বিলুপ্তির পথে জালালি কবুতর

0
362

বিশেষ প্রতিবেদক :  হজরত শাহজালাল (রহ.) এর স্মৃতিবিজড়িত জালালি কবুতর সিলেট থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। জালালি কবুতরের আবাসস্থল ধ্বংস করে ফেলা এবং দ্রæত নগরায়ণের ফলে সিলেটের ঐতিহ্যের প্রতীক এ প্রাণীটি এখন অনেকটা বিলুপ্ত হওয়ার পথে। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হজরত শাহজালালের ভক্ত ও সচেতন মহল। এক সময় ঝাঁকে ঝাঁকে ওড়তো জালালী কবুতর। শুধু মাজার এলাকাই নয়, সিলেটের বিভিন্ন স্থাপনাতেই এই বিশেষ প্রজাতীর কবুতরের উড়াউড়ি চোখে পড়তো। কালের বিবর্তণে আজও টিকে আছে এই কবুতর। তবে, দিনে দিনে সংখ্যা কমে আসছে। এখন শুধু হযরত শাহজালাল (রাঃ) এর মাজারেই কিছু সংখ্যক কবুতর আছে। ১৩০১ খ্রিস্টাব্দে ইসলাম প্রচারে ইয়েমেন থেকে ওলিকুল শিরোমণি হযরত শাহজালাল (রাঃ) ভারতের দিল্লীতে গিয়েছিলেন। সেখানে নিজাম উদ্দিন আউলিয়া শাহ জালালকে স্বাগত জানান। আধ্যাত্মিক শক্তিতে মুগ্ধ হয়ে নিজাম উদ্দিন বিদায়বেলায় শাহ জালালকে নীল ও কালো রঙের এক জোড়া কবুতর উপহার দেন। এর ঠিক দুই বছর পর ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে শাহ জালাল (রঃ) যখন ৩৬০ জন সফরসঙ্গী নিয়ে শ্রীহট্ট ( সিলেটের প্রাচীন নাম) জয় করতে বাংলায় আসেন, তখন কবুতর দুটোকেও সঙ্গে এনেছিলেন। তখন বিভিন্ন অলৌকিক ঘটনার মধ্য দিয়ে শ্রীহট্ট জয় করে জয়ের প্রতীকস্বরূপ কবুতর দুটোকে উড়িয়ে দেন। সেই থেকে কবুতরগুলো ও এদের পরবর্তী বংশধররা পরিচিতি পায় ‘জালালী কবুতর’ নামে। সিলেটে আঞ্চলিকভাবে এরা ‘জালালী কইতর’ নামেই পরিচিত। তিনি ওই কবুতর সিলেটে নিয়ে আসেন। হজরত শাহজালালের সঙ্গে নিয়ে আসা ওই কবুতরই জালালি কবুতর নামে পরিচিত। এরপর থেকে যুগ যুগ ধরে মানুষের ভালোবাসা পেয়ে আসছে জালালি কবুতর। আঞ্চলিকভাবে এটি ‘জালালি কইতর’ নামেও পরিচিত। সিলেটের বিভিন্ন স্তরের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক সময় সিলেটের আকাশে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে বেড়াত জালালি কবুতর। এ কবুতর কেবল সিলেটের লোকজনকেই নয়, দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করত। হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজার এলাকায় মূল আবাসস্থল ছাড়াও সিলেটের ঐতিহাসিক ক্বীনব্রিজ, ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতাল, শেখঘাট জিতু মিয়া ও লাল ভ্রাতৃদ্বয়ের বাড়ি, খাজাঞ্চিবাড়ি, মজুমদারবাড়ি এবং সিলেট রেলস্টেশন এলাকায় প্রচুর জালালি কবুতর দেখা যেত। এর বাইরে সিলেট নগরীর ‘আসাম বাংলো টাইপে’র বাড়িগুলোও ছিল এসব কবুতরের আবাসস্থল। কাজিরবাজার ও শেখঘাটের আড়তকে (পাইকারি দোকান) ঘিরে আনাগোনা ছিল জালালি কবুতরের। বর্তমানে মাজার ছাড়া নগরীতে কবুতরের আনাগোনা নেই বললেই চলে। অবাধে কবুতর শিকার এবং দূর-দূরান্ত থেকে মাজারে আসা লোকজন জালালি কবুতরের সঙ্গে অন্য প্রজাতির কবুতর ছেড়ে দেয়ায় জালালি কবুতর বিলুপ্তির