পত্রসাহিত্যে সুকান্ত ভট্টাচার্য

0
93

বাংলাসাহিত্যে সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৬-১৯৪৭) একটি ক্ষণজন্মা নাম। একটি অবিস্মরণীয় অধ্যায়।সময় সলিলে অবগাহন করে এগিয়ে চলা মূর্তিমান শব্দসৈনিক। পরিবর্তনের পূর্ণালোকে উদ্ভাসিত বিপ্লবী কবিসত্তা বয়সের বাঁধন ত্যাগী কিশোর।অথচ ব্যক্তি জীবনে আদর্শিক। উত্তরাধিকারের প্রশ্নে অনেক সাহিত্য গবেষক সুকান্তকে নজরুলের সাহিত্য-উত্তসূরি ভেবে থাকেন।বিশেষ করে কবিতার ক্ষেত্রে।ভাবনার যথার্থতাও আছে বটে।কারণ যে কোন সাহিত্যস্রষ্টা তার জীবদশায় মনজাগতিক অনুভূতির পাশাপাশি পারিপার্শিকতা দ্বারাই প্রভাবিত হন বেশি। সুকান্তও তার ব্যতিক্রম নন। বৃটিশশাসিত ভারতবর্ষে নজরুলের পরেই একমাত্র সুকান্ত তারুণ্যের প্রতীক। শ্রেণিবৈষম্যহীন সমাজ চেতনায় গণমানুষের কন্ঠস¦র।কবিতা রচনার পাশাপাশি সুকান্তের অন্য আরেকটি নেশা ছিল পত্রলেখা।কিশোর বাহিনীর দলীয় প্রয়োজন ছাড়াও বন্ধুদের সাথে একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়াদি আদান-প্রদানের মাধ্যম হিসাবে চিঠি লেখায় তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তাঁর লিখিত চিঠির ভাষা যেমন সুপাঠ্য,বর্ণনাশৈলী তেমনি অকর্ষনীয়।চিঠি যে সাহিত্যের একটি অন্যতম সমৃদ্ধ শাখা,সুকান্ত লিখিত ‘পত্রগুচ্ছ’ পাঠ মাত্রেই তার সত্যতা অনুমেয়। কবি সুকান্ত যখন থেকে লেখালেখির জগতে প্রবেশ করেছেন তার অব্যবহিত পরেই পত্র লেখায় হাত দেন। তাঁর জীবনে কবিতা যেমন শ্বাশত তেমনি কিশোর বাহিনী এবং চিঠির মাধ্যমে পরস্পরের সাথে পত্রমিতালীও অঙ্গাঅঙ্গি ভাবে জড়িত। সুকান্তের ‘পত্রগুচ্ছ’ বাদ দিয়ে সমাজসচেতন তৎকালীন ভারতীয় ও বিশ্বরাজনীতির তীক্ষè বিশ্লেষক কমরেড সুকান্তকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আমার মনে হয় -যে পাঠক শুধুমাত্র সুকান্তের কবিতা পাঠ করেছে সে কেবলমাত্র কবি সুকান্তকে জেনেছে,মানুষ সুকান্তকে জানতে বা বুঝতে হলে তাঁর ‘পত্রগুচ্ছ’ পাঠ ভিন্ন বিন্দুমাত্র আত্মস্থ করা সম্ভব নয়। সুকান্তের ‘পত্রগুচ্ছ’-এর বদৌলতে এ পর্যন্ত মোট ৪৯টি চিঠির সন্ধান পাওয়া যায় যার মধ্যে ৩২টি চিঠি অকৃত্রিম কবিবন্ধু অরুণাচল বসুকে,০৫টি অরুণের মা সেই সময়ের অন্যতম লেখিকা শ্রীমতি সরলা বসুকে, ০১টি অরুণের বাবা অশ্বিনীকুমারকে,০৫টি সুকান্তের মাসতুতো ভাই ভূপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যকে,০২টি সুকান্তের জেঠতুতো মেজদা রাখাল ভট্টচার্যের স্ত্রী রেণুদেবীকে,০১টি সাহিত্যিক শ্রীকৃষ্ণ চক্রবর্তীকে,০২টি কিশোরবাহিনীর বন্ধুদের এবং ০১টি কমরেড শ্রীমদন সাহাকে লিখেছিলেন।
