আড়ালে আবডালে…

0
87

আজকের বিকেলটা অন্যান্য দিনের চেয়ে বেশ নরম। প্রিয়জন পাশে থাকলে এমন বিকেলকে আর নরম মনে হয়না। ঘুরে ঘুরে কিংবা হেঁটে হেঁটে নির্দ্বিধায় কাটিয়ে দেয়া যায়,বেশ সুন্দর একটি বিকেল আজ। সুতনু ও ইমন ঢাকা মেডিক্যালে ফাইনাল ইয়ারে পড়ে।অনেক বন্ধুই আছে, তবু কেন যেন ইমনের সাথে চার বছর ধরেই একইরকম বন্ধুত্ব সুতনুর। শুধু বন্ধুতা বললে ভুল হবে সবকিছুই ইমনের সাথে ভাগাভাগি করে শান্তি পাই তনু। তারমানে যে গÐগোল লাগে না তা নয়,তবে তা আবার জোড়ালাগে দুজনার আবেশেই।কারণ ওরা কেউ কাউকে ছেড়ে থাকতে পারেনা।এজন্য বন্ধুরা অবশ্য ঈর্ষা করে,কখনও কখনও মানিকজোড় বলেও ডাকে। মেডিক্যালের ভিতরের রাস্তাটা বেশ নিরিবিলি। সুতনু  ও ইমন মৃদুপায়ে হাঁটছে।হঠাৎ সামনে দিয়ে দুজন বন্ধু আসছে।কাছাকাছি আসতেই-কি রে বিয়ে কবে করছিস তোরা? আমাদের একটু পেটপুরে খাওয়ার সুযোগটা দে অন্তঃত।ফাইনাল দিলে কে কোথায় চলে যাবো, বলেই ইমনের পিঠে আলতো চাপটে দিল। ইমন মিষ্টি করে হাসি দিয়ে আহঃ তোরা যাবি? রাগে গরগর করছে তনু।তুই হাসলি কেন? ওদের কথায় রাগ না করে উল্টো দাঁত বের করে হাসছিস?
তো কি করবো? হাঃ হাঃ।
আচছা তুই আমাকে ভালবাসবি তনু?
কি বললি? কান ধর, তোকে কেন ভালবাসতে যাবো? তুই আমার বন্ধু, শুধু বন্ধু।সারাজীবন ভালো বন্ধু থাকবি। শোন্,আর কোনদিন এসব বলবিনা আমাকে।বললে আর তোর সাথে মিশবোনা, মনে থাকবে?
রিলাক্স তনু,ফানও বুঝিসনা?
ফান করেছিস? ভালবাসা সত্যি ছিলনা,বাহঃ তুই খুব ভাল রে ইম।ঐসব ভালবাসাবাসি আমার পছন্দ না।
যদিও এটা ফান ছিলনা, তবু তনুকে হারাবার ভয়ে ইমন মিথ্যে বলল।
পরীক্ষার খুব বেশী দেরী নেই। ফাইনাল ইয়ারে পড়াশোনা বেশ ভালোই করেছে ওরা।ইদানীং ইমন খুব কম ক্লাসে আসছে। ফোন করে জিজ্ঞেস করলেই বলে অসুস্থ। ক্লাস করার মতো শক্তি নেই।সবসময় ঠাÐা, কাশি,জ্বর লেগেই আছে।খাওয়াদাওয়া ঠিকমতো করতে পারেনা,রুচি নেই মুখে।সারাদিন বিছানা ইমনের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে।মা জোর করে মাঝে মাঝে খাইয়ে দেয় আর চোখ মুছে।মা’ জাতিরা যেন কেমন- সবসময় শুধু কাঁদেন।মার কান্নামুখ দেখতে ইমনের ভালো লাগেনা। বেশ কিছুদিন খুব মিস করছে ইমনকে সুতনু।মনে মনে গাল দিচ্ছে গাঁধা, ছাগল,এই সেই বলে।একবার আসতেও পারেনা।কতদিন দেখা নেই গাঁধাটার সে খেয়াল থাকে?আজ যাবো দেখবো তোর কি হয়েছে? মনে মনে ভাবে,ভালবাসার জন্য নাটক সাজিয়েছিস, তোর সব নাটক আজ দৃশ্যমান হবে ইম।তুই ভাবতেও পারবিনা,আজ কিভাবে তোকে আমি চমকে দেবো? হাঃহাঃ। বিকেল বেলা।সুতনু রওনা হলো ইমনের বাসার খোঁজে একদম না জানিয়ে। মা গাড়ী নিয়ে যেতে বললেন তা নিলনা সুতনু। খুঁজে খুঁজে যেতে হবে গাড়ী লাগবেনা মা।অনেকই গল্প শুনেছে ইমনের মুখে কোথায় বাসা,কত নং বাসা সবই তার জানা।খুব সহজে পেয়ে গেল। কলিংবেল চাপতেই একজন খুলে দিল দরজা।বয়স পঁয়তাল্লিশের মতো। চোখের নীচে কালি।বুঝতে দেরী হলোনা ইনি ইমনের মা।সালাম দিয়ে বলল আমি সুতনু।ইমন কোথায়? এসো মা বলে ইমনের ঘর দেখিয়ে দিল।