বাংলাদেশ বিশ্বে যে মর্যাদার আসন পেয়েছে তা ধরে রাখতে হবে : শেখ হাসিনা

0
72

নিজস্ব প্রতিবেদক: ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশে গড়ার পরিকল্পনা এখন থেকেই হাতে নিতে ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে সবার প্রতি আহŸান জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল বুধবার সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে নিজ কার্যালয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করে তিনি বলেন, সব জঞ্জাল সাফ করেই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।  যত বাধাই আসুক না কেন, তা অতিক্রম করে সাফল্য অর্জন করা হবে। এ জন্য প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস, দৃঢ়তা ও পরিকল্পনা নেয়ার মতো চিন্তাভাবনা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ বাংলাদেশ বিশ্বে যে মর্যাদার আসন পেয়েছে তাকে ধরে রাখতে হবে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী দক্ষতার সঙ্গে এমডিজি অর্জনে ভূমিকা রাখায় সরকারি কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানান। একইভাবে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা ও সরকারের নেয়া উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০১-এ ক্ষমতায় আসতে পারলাম না, তখন অর্জনগুলো কীভাবে ধ্বংস হয়ে যায়, সেটা আমরা নিজের চোখে দেখেছি। কাজেই তার যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তার জন্য যত দ্রæত স্থায়ী উন্নতি করা যেতে পারে, সে প্রচেষ্টাই আমরা চালাই। আর সেটা করার জন্য কী কী ধরনের কাজ করতে পারি, আমরা কী কী করলে ভালো হবে, সেগুলো লক্ষ্য রেখেই কিন্তু আমরা এই যে বার্ষিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়ে সেটাকে বাস্তবায়নের জন্য চুক্তি সম্পাদন করার দিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি দিই।”
প্রধানমন্ত্রী এসময় সরকারি কর্মচারিদের সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে সরকারের প্রদত্ত বাজেট বাস্তবায়নে কাজ করার আহবান জানিয়ে বলেন, আপনাদের কর্মোদ্দীপনার ওপরই জাতির উন্নয়ন নির্ভরশীল। দেশের উন্নয়নের জন্য কাজের গতি ত্বরান্বিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, আমরা রাজনিতিবিদেরা শুধু উন্নয়নের পথ দেখাতে পারি কিন্তুু এই কাজের বাস্তবায়নের দায়িত্ব আপনাদের ওপরই বর্তায়। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, সুষ্ঠুভাবে কর্মসম্পাদন চুক্তি বাস্তায়নের মাধ্যমে রূপকল্প-২০২১ বাস্তবায়নের পাশাপাশি এসডিজি লক্ষ্যমাত্রাও অর্জন করা সম্ভব হবে। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সচিববৃন্দ বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন এবং পরে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের সচিববৃন্দ এই চুক্তির একটি করে কপি প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করেন।বাংলাদেশে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রথম বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি বা এপিএ প্রবর্তন করা হয়। এবার পঞ্চম বছরের মত এ চুক্তি স্বাক্ষর হতে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট অর্থবছর সমাপ্ত হওয়ার পর ঐ বছরের চুক্তিতে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাসমূহের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের প্রকৃত অর্জন মূল্যায়ন করা হবে। এসময় ২০১৬-১৭ বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ায় বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং কৃষি মন্ত্রণালয়কে সম্মাননা তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। এবারই প্রথম অনুষ্ঠানে সিনিয়র সচিব ও সচিব পর্যায়ে শুদ্ধাচার পুরস্কার ২০১৭-১৮ প্রদান করা হয়। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সচিব, মো. মফিজুল ইসলাম প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে এই পুরস্কার গ্রহণ করেন। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমত আরা সাদেক, মন্ত্রী পরিষদ সচিব মো. শফিউল আলম, মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক মো. আবুল কালাম আজাদ অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের সচিব (সংস্কার ও উন্নয়ন) এনএম জিয়াউল আলম, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সচিব মো. মফিজুল ইসলাম ও অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। অনুষ্ঠানে মন্ত্রী পরিষদ সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাবৃন্দ, সচিববৃন্দ, বিভিন্ন বিভাগ ও দপ্তরের প্রধানগণ, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাবৃন্দ এবং বিভিন্ন দেশের কূটনিতিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বলেন, ‘মাঠে কাজ করতে গেলে অনেক নতুন কিছু চোখে পড়ে কাজেই আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পরবর্তী ধাপটা কি হবে-২০৪১ সালে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসবে বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে হলে আমাদের কোথায় কি করণীয় এ ব্যাপারে যে ধারণাগুলো আপনারা পাবেন, অন্তত সেটুকু আপনারা দিতে পারেন, যাতে করে আমরা আগামী দিনের পরিকল্পনায় সেটা নিয়ে নিতে পারি।’ তিনি বলেন, ‘যদি একটা সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা আমাদের থাকে, একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য আমাদের থাকে তখন যেই ক্ষমতায় থাকুক না কেন সেটার বাস্তবায়ন অবশ্যই করতে পারবে এবং করবে বলেই আমি বিশ্বাস করি।’ আর সেই লক্ষ্য নিয়েই তাঁর সরকার কাজ করে যাচ্ছে, বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি সরকারি কর্মচারিদের কর্মক্ষেত্রে তাদের চিন্তা-ভাবনাগুলো সমন্বয় করে দেওয়ার আহবান জানিয়ে বলেন, ‘তাহলে ২০৪১ সালের লক্ষ্য অর্জনেও সেটা অনেক কাজে আসবে বলে আমি মনে করি।’ শেখ হাসিনা বলেন, সরকারি কর্মকান্ডে দক্ষতা বৃদ্ধি ও গতিশীলতা আনয়ন, সেবার মানোন্নয়ন এবং প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেই তাঁর সরকার ফলাফলভিত্তিক সরকারি কর্মসম্পাদন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি বা জিপিএমএস চালু করেছে। তিনি বলেন, বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি (এপিএ) মূলত তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর প্রতিনিধি হিসেবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সচিবের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা দলিল। একইভাবে মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সচিবগণ সংযুক্ত দপ্তর বা সংস্থাসমূহের সঙ্গে এবং দপ্তর বা সংস্থাসমূহের প্রধানগণ মাঠ পর্যায়ের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের কৌশলগত উদ্দেশ্যসমূহ, এ সকল লক্ষ্য অর্জনের জন্য গৃহীত কার্যক্রমসমূহ এবং এ কার্যক্রমের ফলাফল পরিমাপের জন্য কর্মসম্পাদন সূচক ও লক্ষ্যমাত্রাসমূহ বর্ণনা করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে এসডিজি’স ইমপ্লিমেন্টেশন রিভিউ কনফারেন্স-২০১৮’র উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এসডিজি’স ইমপ্লিমেন্টেশন রিভিউ কনফারেন্স-২০১৮ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই কনফারেন্সের সঙ্গে আমাদের নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা, এর বাইরে আমাদের নিজেদের দেশের জন্য কি করণীয় সেটাও সঙ্গে সঙ্গে আপনারা মূল্যায়ন করবেন। যাতে আগামী দিনের পরিকল্পনায় সেটাকে সম্পৃক্ত করে একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনা প্রণয়ন করা যায়। তিনি এর ব্যাখ্যায় বলেন, আমার পরিস্কার কথা- প্রত্যেকটি গ্রাম হবে এক একটি শহরের মত, প্রত্যেকটি গ্রামের মানুষ যেন সকল নাগরিক সুবিধা পায়- সেটা আমরা নিশ্চিত করবো। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, একটি মানুষও সেখানে অশিক্ষিত থাকবে না, একটি মানুষও গৃহহারা থাকবে না, একটি মানুষও ক্ষুধায় কষ্ট পাবে না বা স্বাস্থ্যসেবা বঞ্চিত হবে না। প্রতিটি মানুষ উন্নত জীবন পাবে। সরকার প্রধান, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগকে আরো শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে তাঁর সরকার ২০১২ সালে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল প্রণয়ন করেছে বলে উল্লেখ করেন।
এদিকে, জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ফখরুল ইমামের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে এমপিওভুক্ত করার জন্য ইতোমধ্যে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো এবং এমপিও নীতিমালা ২০১৮ জারি করা হয়েছে। এই নীতিমালা অনুসরণ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির (মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার) বিষয়ে দ্রæত কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। এ লক্ষ্যে অনলাইন অ্যাপলিকেশন গ্রহণ  এবং ব্যবস্থাপনা ও  বিধি মতে প্রতিষ্ঠান বাছাইয়ের জন্য পৃথক দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ বিষয়ে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ফখরুল ইমামের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষকতার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।’ স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে বুধবার প্রশ্নোত্তরের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠিত হয়।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here