আমাদের বাঙালি সমাজে একটি ধারণা অত্যন্ত বদ্ধমূল যে , যাঁরা কমিউনিস্ট রাজনীতির আদর্শ ধারণ করেন তাঁরা ধর্মবিরুদ্ধ! আমার বিশ্বাস-এই কথাটির যথার্থতা শতভাগ সত্য নয়। কারণ সুকান্ত আমৃত্যু বাম রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকলেও কখনো তাঁর কোন লেখায় কিংবা আলাপচারিতায় সরাসরি ধর্মবিরুদ্ধ মনোভাব ব্যক্ত করেছেন এমন প্রমাণ পাওয়া যায় নি।তবে ধর্মের নামে কোন প্রকার ভÐামিকে তিনি প্রশয় দেননি।শ্বাশত সত্যকে এড়িয়ে চলা বা বাদ দেওয়া যায় না। সুকান্ত হয়তো সে বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে অবগত ছিলেন-তাইতো অরুণের নিকট লেখা দুটি চিঠির শুরুতেই তিনি মঙ্গলসূচক শব্দ ‘শ্রীরুদ্রশরণম‘ ও ‘সৎসঙ্গশরণম’ ব্যবহার করতে কুন্ঠাবোধ করেননি। সাধারণত দেখা যায় কোন ব্যক্তি তার নিকটস্থ বন্ধুর কাছে পত্র লিখলে সম্ভাষণে প্রিয়বন্ধু বা প্রাণের বন্ধু এই জাতীয় শব্দ ব্যবহার করে থাকে।কিন্তু বন্ধু অরুণের ও সুকান্তের আদি পৈত্রিক নিবাস বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়ায় হলেও জন্ম হয়েছে কলকাতায়। আশৈশব কলকাতার বুকেই তাঁর বেড়ে ওঠা।কলকাতাকে সে কখনো স্নেহময়ী মায়ের সাথে আবার কখনো চিরযৌবনা প্রেয়শির স্বরূপে অবলোকন করেছেন। চল্লিশের দশকে অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে সুকান্ত আশঙ্কা করেছিলেন হয়তো বহিঃশত্রæ দ্বারা তাঁর প্রিয় নগরী কলকাতা আক্রন্ত হতে যাচ্ছে। কারণ ঐ সময় সকল বিশ্বশক্তি তাদের অপরাপর মিত্রশক্তিকে সাথে নিয়ে যে যার পথে অগ্রসর হওয়ার সংকল্প নিয়েছিল। তাইতো বন্ধু অরুণের নিকট লেখা একটা চিঠিতে বিজ্ঞ বিশ্লেষকের মতো অত্যন্ত আবেগময় ভাষায় সুকান্ত নিজের উদ্বেগের কথা প্রকাশ করেছেন এভাবে কলকাতাকে আমি ভালোবেসে ছিলাম প্রিয়ার মতো, মায়ের মতো।তার গর্ভে জন্মানোর পর আমার জীবনে এতগুলি বছর কেটে গেছে তারই উষ্ণ-নিবিড় বুকের সান্নিধ্যে; তার স্পর্শে আমি জেগেছি ,তার স্পর্শে আমি ঘুমিয়ে পড়েছি। বাইরের পৃৃথিবীকে আমিম জানি না,চিনি না।আমার পৃথিবী আমার কলকাতার মধ্যেই সম্পূর্ণ (২৪শে পৌষ,১৩৪৮, বেলেঘাটা ৩৪ হরমোহন ঘোষ লেন,কলকাতা)। মাতৃভূমি তথা জন্মভূমি বা জন্মস্থানের উপর মানুষের যে আমৃত্যু আাকর্ষণ-ভালোবাসা-কৃতজ্ঞতাবোধ সুকান্তের এই চিঠির ভাষাই তার পরিচয় বহন করে। সুকান্ত পাঠক মাত্রেই জানেন যে ‘উপক্রমনিকা‘ ছদ্দ নামে একটি মেয়েকে তিনি মনে-প্রাণে ভালোবাসতেন।যদিও ‘উপক্রমনিকা’-র সাথে শেষ পর্যন্ত সম্পর্কের বাঁধন ধরে না রাখতে পারায় অন্য একটি মেয়েকে ভালোবাসতো সুকান্ত। চিঠির আলোকে সেই মেয়েটির নাম উদ্ধার করা না গেলেও অরুণের কাছে প্রেরিত একাধিক চিঠির ভাষা ও ভাব-ব্যঞ্জনায় পরিষ্কার ভাবে অনুধাবিত হয় যে- দ্বিতীয় মেয়েটি ছিলো সুকান্তের পারিবারিক ভাবে নিকট আত্মীয় গোছের কেউ। সেই অ-নামিকার(?) নাম-পরিচয় সর্বসাধারণের আঁড়ালে রেখে সুকান্ত অরুণকে লিখেছেন আমার দ্বিতীয় সমস্যা আরও ভয়ংকর।