তাকিয়েছিল।
জীবনানন্দ দাশের বিশাল রচনাসম্ভারের বেশিরভাগই আবিষ্কৃত হয় তার মৃত্যুর পর। আজ এ কথা ভেবে অবাক হতে হয়, জীবিতকালে কবি তার রচনা সম্পর্কে এতটাই নিস্পৃহ ছিলেন বা সংশয়ে ছিলেন যে সেগুলো প্রকাশ করার কোনো তাগিদ বোধ করেননি। এমনকি অর্থকষ্টে দিন কাটানোর পরও উপন্যাস লিখে সেগুলো বাক্সবন্দি করে রেখে দিয়েছিলেন। যদিও এ প্রসঙ্গে তিনি সাগরময় ঘোষের সঙ্গে দেখা করে কথা বলেছিলেন। ‘দেশ’ সম্পাদক কবির উপন্যাস প্রকাশে রাজিও হয়েছিলেন। তারপরও কবি কেন উপন্যাসটি প্রকাশের জন্য পাঠাননি এ এক রহস্য বটে! ‘মাল্যবান’ শীর্ষক একটি উপন্যাস অনেক কাঠখড় পোড়ানোর পর আমরা প্রকাশিত হতে দেখি কবির মৃত্যুর উনিশ বছর পর। সে সময় উপন্যাসটি প্রকাশে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন কবিপতœী লাবণ্য দাশ স্বয়ং। অনেক পাঠক মনে করেন, উপন্যাসটি মূলত কবির আত্মজীবনী। মোটা দাগে এর মূল বিষয় মাঝবয়সী একজোড়া দম্পতির সম্পর্কের টানাপোড়েন। যা অনেকটাই কবির দাম্পত্যজীবনের সঙ্গে মিলে যায়।
জীবনানন্দ-পাঠকের কাছে কবির দাম্পত্যজীবন যেমন কৌতূহলের উদ্রেক করে, তেমনি তার মৃত্যু জন্ম দেয় নানা প্রশ্নের। সেদিনের ট্রাম দুর্ঘটনা কি হঠাৎ করেই ঘটে যাওয়া কোনো ভাগ্যলিখন, না কি মৃত্যুকে সেদিন স্বেচ্ছায় বরণ করা হয়েছিল? এ রহস্য আজও অমিমাংসিত। তবে কবিতাপ্রেমী পাঠক দুয়ে দুয়ে মিলিয়ে নেন কবির তখনকার দুরবস্থা, বঞ্চনাময় জীবন থেকে জন্ম নেয়া হতাশা, এমনকি কবিপতœীর জীবনযাপন দেখে। শোনা যায়, কবি যখন হাসপাতালে শেষশয্যায়, তখন লাবণ্য দাশ তাকে সময় দেননি। বস্তুত, কবি যেদিন মারা যান তার কয়েকদিন আগে থেকেই তিনি হাসপাতালে যাওয়া বন্ধ করে দেন। এমনকি মৃত্যুর সময় তিনি টালিগঞ্জে সিনেমার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। অথচ স্ত্রী স্বাধীনতার বিষয়ে, তার নাটক বা সিনেমার কাজে কবি কখনো বাধা হয়ে দাঁড়াননি। বরং সহায়তা করেছেন। এ প্রসঙ্গে ‘মানুষ জীবনানন্দ’ বইতে লাবণ্য দাশ লিখেছেন: ‘‘চলোর্মি’ ক্লাব থেকে রঙমহলে রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে বাইরে’ বইতে মেজ বউরানীর পার্ট কললাম, তখন বিরুদ্ধ সমালোচনা হয়েছিল বৈকি। কেউ কেউ এ মন্তব্যও করেছিলেন, ‘তুমি কি শেষে তোমার বউকে স্টেজে নামাবে নাকি?’ উত্তরে কবি বলেছিলেন, ‘আমি এখনো মরিনি। এ তো সামান্য একটা ক্লাব থেকে থিয়েটার। যদি তার ইচ্ছে থাকে সিনেমাতে অ্যাক্টিং করতে দিতেও আমার আপত্তি হবে না।’’
