মুল্লুক চল দিবসে দেউন্দি বাগানে ‘মুল্লুক ভাস্কর্য’ উদ্বোধন

0
533

মোঃ মামুন চৌধুরী,হবিগঞ্জ: ২০ মে ছিল ঐতিহাসিক মুল্লুক চল দিবস। ১৯২১ সালের এই দিনে ব্রিটিশদের অত্যাচার থেকে মুক্ত হতে সিলেট অঞ্চলের প্রায় ৩৫ হাজার চা-শ্রমিক নিজেদের জন্মস্থানে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা চালায়। এ সময় চাঁদপুরের মেঘনাঘাটে ব্রিটিশ সৈন্যরা নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হাজার হাজার চা শ্রমিককে হত্যা করে। এরপর থেকে ২০ মে চা-শ্রমিকেরা ‘মুল্লুক চল দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছেন। তবে বারবার দাবি জানানো এবং অনেক আন্দোলনের পরও ৯৭ বছরেও স্বীকৃতি পায়নি দিবসটি। ঘুচেনি চা শ্রমিকদের বঞ্চনা।
এ দিবসে জেলার চুনারুঘাট উপজেলার দেউন্দি চা বাগানে প্রতীক মঞ্চের কাছে প্রতীক থিয়েটারের সহ-সভাপতি আমোদ মালের উদ্যোগে নির্মিত ‘মুল্লুক ভাস্কর্য’ উদ্বোধন করা হয়েছে।
প্রতীক থিয়েটারের আয়োজনে দিবসটি উপলক্ষে প্রথমে র‌্যালী বের হয়ে বাগান প্রদক্ষিণ করে। পরে প্রতীক মঞ্চে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
প্রতীক থিয়েটারের উপদেষ্টা গিয়াস উদ্দিনের সভাপতিত্বে ও থিয়েটার সভাপতি সুনীল বিশ্বাসের পরিচালনায় আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন, বিশিষ্ট লেখক কবি তাহমিনা বেগম গিনি, ঢাকার গণ-সঙ্গীত শিল্পী কপিল আহমেদ, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন(বাপা) জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল, নটরডেম কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপক পিউস নানোয়ার,  চা শ্রমিক ইউনিয়নের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল,  দৈনিক খোয়াই’র বার্তা সম্পাদক মঈন উদ্দিন আহমেদ, একাত্তর টিভি জেলা প্রতিনিধি শাকিল চৌধুরী, এসএ টিভি জেলা প্রতিনিধি আব্দুর রউফ সেলিম, দি বাংলাদেশ টুডে জেলা প্রতিনিধি মোঃ মামুন চৌধুরী, দি ডেইলি স্টার প্রতিনিধি মিন্টু দেশোয়ারা, চা শ্রমিক নেতা অবিরত বাকতী, বীরেন্দ্র কালিন্দী, বসুন্ধরা নাট্যগোষ্ঠীর সভাপতি সুবল মালাকার প্রমূখ।
আলোচনা সভার পূর্বে প্রতীক থিয়েটারের শিল্পীরা চা শ্রমিক দিবসের উপর সঙ্গীত পরিবেশন করেন। সন্ধ্যায় প্রতীক মঞ্চে নিজভূমে পরবাসী নাটক অনুষ্ঠিত হয়। এ অনুষ্ঠানে শত শত চা শ্রমিক অংশগ্রহণ করেন।
সভায় বক্তারা এ দিবসটিকে জাতীয় চা শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করার জন্য সরকারের প্রতি জোরালো দাবী জানান। সেই সাথে ‘মুল্লুক ভাস্কর্য’ নির্মাণ করায়  প্রতীক থিয়েটারের সহ-সভাপতি আমোদ মালের প্রশংসা করেন। বক্তারা বলেন, প্রতীক থিয়েটারের এ আয়োজন চা শ্রমিকদের সম্মানীত করেছে। এ থিয়েটার সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে  ৩২ বছর ধরে চা শ্রমিকদের অধিকার বাস্তবায়নে কাজ করছে।