যদি আমার আত্মীয়রা জানতে পারে একথা,তবে আমার লাঞ্চনার অবধি থাকবে না।বিশেষত আমার বিশ্বাসঘাতকতা…নিশ্চই আমার সংস্পর্শ ত্যাগ করবে। অতএব এখন আমার কী করা কর্তব্য চিঠি পাওয়ামাত্র জানাস। (বেলেঘাটা,১৭/০৪/৪২)। বেলেঘাটা-চৈত্র সংক্রন্তি ৪৮,কলকাতা তারিখে অরুণকে লেখা চিঠিতে সুকন্ত ওই দ্বিতীয় মেয়েটি সম্পর্কে আরও লিখেছে…কে তুই চিনিস,Ñযদি ‘না চিনি না’ বলিস তবে চিনিয়ে দিচ্ছি, সে উপক্রমনিকার অন্তরঙ্গ বন্ধু। সর্বোপরি সে আমার আবাল্যের সঙ্গিনী, সঙ্গিনী ঠিক নয়, বান্ধবী। যখন আমরা পরস্পরের সমুখে উলঙ্গ হতে দি¦ধাবোধ করতাম না,সেই সুদূূর শৈশব হতে সে আমার সাথী। বিজ্ঞপাঠক সুকান্ত যে তাঁর এই দ্বিতীয় সম্পর্ক নিয়ে দারুণ অসস্তিতে ছিলো উপরোক্ত দুটি চিঠির বক্তব্য তার প্রমাণ বহন করে।সেই সাথে আমরা সমাজসচেতন, শ্রেণিবৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মানের একনিষ্ঠ কারিগর কবি সুকান্তের অন্তরালে লুুকিয়ে থাকা কাঁচাপ্রেমের প্রেমিক,সিদ্ধান্তের দোলাচলে দুদ্যুল্যমান উঠতিবয়সী এক কিশোর-যুবককে দেখতে পাই, চিরাচরিত মানব-মানবীর মনজাগতিক রসায়নে নিমজ্জিত একজন সাধারণ মানুষের পরিসীমায়। কথায় আছে -কচিপ্রেমের কলিজা নাকি কল্লোলিত ¯্রােতস্বিণীর মতো।তীরভাঙা তার ঢেউ। কথাটির যথার্থতা সুকান্তের চিঠির বর্ণনায়ও নিহিত। কারণ উপক্রমনিকার বর্ণনা দিতে যেয়ে সুকান্তর অন্তরলোক থেকে মদনমথিত যে জোয়ার এসেছিলো  তার স্বরূপ ছিলো এমনÑওকে দেখার তৃষনায় আমি অস্থির হয়ে উঠতে লাগলাম বহুদর্শনেও। না দেখার ভান করে থাকলাম ওকে দেখার সময়।…ওর চলে যাওয়ার দিন দেখেছিলাম ওর চোখ ,  সে চোখে লেখা ছিলো ‘হে বন্ধু  বিদায়, তোমাকে আমার সান্নিধ্য দিতে পারলাম না,ক্ষমা কর’। তোমরা একে পূর্র্বরাগ অ্যাখা দিতে  পারো,তবে আমি বলব এ আমার দুর্বলতা।তবে এ থেকে আমার অনুভূতির কিছু উন্নতি সাধন হয়। কিন্তু এ ঘটনার পর আমি কোন প্রেমের কবতিা লিখিনি।কারণ প্রেমে পড়ে কবিতা লেখা আমার কাছে ন্যক্কারজনক বলে মনে হয়। (বেলেঘাটা,৩৪ হরমোহন ঘোষ লেন,কলিকাতা,২৪শে পৌষ ১৩৪৮)। এতো গেলো অরুণের নিকট সুকান্তর প্রেম ঘটিত কিছু চিঠির চুম্বক বর্ণনা। সন্তান হিসাবে পিতা-মাতার প্রতি সুকান্তের যে কর্তব্য কর্মে সজাগ দৃষ্টি ছিলো তা অরুণের নিকট লিখিত অন্য একটি চিঠিতে পাওয়া যায়। অরুণ একবার কৌতূহল বশত আশ্রমবাসী হওয়ার মানসে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলো। অরুণকে লেখা ওই চিঠিতে সুকান্ত ব্যঙ্গাত্মক ভাবে সম্মোধন করেছে-‘শ্রীশ্রী ১০৮ অর্ণব-স্বামী গুরুমহারাজ সমীপেষু’ বলে। চিঠির এক পর্যায়ে সুকান্ত লিখছেÑ বৃদ্ধ পিতা এবং অসুস্থ মাতার প্রতি ঐহিক কর্তব্য সকল পদাঘাতে দূরীভূত করিয়া কোন নীতিশাস্ত্রানুযায়ী পারলৌকিক চরোমন্নতি সাধনের নিমিত্ত আপনি এক মোহমার্গ সাধন করিতেছেন? আপনার স্বীয় কর্তব্যকরণে প্রবৃত্ত হউন‘। এখানে একটি কথা অত্যন্ত সর্তকতার সাথে অনুধাবন করা একান্ত প্রয়োজন এই যে ,ওই বয়সে সুকান্ত সন্তান হিসাবে পিতা-মাতার প্রতি কী কী করণীয় তা একজন বিজ্ঞের মতো তাঁরই সমবয়সী বন্ধুকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। কথায় আছেÑযে মুলোটা বাড়ে তা পত্তনেই বোঝা যায়। ১৯৪২ সালের ২৮শে ডিসেম্বর বেলেঘাটা থেকে সুকান্ত অরুণকে একটা সুদীর্ঘ চিঠি লেখে। ওই চিঠির বর্ণনানুসারে জানা যায় অরুণের পরিবার তখন তাদের গ্রামের বাড়ি যশোরের ডোঙ্গাঘাটায় চলে আসে। এবং এও জানা যায় ওই সময় অরুণ একখানা উপন্যাস লিখছিলো। কলকাতার আকাশে তখন প্রায়ই জাপানি বোমারু বিমান উড়াউড়ি করতো। সমগ্র শহুরে জনপদ ছিলো আতঙ্কে ভরপুর।সুকান্তের নিজের ভাষায় তাঁর বর্ণনাÑপ্রথম দিন খিদিরপুরে,দ্বিতীয় দিনও খিদিরপুরে,তৃতীয় দিন হাতীবাগান ইত্যাদি অঞ্চলে (এই দিনকার আক্রমন সবচেয়ে ক্ষতি করে), চতুর্থ দিন ড্যালহৌসি অঞ্চলে- (এইদিন তিন ঘন্টা আক্রমন চলে আর নাগরিকদের সবচেয়ে ভীতি উৎপাদন করে,পরদিন কলকাতা প্রায় জনশূন্য হয়ে যায়‘। ওই তারিখের চিঠির অন্য এক স্থানে সুকান্ত বলছে-ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটে -এর এক বক্তৃতা সভায় কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সাথে প্রথম দেখা ও আলাপচারিতার কথা। অরুণ বেলেঘাটা থেকে যশোরে এসে ‘ত্রিদিব‘ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনের কাজ শুরু করে। এক পর্যায়ে সুকান্তকে এই পত্রিকার বিভাগীয় সম্পাদক করা হয় এক প্রকার না জানিয়ে। সুকান্তকে লেখা চিঠিতে অরুণ তৎকালীন যশোর অঞ্চলসহ এখানকার পরিবেশ-প্রতিবেশ সর্ম্পকে প্রায়ই জানাতো। সুকান্তও এখানকার(যশোর) বিশেষ করে দৌলতপুর,ডোঙ্গাঘাটা ও পাঁজিয়ার কথা আগ্রহ ভরে জানতে চাইতো। সাহিত্য পত্রিকা ‘ত্রিদিব’ সর্ম্পকে সুকান্তের মন্তব্য-ত্রিদিবের ভবিষৎ সম্বন্ধে আমার আশা গভীর হলো যশোরের সংকীর্ণতা থেকে সারা বাংলাদেশেই এর পরিব্যপ্তি ও সম্প্রসারণ দেখে। পত্রিকাটি নতুন লেখক ও শিল্পীদের প্রাণরসে পরিপুষ্ট ও পরিপক্ক হয়ে একদিন সারা বাংলার ক্ষুধা মেটানোর জন্যে পরিবেশিত হবে। এই একই চিঠির অন্য অংশে ‘ত্রিদিব’-এর সম্পাদক অরুণ না হওয়াতে সুকান্তের আক্ষেপ আর একটা গুরুতর কথা। তুই নিজে ‘সম্পাদক’ না হয়ে কোন এক সুনীল বসুকে ‘সম্পাদক’ করেছিস কেন? তোর চেয়ে যোগ্য লোক ডোঙাঘাটা তথা সারা যশোরে আছে নাকি?