ঘরে ঢুকতেই তনু চমকে উঠলো,এ কাকে দেখছে তনু? না এটা ইমন নয়। চেনার উপায় নাই। শরীর অনেক শুকিয়ে গেছে।চুলও অনেক পড়ে গেছে।মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে শরীর এত ভেঙে যেতে পারে ইমনকে না দেখলে বিশ্বাস হয়না। এই পাগল কি হয়েছে তোর? বলে কপালে, মুখে হাত ছুঁয়ে বলতে থাকে,আমি কি তোকে বলেছি যে আমি তোকে সত্যি সত্যি ভালবাসি না?তুই সত্যি অনেক বড় গাঁধা রে।এই আমার চোখের দিকে তাকা,দ্যাখ কত ভালবাসা জমেছে তোর জন্য! কয়েকদিন আড়ালে থেকে বুঝিয়েছিস তুই আমার কে, কত প্রিয়  তুই । তোকে আমিও অনেক ভালবাসি। তুই ছাড়া আমারও চলছেনা রে,তুই ছাড়া আমার চলবেও না। ইমন না জানলেও বুঝে তাঁর কি হয়েছে?কেন এত ডাঃএর কাছে দৌড়াদৌড়ি, কেন মায়ের চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে! সুতনু কষ্ট পাবে বলে বলে না, আমি বেশ আছি তনু। তুই ভাবিস না।আর কিছুদিন পরে যাব, ক্লাস তো প্রায় শেষ।একবারে পরীক্ষা দিতে যাব। তুই ভালো থাকিস। আমার জন্য চিন্তা করিস না।আর ভাবিস না আমি তোকে ভালবাসি বলে ভাণ করছি,তুই অনেক বড় কোন মানুষ কে বিয়ে করে সুখী হোস,তাই চাই তনু। তুই এত কথা বলিসনা ইম। মা স্যুপ নিয়ে ভিতরে এলো।সুতনু বলল,আমি খাইয়ে দিচ্ছি বলে বাটিটা নিয়ে খাওয়াতে শুরু করল। কিছুটা খেয়ে মুখ কাঁচুমাচু করে আর খেতে চাইল না।সুতনুও জোর করলনা। সুতনু এবার চলে আসতে চাইল। সুতনু খেয়াল করে ইমনের সমস্ত মুখ যেন আঁধার হয়ে এলো। ইমনকে বলল, আমি আবার আসবো। তুই থাক। ভালো থাকিস। দরজা থেকে ইমনের মা জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। মা আমার একমাত্র ছেলের এমন হলো কেন,কি অপরাধ করেছি আল্লাহর কাছে,কি অপরাধ আমার ইমুর? আমি কি করে বাঁচবো,কেমন করে বেঁচে থাকবো? সবগুলো ডাঃ একই রিপোর্ট দিয়েছে। সুতনুর মাথা ঘুরে উঠে। শান্তনা দিয়ে ফিরে আসার মত শক্তি নেই সুতনুর।তবুও খুব কষ্ট করে ফিরে এলো বাড়িতে।আসার পথে কত কি ভাবছে,কেন সেদিন ইমন কে কষ্ট দিল,ইমন কে তো সে সত্যি ভালবাসে। ভেবেছিল পরীক্ষার পর বলে চমকে দেবে।সুতনু আজ নিজেকে সম্পুর্ণ বুঝতে পারে সে ইমন কে কতটা ভালবাসে। অথচ আজ ভালবাসি বললেও ইমন তা করুণা বলে উড়িয়ে দিল।খুব খারাপ লাগছে সুতনুর। পুরো আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে সে ইমনকে ভালবাসে। পা উঠছে না।ইমনের বাসা থেকে ফিরে এসে হনহন করে নিজের ঘরে ঢুকে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে ডুকরে কাঁদতে লাগলো।সুতনুর মা ও ছোটবোন সুমিতা ছুটে এলো।মুখ চাওয়াচাওয়ি করে কিছুই বুঝল না।মা জানতেন,তনু ইমনের বাসায় গিয়েছিল।না বলে কোনদিন কোথাও যায়না। কি হয়েছে তোর? এমন করে কাঁদছিস কেন রে মা? কান্নার রোল আরো বেড়ে যায়। ছোটবোন বড়পু বড়পু বলে ডাকে তবুও থামছে না তনু।সবাই চমকে গেছে খানিকটা।সুতনুর মা বাবার কাছে দৌড়ে গিয়ে বলল দেখো তো তোমার বড় বাবুটার কি হলো,শুধু কাঁদছে। বাবা দৌড়ে আসলেন। কই দেখি দেখি বলে মাথার কাছে এসে মা আমার,বাবু আমার, তোর কি হয়েছে রে পাগলী?