ট্রাফিক জ্যাম এবং পশ্চিমবঙ্গের অভিজ্ঞতা

0
11

হুটার বা হুইসেল আর রঙিন বাতি নিয়ে আমার একটি রিজার্ভেশন ছিল সবসময়। বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে মন্ত্রী আছেন, সচিব আছেন, বিচারক আছেন, সরকারি অন্যান্য বড় বড় সাহেব আছেন। নিজের চোখে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে রঙিন বাতি আর বিশেষ হুইসেলের অপব্যবহার এসব ভাগ্যবান মানুষগুলো বাংলাদেশে কিভাবে করছেন। পুলিশের এসব ঠেকানোর কোনো সুযোগ নেই। কেননা এসব করা হয় ভিআইপিদের দ্বারা। পুলিশের বড় সাহেবরাও এই নিয়ম ভাঙার দলে আছেন। ঢাকার রাস্তার ব্যস্ততা কাটাতে ভিআইপিদের দেখবেন হুইসেল বাজিয়ে উল্টোপথ দিয়ে দিব্যি চলে যাচ্ছেন।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়কে নিয়ে আমার ব্যক্তিগত কৌতূহলের শেষ নেই। কোলকাতা গেলেই তাকে নিয়ে নতুন কিছু জানতে চাই। ভদ্রমহিলার মধ্যে বিলাসিতার বিন্দুমাত্র চাহিদা নেই। বেতন তার লাগে না, ভালো শাড়ি লাগে না, গয়না-সাজগোজ তো দূরে থাক।  তো তিনি হঠাত্ আবিষ্কার করলেন, কোলকাতার ট্রাফিক জ্যামের অন্যতম একটি কারণ হুটার ও লালবাতি। নেতা-মন্ত্রী-আমলাদের গাড়িতে যেমন খুশি লালবাতির ব্যবহার ও হুটার বাজানো নিয়ে ব্যাপক ক্ষুব্ধ হলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়।
অবিলম্বে তা বন্ধ করতে তিনি কড়া নির্দেশ দিলেন। তিনি মানুষকে সরিয়ে রাস্তা করে দেওয়ার বিপক্ষে। তিনি নির্দেশ দিলেন, যাদের লালবাতি বা হুটার বাজানোর কথা নয়, তাদের গাড়ি থেকে ওসব খুলে ফেলতে। তিনি স্পষ্টভাবে বললেন, আমি নিজে ব্যস্ত রাস্তায় লালবাতি জ্বালিয়ে কিংবা হুইসেল বাজিয়ে চলি না। তাই অন্য কাউকে এটা করতে দিতে পারি না। মমতা শহরে সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেন না; লালবাতি কিংবা হুটারও ব্যবহার করেন না। জেলা সফরে গেলে সেক্ষেত্রে শুধু তিনি সরকারি গাড়ি ও চালক ব্যবহার করেন। কিন্তু সেখানেও তিনি হুইসেল ব্যবহার করেন না।
একেবারেই আমাদের পাশের মানুষ মমতা এবং কলকাতার জনগণ। ব্যস্ততার নগরী হিসেবে কলকাতাও বিখ্যাত। ঢাকার ব্যস্ততার তো তুলনাই নেই। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী যদি হুটার বাজানো আর লালবাতি জ্বালাতে নিষেধ করতে পারেন, তবে আমাদের দেশটি তা পারে না কেন? মেনে না নেওয়ার কোনো কারণ নেই যে, মন্ত্রী-এমপি-সরকারি আমলা-বিচারক এদের মতো ভিআইপিদের সময়ের দাম একটু বেশি। সাধারণ মানুষ কিংবা বেসরকারি ব্যবসায়ীদের সময়ের দাম তত বেশি নয়। কিন্তু তাই বলে সেই দাম দিতে গিয়ে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দিতে হবে! ভিআইপি কাতারে আজকাল নতুন নতুন মানুষ বেড়েই চলেছে। কার গাড়িতে পতাকা আছে, কার গাড়িতে রঙিন বাতি আছে, কার গাড়িতে হুটার আছেÍ এসব দেখতে দেখতে এবং তাদের পথ করে দিতে দিতে ট্রাফিক পুলিশ আর জনগণের দিকে তাকাতে সুযোগ পায় না আজকাল। তাই রাস্তায় বন্দী হওয়া মানুষগুলোকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়। সাধারণ মানুষের আগে যেতে না পারলে, সাধারণ মানুষকে পিছনে ফেলে বিশেষ কায়দায় পথ চলতে না পারলে যেন স্ট্যাটাস বজায় থাকে না অনেকের। চালক হয়তো বিনা কারণেই এবং ভিআইপি গাড়িতে না থাকলেও কিংবা ভিআইপির কোনো আত্মীয় গাড়িতে থাকলেও একইভাবে হুটার বাজিয়ে, ফ্লাশবাতি জ্বালিয়ে সাধারণ মানুষকে সরিয়ে রাস্তা বের করে চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশে এমন চিত্র একেবারেই অহরহ। যে গাড়ির ড্রাইভার যত বেশি স্মার্ট, সেই গাড়ি তত বেশি বেপরোয়া।
কলকাতা যা পারে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী যা পারেনÍ আমরা তা পারি না কেন? এত ট্রাফিক জ্যামের মধ্যে আমরা কি হুইসেল-হুটার কিংবা বিশেষ বাতি জ্বালানো সিস্টেমের বাইরে আসতে পারি না? যদি ব্যস্ত এবং ভিআইপি একজন ব্যবসায়ী রাস্তায় সাধারণ গতি মেনে নিয়ে চলতে পারেন, তবে সরকারি একজন কর্মকর্তা কিংবা মন্ত্রী-এমপিরা কেন সাধারণ মানুষের প্রতি সম্মান জানিয়ে রাস্তার গতি ফলো করতে পারবেন না? বিশেষ কাজে সময়ের স্বল্পতার কারণে বিশেষ ভিআইপিদের (রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি, স্পিকার, মন্ত্রী ইত্যাদি) আলাদা করে বিবেচনা করার সুযোগ থাকতেই পারে। তাদের সময় বাঁচানো রাষ্ট্রের জন্য এবং মানুষের জন্যই প্রয়োজন। কিন্তু অন্যদের বেলায়? তারা যে মানুষের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছেন একই কায়দায়। ভিড় দেখলেই তারা বাঁশি বাজিয়ে সবাইকে উপেক্ষা করে শোঁ শোঁ করে এগিয়ে যাচ্ছেন। বিনিময়ে উপহার দিয়ে যাচ্ছেন আরও ট্রাফিক জ্যাম। এই দল বাড়তে বাড়তে যেকোনো সরকারি অফিসের বা যেকোনো পদের কর্মকর্তাও সুযোগ নিয়ে নিচ্ছেন। ফলে সাধারণ মানুষ আরও অসহায় হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতিমধ্যে অনেক ক্ষেত্রে আশু পদক্ষেপ নিয়ে সামাজিক অনেক জটিলতার সমাধান করেছেন। হয়তো এই বিষয়টিও তাঁর মাথায় আছে। আশায় রইলাম, একদিন হয়তো এই কাজটি বাংলাদেশেও সম্ভব হবে।
লেখক : সাবেক সেনা কর্মকর্তা

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here