প্রতীক থিয়েটার সভাপতি সুনীল বিশ্বাস জানান, চা শ্রমিকদের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে এদেশে এনে স্বল্প মজুরির মাধ্যমে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের কাজ করানো হয়। তাই শ্রমিকরা নিজ মুল্লুকে ফিরে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা সফল হয়নি। এখনও চা শ্রমিকরা বঞ্চিত আছে। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে চীন ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোথাও চায়ের প্রচলন ছিল না। ১৮৫৪ সালে পরীক্ষামূলকভাবে সিলেটের মালিনীছড়া চা বাগানে চা চাষ শুরু করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। সে সময় বৃহত্তর সিলেটে চা বাগান তৈরির জন্য ভারতের আসাম, উড়িষ্যা, বিহার, উত্তর প্রদেশসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিকদের নিয়ে আসা হয়।
‘গাছ হিলেগা, রুপিয়া মিলেগা’ এমন প্রলোভনে শ্রমিকরা বাংলাদেশে এলেও তাদের ভুল ভাঙতে বেশি সময় লাগেনি। বিশাল পাহাড় পরিস্কার করে চা বাগান করতে গিয়ে হিংস্্র পশুর কবলে পড়ে কত শ্রমিকের জীবন গেছে তার কোনো হিসাব নেই। এছাড়া ব্রিটিশদের অত্যাচার তো ছিলই।
তাদের অব্যাহত নির্যাতনের প্রতিবাদে তৎকালীন চা শ্রমিক নেতা পন্ডিত গঙ্গাচরণ দীক্ষিত ও পন্ডিত দেওসরন ‘মুল্লুকে চল’ (দেশে চল) আন্দোলনের ডাক দেন। ১৯২১ সালের ২০ মে সিলেট অঞ্চলের প্রায় ৩৫ হাজার চা শ্রমিক সিলেট থেকে হেঁটে চাঁদপুর মেঘনা স্টিমার ঘাটে পৌঁছেন। জাহাজে চড়ে নিজ দেশে ফিরে যেতে চাইলে মেঘনা ঘাটে আসাম রাইফেলসের গোর্খা সৈনিকরা নির্মমভাবে চা শ্রমিকদের হত্যা করে মেঘনা নদীতে ভাসিয়ে দেয়। এর পর যারা বেঁচে ছিলেন তারা নিরুপায় হয়ে আবারও বাগানে চলে আসেন। তবে চা শ্রমিকরা যাতে ট্রেনে না চলতে পারেন তার জন্য সহজ-সরল শ্রমিকদের বাগানের নামাঙ্কিত একটি করে ট্যাগ দেওয়া হয়। সেই ট্যাগ দেখলেই শ্রমিকদেরকে নামিয়ে দেওয়া হতো।
চা শ্রমিক ইউনিয়নের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে চা-শ্রমিকরা তীর-ধনুক নিয়ে যুদ্ধ করে। কিন্তু দেশে এখনও চা শ্রমিকরা ভূমির অধিকার থেকে বঞ্চিত। চা শ্রমিকদের জীবনমানের কোনো উন্নয়ন ঘটেনি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য চাহিদা এখনও পূরণ হয়নি।
তিনি জানান, অবিলম্বে চা শ্রমিকদের চুক্তি নবায়ন, দৈনিক মজুরি ৩০০ টাকা, রেশন হিসাবে সাপ্তাহিক ৫ কেজি চালসহ ৭ দফা দাবি মানতে হবে। তিনি ২০ মে রাষ্ট্রীয়ভাবে চা শ্রমিক দিবস ঘোষণা এবং ওই দিন সবেতনে ছুটি বাস্তবায়নেরও দাবি জানান। পাশাপাশি চা শ্রমিকদের চাকরি ক্ষেত্রে কোটারও দাবি করেছেন।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here