গোটা রাজধানীতেই হবে মেট্রোরেল

0
48

স্বপ্ন নয়, উঁকি দিয়ে আশা জাগিয়েছে মেট্রোরেল। এ স্বপ্ন পাখা মেলবে রাজধানীজুড়ে। মেট্রোরেলের কাজ অনেক আগেই জোরেসোরে শুরু হয়েছে। প্রথম ধাপের কাজ দ্রæতই শেষ হবে বলে জানানো হয় সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে। ২০৩৫ সাল নাগাদ রাজধানীজুড়ে মেট্রোরেলের প্রসারতা বাড়াতে চায় সরকার। এজন্য নেয়া হয়েছে মোট পাঁচটি মাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) প্রকল্প। এ বিষয়ে স¤প্রতি সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, গুলশানের হলি আর্টিসানে সন্ত্রাসী হামলায় মেট্রোরেলের সাত জাপানি পরামর্শক নিহত হয়েছিলেন। মর্মান্তিক ওই ঘটনায় প্রকল্পের কাজ ছয় মাস পিছিয়ে যায়। দ্রæত কাজ করে ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া সম্ভব হয়েছে। ২০১৯ সালের মধ্যে দিয়াবাড়ী থেকে আগারগাঁও এবং ২০২০ সালের মধ্যে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেলের কাজ শেষ হবে। জাপান মানসম্পন্ন কাজ করছে। তাই নির্ধারিত সময়ের আগেই কাজ শেষ হবে। জানা গেছে, রাজধানীকে সচল করতে এ মেট্রোরেলের পর আরও চারটি মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে। বলা যায় রাজধানীর বড় একটা অংশ এ প্রকল্পের আওতায় আসবে। গতি বাড়বে নাগরীর মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থায়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে পাঁচটি মেট্রোরেল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এর চারটি হবে আন্ডারগ্রাউন্ডে, অন্যটি হবে এলিভেটেড মেট্রোরেল। পাঁচটি মেট্রোরেলের মধ্যে প্রথমটি এলিভেটেড মেট্রোরেল যার কাজ চলমান। এর একটি পর্ব ২০১৯ সালে এবং আরেকটি পর্ব ২০২০ সালে শেষ হবে। আন্ডারগ্রাউন্ডে নির্মিত হওয়া চারটি মেট্রোরেলের মধ্যে দুটির কাজ আগামী ২০২০ সালের মধ্যে শুরুর জন্য সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে, যার একটি ২০২৫ এবং অপরটি ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। এছাড়া অপর দুটির কারিগরি সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে এবং চুক্তি সাপেক্ষে ২০৩৫ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সড়ক পথে যানজটসহ ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকাংশে হ্রাস পাবে।
এমআরটি-৬ প্রকল্প : ২০ কিলোমিটার দূরত্বের প্রথম মেট্রোরেলটি ঢাকার উত্তরা-মিরপুর-আগারগাঁও-বিজয় সরণি-কারওয়ান বাজার-শাহবাগ-ঢাকা ইউনিভার্সিটি হয়ে মতিঝিলে গিয়ে শেষ হবে। এ মেট্রোরেল পথের নাম দেয়া হয়েছে ‘ঢাকা মাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি-৬)’। এ রেলপথে ১৬টি স্টেশন রয়েছে : উত্তরা নর্থ-উত্তরা সেন্টার-উত্তরা দক্ষিণ-পল্লবী-মিরপুর-১১ (আইএসটি)-মিরপুর ১০-কাজীপাড়া (রোকেয়া সরণি)-শেওড়াপাড়া (তালতলা)-আগারগাঁও-বিজয় সরণি (খামারবাড়ী)-ফার্মগেট-কারওয়ান বাজার (হোটেল সোনারগাঁও)-শাহবাগ (জাতীয় জাদুঘর)-ঢাকা ইউনিভার্সিটি (দোয়েল চত্বর)-সচিবালয় (তোপখানা রোড) এবং মতিঝিল (জাতীয় স্টেডিয়াম ও বাংলাদেশ ব্যাংক)। এ রেলপথের প্রথম ধাপে ছয়টি করে যাওয়া ও আসা মিলে ১২টি এবং পরবর্তী ধাপে আরও ছয়টি করে ১২টি হিসাবে যাওয়া ও আসার জন্য মোট ২৪টি ট্রেন থাকবে। ১৬টি স্টেশনের প্রথম নয়টি স্টেশন : উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত প্রকল্পটি ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য দেশীয় ঢাকা মাস ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড এবং বিদেশি কোম্পানি ইটালিয়ান-থাই ডেভেলপমেন্ট এবং সিনো হাইড্রো করপোরেশন লিমিটেডের যৌথ সহযোগিতায় কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। বাকি স্টেশনগুলোর মধ্যে আগারগাঁও থেকে কারওয়ান বাজার এবং কারওয়ান বাজার থেকে মতিঝিল পর্যন্ত প্রকল্পের কাজ যথাক্রমে দেশীয় কোম্পানির যৌথ সহযোগিতায় টাক্কেন করপোরেশন এবং সুমিটোমো মিটসুই কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড করবে। আগামী ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক আফতাব উদ্দীন খান। তিনি বলেন, রাত-দিন কাজ চলছে। নির্দিষ্ট মেয়াদে কাজ শেষ করতে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সরেজমিন গেলে সেটা যে কারও চোখে পড়বে। জানা গেছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার গতিতে চলা ট্রেনে উত্তরা থেকে মতিঝিলে আসতে সময় লাগবে মাত্র ৩৭ মিনিট। খরচও সাশ্রয় হবে। প্রতিটি ট্রেনে ৬টি কম্পার্টমেন্ট থাকবে যাতে প্রায় ১৭০০ যাত্রী বহন করা যাবে। ফলে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৬০ হাজার এবং প্রতিদিন প্রায় পাঁচ লাখ যাত্রী যাতায়াত করতে পারবে। প্রাথমিকভাবে চার মিনিট পরপর স্টেশনগুলোতে ট্রেন আসবে। ছয়টি করে মোট ২৪টি ট্রেন থাকবে এবং পরবর্তীতে ট্রেনের সংখ্যা ছয় থেকে আটটিতে উন্নীত করা হবে। ফলে মোট ট্রেনের সংখ্যা দাঁড়াবে ৩২টি।প্রকল্পটি জাপানের আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা জাইকার সার্বিক সহযোগিতায় সম্পন্ন হবে এবং ব্যয় হবে ২২ হাজার কোটি টাকা।
এমআরটি-১ প্রকল্প : এটি ২৬ দশমিক ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ প্রথম আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রোরেল এবং এমআরটি-৬ এরপর দ্বিতীয় প্রকল্প। এই মেট্রোরেলের নাম দেয়া হয়েছে ‘ঢাকা মাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি-১)। এ প্রকল্পের প্রথম ধাপে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১৬ দশমিক চার কিলোমিটার পথটি বিমানবন্দর রুট এবং পরের ধাপে কুড়িল-বসুন্ধরা হয়ে পূর্বাচল পর্যন্ত ১০ দশমিক দুই কিলোমিটার মেট্রোরেল পথটি পূর্বাচল রুটে বিভক্ত থাকবে। বিমানবন্দর রুটটি প্রায় সাড়ে ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং এখানে ১২টি স্টেশন থাকবে। স্টেশনগুলো হলো- শাহজালাল বিমানবন্দর-বিমানবন্দর টার্মিনাল ৩-খিলক্ষেত-যমুনা ফিউচার পার্ক-বারিধারা (নতুন বাজার)-উত্তর বাড্ডা-গুলশান ১-বাড্ডা (হাতিরঝিল)-রামপুরা-মালিবাগ-রাজারবাগ হয়ে কমলাপুর। নতুন বাজার-বারিধারা স্টেশনের সঙ্গে এমআরটি-৫ এর রুটের আন্তঃসংযোগ থাকবে। এ পথে শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে খিলক্ষেত স্টেশন পর্যন্ত এলিভেটেউ মেট্রোরেল হবে। পরবর্তীতে খিলক্ষেত স্টেশন থেকে যমুনা ফিউচার পার্ক এবং বারিধারা নতুন বাজার পর্যন্ত আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রোরেল হবে। বারিধারা এলিভেটেড স্টেশন থেকে উত্তর বাড্ডা-গুলশান-১-বাড্ডা-রামপুরা স্টেশন পর্যন্ত এলিভেটেড রেলপথ হবে। রামপুরা এলিভেটেড স্টেশন থেকে মালিবাগ-রাজারবাগ-কমলাপুর পর্যন্ত আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রোরেল হবে। পূর্বাচল রুটে ১০দশমিক দুই কিলোমিটার পথে নয়টি স্টেশন থাকবে। পূর্বাচলগামী অংশটি বারিধারা নতুন বাজার থেকে যমুনা ফিউচার পার্ক-বসুন্ধরা (পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি)-মাস্তুল-পূর্বাচল