জীবনানন্দ দাশ স্ত্রীর সাজ-পোশাক, ইচ্ছেমতো চলাফেরায় কোনোদিনই বাধা দেননি। তবে তিনি স্বাভাবিকভাবেই স্ত্রীর ইচ্ছে অনুযায়ী চলেননি। তীব্র ব্যক্তিত্ববোধ এবং কবিসত্তা তা মেনে নেয়নি। কথাটি তিনি স্ত্রীকে স্পষ্টভাবে জানিয়েও রেখেছিলেন। সংসারের প্রতি কর্তব্যজ্ঞান থেকে কবি কখনো বিচ্যুত হননি। ‘কবি’ বলেই এ কথা বলার সুযোগ নেই, জীবনানন্দ সংসারের প্রতি দায়িত্বহীন ছিলেন। পরিবারের সদস্যদের ব্যথা-বেদনায় তিনি ব্যাকুল হতেন। স্ত্রী, সন্তানের সামান্য অসুখে বিচলিত হতেন। একবার কবিকন্যা মঞ্জুশ্রীর আমাশা হলো। কিছুতেই সারে না। ছোট্ট মঞ্জুশ্রী এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ল যে বিছানায় শুইয়ে রাখা যায় না। সে সময় কবি মেয়েকে কাঁধের ওপর শুইয়ে রেখে রাতের পর রাত ঘরের ভেতর পায়চারী করেছেন। এতটুকু ক্লান্তি বোধ করেননি। এই মেয়ের সঙ্গেই পরে কবির বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। কেননা সে বাবার কাছ থেকে কবিত্ব শক্তি নিয়েই জন্মেছিল। কবিতা লিখতে পারত। ফলে ঘরে বাবা ও মেয়ের কবিতা নিয়ে আড্ডা হতো প্রায়ই। সেই আড্ডায় স্ত্রী কেন যোগ দেন না, এ নিয়ে কবির মনে কিছুটা খেদ ছিল। একদিন তিনি বিরক্ত হয়ে স্ত্রীকে বলেছিলেনও সে কথা: ‘তোমার কেবল সংসার আর সংসার। তুমি কি কিছুতেই তার ওপরে উঠতে পার না? কোনোদিন দেখলাম না যে তুমি কবিতার আলোচনায় মুহূর্তের জন্যও যোগ দিয়েছ।’
লাবণ্য দাশ উত্তরে বলেছিলেন, ‘আমি কাব্য-জগতের ধার ধারি না। কবিতার চাইতে সংসারকেই বেশি ভালোবাসি।’ এখানেই ছিল স্বামী-স্ত্রীর বৈপরীত্য। একজন স্বভাবে লাজুক, অন্তর্মুখী। অন্যজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী, বহির্মুখী। একজনের কবিতাই ছিল ধ্যান-জ্ঞান। কবিতার জন্যই তিনি নীরবে তিক্ত জীবনযাপন করেছেন। অন্যজন চেয়েছেন আড়ম্বরপূর্ণ জীবন। সেই জীবনের খোঁজ জীবদ্দশায় জীবনানন্দ পাননি। স্ত্রী হিসেবে স্বামীর এই অক্ষমতাকে ব্যর্থতা হিসেবেই দেখেছেন লাবণ্য দাশ। উপরন্তু তিনি যথেষ্ট রূপবতী ছিলেন। যে কারণে তার মনে জন্মেছিল বঞ্চনাবোধ। তার অনেক কথাতেই এর সাক্ষ্য মেলে। ১৯৫৪ সালের ২২ অক্টোবর। কবির শবদেহ তখনও চিতায় ওঠেনি। সেদিনের এক বর্ণনায় ভূমেন্দ্র গুহ লিখেছেন: ‘লাবণ্য দাশ আমাকে ঝুল বারান্দার কাছে ডেকে নিয়ে গেলেন। বললেন, অচিন্ত্যবাবু এসেছেন, বুদ্ধবাবু এসেছেন, সজনীকান্ত এসেছেন, তা হলে তোমার দাদা নিশ্চয়ই বড় মাপের সাহিত্যিক ছিলেন; বাংলা সাহিত্যের জন্য তিনি অনেক কিছু রেখে গেলেন হয়তো, আমার জন্য কী রেখে গেলেন, বলো তো!’

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here