যদিও ‘ত্রিদিব’-এর সম্পাদক নিয়ে সুকান্তের এই কথায় অরুণ খুব মনোকষ্ট পেয়েছিলো। অরুণের সেই কষ্ট বা দুঃখ লাঘবের জন্য অন্য একটা চিঠিতে অপরাধীর মতো সুকান্ত অরুণকে লিখছেÑসম্পাদনার জন্য তোর চেয়ে যোগ্য লোক আছে কিনা, তোদের বর্তমান যশোরে(অর্থাৎ যেখানে অরুণ মিত্র,সরোজ দত্ত উপস্থিত নেই) এ প্রশ্ন তুলে তোকে আঘাত দিয়েছি জেনে আমিও প্রত্যাঘাত পেলাম। সুকান্তের চিঠির ভাষা বিভিন্ন সময়ে বহুমাত্রিক বাঁক নিয়েছে। কখনো তা গুরুগম্ভীর , কখনো মানবপ্রেমের মুর্ছনায় আবেগতাড়িত, কখনোবা বিজ্ঞ রাজনীতিকের মতো বিশ্লেষণধর্মী। আবার কখনো চিরাচরিত কাব্যমানসে পরিপূর্ণ। তেমনি একটি চিঠি ২১/০৯/৪৫ তারিখে বন্ধু অরুণকে লিখছেÑ কেবল আঘাত দেয় মূর্খ চতুর্দিক/ তবুও,এখনো আমি নিষ্ক্রিয় নির্ভীক/ ভারাক্রান্ত মন আজ অবিশ্রান্ত যায়/ তবু নিকটস্থ ফুল সুগন্ধে মাতায়। পূর্বেই বলেছি,সুকান্তের পৈত্রিক বাড়ি বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়ায়। কিন্তুু তাঁর জন্ম কলকাতায়। অরুণের নিকট লেখা বহু চিঠি থেকে ব্যক্তি সুকান্তের নানাবিধ বিষয়াদি জানা গেছে।কিন্তুু জীবদ্দশায় কখনো তিনি কোটালীপাড়ায় এসেছেন, এমন কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না।তবে কিশোর বাহিনীর সাংগঠনিক কাজে কিংবা বাম রাজনীতির আদর্শিক হওয়ার কারণে আজকের বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুঁটে বেড়াতে হয়েছে।কোন কোন স্থানে তাঁর নিজের উপস্থিতি না থাকার অক্ষমতার কথা বন্ধু অরুণকে সবিস্তারে জানিয়েছে। যেমন খুলনা জেলার দলীয় কাজে না আসতে পারায় ১৯৪৬ সালের মে মাসের ২৪ তারিখে অরুণকে প্রেরিত একখানা চিঠিতে তিনি জানাচ্ছেন-আমি খুলনা যাওয়ার সুযোগ হারিয়েছি এক মুহূর্তের লজ্জায়। কমরেড নৃপেন চক্রবর্তী নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন,আমি হঠাৎ না বলে ফেলেছিলাম। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী রাজনীতির আদর্শ নিয়ে সুকান্ত খুব বেশি আশাবাদী ছিলেন। মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন  ‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য‘।কিন্তুু বৈরি পরিবেশের ওই বয়সে রাজনীতির জন্য, গণমানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের  জন্য তিনি যে শ্রম ও মেধা খরছ করেছেন তৎকালীন ভারতীয় রাজনীতিতে তা বিরল দৃটান্ত হয়ে থাকবে। সুকান্ত যক্ষারোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের নিকট থেকে যে ব্যবহার পেয়েছিলেন তা ওই রোগশয্যায় থাকা অবস্থায় সবিশেষ বন্ধু অরুণকে সুদীর্ঘ এক চিঠিতে লিখছেন-আমার খবর শরীর মন দুই-ই দুর্বল। অবিশ্রান্ত প্রবঞ্চনার আঘাতে মানুষ যে সময় পৃথিবীর ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠে ,ঠিক সেই সময় এসেছে আমার জীবনে। হয়তো এইটাই মহত্তর সাহিত্য সৃষ্টির সময় (ভয় নেই,আঘতিটা প্রেম ঘটিত নয়)। আজকাল চারিদিকে কেবল হতাশার শকুনি উড়তে দেখছি। হাজার হাজার শকুনি ছেয়ে ফেলেছে আমার ভবিষ্যৎ আকাশ।