পশ্চিম-পূর্বাচল সেন্ট্রাল-পূর্বাচল টার্মিনাল (পূর্বাচল সেক্টর-৭) পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। এই পথে নতুন বাজার বারিধারা এলিভেটেড স্টেশন থেকে যমুনা ফিউচার পার্ক-বসুন্ধরা পর্যন্ত আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রোরেল হবে। তবে বসুন্ধরা স্টেশনটি এলিভেটেড স্টেশনে থাকবে এবং মাস্তুল-পূর্বাচল ওয়েস্ট পয়েন্ট-পূর্বাচল সেন্ট্রাল-পূর্বাচল টার্মিনাল পর্যন্ত এলিভেটেড মেট্রোরেল হবে। ফলে এ রুটে নতুন বাজার ও যমুনা ফিউচারপার্ক স্টেশন দুটো আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকবে এবং বসুন্ধরা থেকে পূর্বাচল টার্মিনাল পর্যন্ত সাতটি স্টেশন হবে এলিভেটেড। সড়ক ও সেতু বিভাগ সূত্র জানায়, প্রকল্পটির জন্য ইতোমধ্যে ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কর্ডিনেশন অথরিটি (ডিটিসিএ) এবং জাইকার মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। ২০২০ সালে কাজ শুরু করে ২০২৫ সালের মধ্যে শেষ করার কথা। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৯ হাজার কোটি টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে টাকা ও সময় উভয়ই সাশ্রয় হবে। ওই মেট্রোরেলে প্রতিদিন প্রায় ১৪ লাখ যাত্রী পরিবহন করতে পারবে, যা পরবর্তীতে ১৯ লাখে উন্নীত হবে।
এমআরটি-৫ প্রকল্প : এমআরটি-৫ হচ্ছে দ্বিতীয় আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রোরেল। কিন্তু মেট্রোরেল হিসেবে তৃতীয় বলা হবে। এ মেট্রোরেল পথে দুটি রুট। একটি রাজধানীর উত্তর দিক থেকে এবং অপরটি দক্ষিণ দিক থেকে। উত্তর দিক থেকে ২০ কিলোমিটার দূরত্বে মোট ১৪টি স্টেশন থাকবে। ১৪টি স্টেশনের মধ্যে নয়টি স্টেশন আন্ডারগ্রাউন্ডে ১৪ কিলোমিটার পথজুড়ে বিস্তৃত হবে। বাকি পাঁচটি স্টেশন এলিভেটেড অবস্থায় ছয় কিলোমিটার পথজুড়ে থাকবে। অপরদিকে দক্ষিণ দিক থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরত্বে মোট আটটি স্টেশন থাকবে, যার পুরোটাই আন্ডারগ্রাউন্ডে হবে। উত্তর দিকের স্টেশনগুলো হলো-হেমায়েতপুর (সাভার) বলিয়াপুর-বিলামালিয়া (মধুমতি)-আমিন বাজার-গাবতলী-দারুসসালাম (টেকনিক্যাল)- মিরপুর-১-মিরপুর-১০-মিরপুর ১৪-কচুক্ষেত-বনানী-গুলশান-২-নতুন বাজার হয়ে ভাটারা পর্যন্ত। স্টেশনগুলোর মধ্যে আমিন বাজার থেকে নতুন বাজার পর্যন্ত নয়টি স্টেশন আন্ডারগ্রাউন্ডে এবং বাকি স্টেশনগুলো এলিভেটেড হবে। অন্যদিকে দক্ষিণ দিকের স্টেশনগুলো হচ্ছে গাবতলী-আদাবর-মোহাম্মদপুর-কলাবাগান-কারওয়ান বাজার-হাতিরঝিল-দক্ষিণ বাড্ডা হয়ে আফতাব নগর পর্যন্ত। সবগুলো স্টেশনই হবে আন্ডারগ্রাউন্ডে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ইতোমধ্যে জাইকা ও ঢাকা ডিটিসিএর মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এ প্রকল্পের কাজ ২০২০ সালের মধ্যে শুরু হওয়ার কথা। শেষ হবে ২০২৮ সালের মধ্যে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রতিদিন প্রায় ১৫ লাখ যাত্রী পরিবহন করতে পারবে।
এমআরটি-২ প্রকল্প : ঢাকা ইপিজেড থেকে কমলাপুর আইসিডি পর্যন্ত ৪০ কিলোমিটার আন্ডারগ্রাউন্ড এমআরটি-২ প্রকল্প ২০৩৫ সালের মধ্যে করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। স্টেশনগুলো হবে আশুলিয়া-সাভার-গাবতলী-ঢাকা ইউনিভার্সিটি-ডিএসসিসি নগর ভবন এবং কমলাপুর পর্যন্ত।
এমআরটি-৪ প্রকল্প : কমলাপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রোরেল প্রকল্প ২০৩৫ সালের মধ্যে করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here