পথে। প্রখ্যাত লেখক ও গবেষক আবদুল হামিদ মানিক রচিত ‘স্মৃতি ও ঐতিহ্যে বহমান বাংলা’ শীর্ষক গ্রন্থ থেকে জানা যায়, জালালি কবুতরের প্রতি সিলেটবাসীর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল শ্রদ্ধাপূর্ণ। এ কবুতর শিকার করা, ধরে বিক্রি করা বা খাওয়ার কথা কেউ ভাবতেও পারত না। ভয়ে বা শ্রদ্ধায় কবুতরগুলোকে কেউ উত্ত্যক্ত করত না। হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজার ঘুরে দেখা যায়, মাজারের ভবনগুলোর ছাদের ওপর ওড়াউড়ি করছে জালালি কবুতর। কাঠের বাক্সেও জোড়ায় জোড়ায় রয়েছে জালালি কবুতর। মূল ফটকের পাশেই বাঁশের বেড়ার ভেতর ছিটানো ধান খাচ্ছে জালালি কবুতর। এ সময় অন্য প্রজাতির কবুতরকেও ধান খেতে দেখা যায় সেখানে। মাজারের ভবনগুলোর ছাদের ওপর উড়াউড়ি করছে জালালী কবুতর। ভবনগুলোর দু’একটি স্থানে কবুতরের বাসা (কাঠের বক্স) বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে বসে আছে জোড়ায় জোড়ায় কবুতর। প্রধান ফটকের ডান দিকেই দর্শনার্থীদের দেখার জন্য বাঁশের বেড়ার ভেতর আছে কিছু কবুতর। আগত ভক্তদের ছিঁটানো ধান খাচ্ছে কবুতরগুলো।  জালালী কবুতর নিয়ে একটি অলৌকিক ঘটনা প্রচলিত আছে। হযরত শাহ জালাল (রঃ)-এর ভাগ্নে হযরত শাহ পরাণ (রঃ) ছিলেন সফরসঙ্গী ৩৬০ আউলিয়ার একজন। হযরত শাহ পরাণ (রঃ) কবুতর খেতে খুবই পছন্দ করতেন। তিনি প্রতিদিন একটি করে কবুতর খেতেন, যার মধ্যে জালালী কবুতরও থাকতো। তবে খাওয়ার পর তিনি পালকগুলো ফেলে না দিয়ে জমিয়ে রাখতেন। একদিন জালালী কবুতরের সংখ্যা কম দেখে শাহ জালাল খাদেমদের কাছ থেকে জানলেন ভাগ্নের কবুতর খাওয়ার ঘটনা। শাহ জালাল (রঃ) কিছুটা রাগ প্রকাশ করেন। এতে ভাগ্নে হযরত শাহ পরাণ (রঃ) মামাকে বললেন, ‘আমি আপনার কবুতরগুলো ফেরত দিচ্ছি।’ এরপর সেই রেখে দেওয়া পালকগুলো আকাশে উড়িয়ে বললেন, ‘ যাও ! আল্লাহর হুকুমে শাহজালালের দরবারে পৌঁছে যাও।’ সাথে সাথে পালকগুলো জালালী কবুতর হয়ে তার মামার দরবারে এসে হাজির হল। সিলেটের প্রবেশ পথে রেলওয়ে স্টেশন, কীনব্রীজসহ পুরোনো বাড়ি, মসজিদ, মন্দিরে জালালী কবুতর উড়ে উড়ে খাবার খেতো। শুধু সিলেটবাসীই নয়, দূর দূরান্ত থেকে সিলেটে আগত পর্যটকেরা এই বিশেষ কবুতর দেখে মুগ্ধ হতেন। এখন ক্রমেই কমে আসছে জালালী কবুতর। যে কবুতরগুলো মারা যাচ্ছে, এগুলো জালালী কবুতর না। এগুলো সাধারণ কবুতর। ভক্তরা এসে মানতের কবুতর এখানে ছেড়ে চলে যায়, এতে কবুতরে রোগ আসে। তাই সাধারণ কবুতর মাজারে ছাড়া নিষেধ করা হয়েছে। জালালি কবুতর হ্রাস পাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে মাজারে অন্য প্রজাতির কবুতর এনে ছেড়ে দেয়া এবং এর প্রতি ভাব-ভক্তি কমে যাওয়া। বিশেষ করে পালিত সাদা কবুতর ছেড়ে দেয়ায় জালালি কবুতর কমছে বলে সকলের ধারনা। পর্যাপ্ত খাবারের অভাবেও অনেক কমেছে। জালালি কবুতর রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ ও সচেতনতা বাড়ানোর জরুরি।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here