পরীক্ষা দিয়ে উঠেই গত তিন মাস ধরে খাটছি। বুঝতে পারিনি স্বাস্থ্যের অযোগ্যতা। হঠাৎ গত সপ্তাহে হৃদযন্ত্রের দুর্বলতায় শয্যা নিলুম। একটু দাঁড়াতে পেরেছি গত দেড় মাস ধরে জন্যে অবিরাম আন্তরিক খাটুনির পুরস্কার হিসাবে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পেলুম যাবতীয় খরচের জন্যে পাঁচঠি টাকা। আর পেলুম চারদিনের জন্যে পার্টি হাসপাতালে ওষুধপথ্যহনী কোমল শয্যা।এতবড় পরিহাসের সম্মুখীন জীবনে আর কখনো হইনি। আমার লেখকসত্তা অভিমান করতে চায়, কর্মীসত্তা চায় আবার উঠে দাঁড়াতে! দুই সত্তার দ্ব›েদ্ব কর্মীসত্তাই জয়ী হতে চলেছে; কিন্তুু কি করে ভুলি, দেহ আর মনে আমি দুর্বল , একান্ত অসহায় আমি। আমার প্রেম সর্ম্পকে সম্প্রতি আমি উদাসীন। অর্থোপার্জন সম্পর্কেই কেবল আগ্রহশীল। কেবলই অনুভব করছি টাকার প্রয়োজন। শরীর ভালো করতে দরকার অর্থের ,ঋণমুক্ত হতে দরকার অর্থের; একখানাও জামা নেই, সেজন্যও যে বস্তুুর প্রয়োজন তা হচ্ছে অর্থ। সুতরাং অর্থের অভাবে  কেবলই নিরর্থক মনে হচ্ছে জীবনটা। প্রিয় পাঠক ২শে জ্যৈষ্ঠ ১৩৫৩ সালে ২০, নারকেল ডাঙ্গা মেইন রোড , কলকাতা থেকে দুপুর বেলায় লিখিত এই চিঠির মর্মার্থ উপলব্ধি করলে বোঝা যায় কত বড় কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন হলে আপনার-আমার প্রাণের কবি, চেতনার কবি, সাম্যের কবি ; কবি সুকান্ত বন্ধু অরুণকে উপোরক্ত মর্ম স্পর্শী কথা গুলো বলেছিলো। একেই হয়তো দার্শনিকেরা , বিশ্লেষকেরা বলে থাকে ‘কঠিন বাস্তবতা’। কর্মময় জীবনের শেষ অধ্যায়ের দিকে এসে মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছিলেন সুকান্ত। নিজের জীবনীশক্তির উপর আস্থা ছিলো না তাঁর। তিনি হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন এই কর্মময় পৃথিবীতে তাঁর উপ¯িথতি আর বেশি দিনের জন্য নয়। মহাকালের প্রস্থান ধ্বনি এই বুঝি বেজে উঠলো। এমনই এক আশঙ্কাজনক কতা অন্য একটি  চিঠিতে অরুণের উদ্দেশ্যে লিখছে আমার কর্মশক্তিরও যাত্রার প্রারম্ভেই মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছে এই ধূলিধূসরিত কুয়াশাচ্ছন্ন পথেই। অসাদের শূন্যতা জানিয়ে দেয় পথ অনেক কিন্তু পেট্রল নেই। তোমরা দিতে পারো এই পেট্রলের সন্ধান? বহুদিন অব্যবহৃত ষ্টীয়ারিং-এ মরচে পড়ে গেছে, সে আর নড়তে চায় না, ঠিক পথে  চলায় না আমাকে। তোমরা মুছিয়ে দিতে পারো সেই