কে বকেছে?কাঁদতে কাঁদতে একটা শব্দ বের হলো মুখ থেকে ইমন- বলতেই বাবা শাসনের স্বরে আমি ইমনকে বকে দেবো,অনেক বকে দেবো।তুই কাঁদিস না মা। চারবছর ধরেই ইমনের সাথে খুব ভালো বন্ধুত্ব তা সুতনুর বাবা মা ভালো করেই জানে। মেয়ের উপর যথেষ্ট আস্থা আছে বলে কখনো এসব নিয়ে ভাবেনি তারা।কিন্তু আজ কি হলো কে জানে। আমি ইমনকে ভালবাসি বাবা।বলেই সুতনু আরো জোরে কাঁদতে লাগলো।বাবা রোগটা ধরতে পেরেছেন বলে মিটমিট করে হাসছেন। আর বলছেন এ তো খুব ভাল কথা। আগে ফাইনাল টা দে,তারপর তোদের খুব ধুমধাম করে বিয়ে দেবো। বুঝলে সুতনুর মা,আমার মেয়ের পছন্দে আমরা বিয়ে দেবো।ঢাকার সেরা কমিউনিটি তে আত্মীয়স্বজন সবাই আমার মেয়ে-জামাই কে সেলিব্রেট করবে, তুমি দেখে নিও। বলতে বলতে বাবা একসময় খেয়াল করেন তনুর জ্ঞান নেই। তাড়াতাড়ি গাড়ি বের করতে বললেন ড্রাইভার কে।পাশেই ইউনাইটেড হসপিটাল।এ হসপিটালে জরুরী বিভাগের কয়েকজন ডাঃ সুতনুকে  দেখলেন। দেখে কিছু প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করলেন।এর মধ্যে সুতনুর বাবার বন্ধু ও ঢাকা মেডিক্যালের প্রফেসর ডাঃ আনোয়ারুল হক সাহেব আসলেন।বাবা তাঁকে ফোন করেছেন।উনি এসে একটা ইনজেকশন দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে জ্ঞান ফিরল সুতনুর। ডাঃ বেশী কথা বলতে নিষেধ করলেন। সুতনুর মা ও বোন পাশে বসলেন।কপালে মুখে হাত রাখলেন।আদর করলেন।সুমিতা মতিঝিল আইডিয়ালে ক্লাস সেভেনে পড়ে। বড়’পুর হঠাৎ এমন পরিস্থিতিতে সেও ঘাবড়ে গেছে। সুতনু কথা বলে না।শুধু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে সিলিংএ।কিছুক্ষণ পরপর চোখের কোণ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। সুতনুর বাবাকে একপাশে ডাকলেন ডাঃ এ.হক।কি কি যেন জানতে চাইলেন? বাবাও ফিসফিস করে কি যেন বললেন। কিছুক্ষণ পর এসে সুমিতার কাছে ইমনের সেলফোন নাম্বার চাইলেন। সুতনুর ফোন থেকে নাম্বারটি তুলে দিল সুমিতা। কিছু টা একপাশে গিয়ে সুতনুর বাবা ফোন দিলেন।

রিং বাজে,কেউ ফোন ধরেনা।সুতনুর বাবারও টেনশন হচ্ছে।ইমন হয়তো খুব বেশী রাগ করেছে।আমার মেয়েটা যে একটু ঝগড়াপাগল তাতো আমি জানিই। কি আর করা।আরও একবার চেষ্টা করলেন। ফোন রিসিভ করলেন ইমনের মা। খুব ভারী ছোট গলায় সালাম দিলেন। কথা হলো কয়েকমিনিট।ইমনের মা বললেন সুতনু কে কিছুই বলেনি ইমন।আমি বলেছি ইমনের শরীরে গোপনে বাসা বেঁধেছে মরণব্যাধি ক্যান্সার। প্রথমে বিশ্বাস হয়নি,তাই অনেকগুলো ডাঃ দেখিয়েছি। রিপোর্ট একই এসেছে। ডাঃ ওর সময় বেঁধে দিয়েছে।সুতনু কে বলেছি যেন ওরা কেউ ইমনকে না জানায়। বলতে বলতে ইমনের মা আর কথা বলতে পারলেন না। সুতনুর বাবা হতবাক দৃষ্টিতে হসপিটালের জানালা দিয়ে দূরে তাকিয়ে ভাবতে লাগলেন,এই প্রথম আমি আমার আদরের মেয়ের চাওয়া পুরণে ব্যর্থ হলাম। সুতনুর বুঝতে বাকি থাকেনা আড়ালে বাবার চোখেও অশ্রæ ঝরছে!

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here