মলিনতা, ঘুচিয়ে দিতে পারো তার অক্ষমতা? কবি সুকান্তের শারীরিক অবস্থা দিনদিন খারাপ থেকে খারাপতর হতে লাগলো। পার্টির প্রথম সারির নেতারা হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন সুকান্ত আর বেশি দিন আমাদের মাঝে থাকবে না। তৎকালীন যক্ষা রোগের তেমন কোন সুচিকিৎসা ভারতে না থাকায় তাঁদের এই ধারণা দিনকে দিন বদ্ধমূল হতে শুরু করলো। তাই সবাই মিলে ‘রেড-এন্ড কিওর হোম’ হাসপাতালে অধিকাংশ কমরেড উপস্থিত হলেন ১৯৪৬ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর। তাঁদের সঙ্গে কমরেড সুকান্তের যে অন্তরঙ্গ মুহূর্ত হয়েছিলো সেই বর্ণনা মাসতুতো ভাই শ্রীভূপেন চক্রবর্তীকে ১২ সেপ্টেম্বর প্রেরিত এক চিঠিতে সুকান্ত আবেগঘন ভাষায় জানাচ্ছে তবে কাল আমার জীবনে সব থেকে স্মরণীয় দিন গেছে। মুক্ত বিপ্লবীরা সদলবলে (অনন্ত সিং বাদে) সবাই আমাদের এখানে এসেছিলো। অনুষ্ঠানের পর তাঁরা আমার কাছে এলেন আমাকে শুভেচ্ছা জানাতে। বিপ্লবী সুনীল চ্যাটার্জী আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। আর একজন বিপ্লবী তাঁর গলার মালা খুলে পরিয়ে দিলেন আমায়। গনেশ ঘোষ বললেন-আমি আপনাকে ভীষণ ভাবে চিনি।ফ্রান্সে আর আমেরিকায় আমার জীবনী বেরুবে যেদিন শুনলাম সেদিনও এতো স্বার্থক মনে হয়নি ,আমার এই রোগর্জীণ অশিক্ষিত জীবনকে। কাল সন্ধ্যার একটি ঘটনা পরিপূর্ণতায় উপচে পড়েছিল। ১১ই সেপ্টেম্বরের এই সন্ধ্যা আমার কাছে অবিস্মরণীয়। সুকান্ত আজীবন বাম রাজনীতির পুরোধা হয়ে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। কোন কিছুর বিনিময়ে তিনি রাজনীতি থেকে দূরে থাকেন নি। সমাজ,দেশ তথা সর্বহারা শ্রমিক শ্রেণির জন্য তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম ছিলো একান্ত হৃদয়জাত বিপ্লবী বন্দনা। কিন্তু সেই সময়ের মরণঘাতী যক্ষ¥া রোগ তাঁর বিপ্লবী চেতনার লাগাম টেনে ধরলো। ১৯৪৭ সালের ১৩ই মে ‘জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংশস্তুপ-পিঠে’ চিরদিনের জন্য হার মানতে হলো সুকান্তকে। রয়ে গেলো ছাড়পত্রের অবিনাশী সেই মহামন্ত্র মথিত আহবান ‘এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান’। আমরা  জানিনা কবি সুকান্ত এই পৃথিবীতে যে শিশুর আহবান করেছিলেন সেই শিশু আজও পৃথিবীতে এসেছে কীনা। তাঁর ছেড়ে দেওয়া স্থান আজও কেউ পূর্ণ করেছে কীনা। কিংবা সেই শূণ্য স্থান আদৌ পূর্ণ হওয়ার কীনা। মহাকালের শিলালিপিতে তা অনন্ত জিঞ্জাসা হয়ে থাকবে অনন্তকাল। এদিকে আমরা যুগযুগান্তর ধরে খুঁজতে থাকবো কবি সুকান্ত, বিপ্লবী সুকান্ত, প্রেমিক সুকান্ত, মানুষ সুকান্ত আর পত্র সাহিত্যের সুকান্তকে।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here