রেলের মেগা প্রকল্পে যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন

0
74

রেলের মেগা প্রকল্পে যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ব্যয় হচ্ছে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ। চলমান ছোট-বড় বেশকিছু প্রকল্প। এমনকি দেশজুড়ে রেলের উন্নয়নেও নেয়া হয়েছে মেগা প্রকল্প। এসব প্রকল্পের ওপর ভিত্তি করে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।তারা বলছেন, স্বস্তির রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাই সরকারের স্বপ্ন। আশা করা যায়, চলমান প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে দেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন এক মাইলফলক তৈরি হবে। এ প্রসঙ্গে রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক বলেন, ‘উন্নত রেলওয়ে ব্যবস্থা শেখ হাসিনা সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। প্রধানমন্ত্রী রেলওয়েকে সাধারণ মানুষের পরিবহন হিসেবে পরিণত করতে চান। সে লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। তিনি বলেন, ‘একমাত্র আওয়ামী লীগ সরকারই দেশের রেলওয়ে ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করেছে। রেলকে আধুনিকায়ন করতে মেগা প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। আরও প্রকল্প নেয়া হবে, যা পরিকল্পনায় রয়েছে। এগুলোর বাস্তবায়ন শেষ হলে বদলে যাবে এ খাতের চেহারা।’
রেল বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশের সব জেলাকে রেলওয়ে নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে কাজ করছে সরকার। ঢাকা থেকে পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে ভাঙ্গা-নড়াইল হয়ে যশোর পর্যন্ত ১৭২ কিলোমিটার সিঙ্গেল লাইন স্থাপন প্রকল্পটি সরকারের বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প। এছাড়া ভাঙ্গা থেকে বরিশাল হয়ে পায়রা সমুদ্র বন্দর পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ঢাকা শহরে সার্কুলার ট্রেন চালুর ব্যাপারে সমীক্ষাও চলছে। খুলনা থেকে দর্শনা পর্যন্ত ডাবল লাইন এবং পার্বতীপুর থেকে কাউনিয়া পর্যন্ত ডুয়েল গেজ রেলপথ নির্মাণ হবে। লাকসাম থেকে আখাউড়া পর্যন্ত ডাবল লাইন নির্মাণ হচ্ছে যেন পদ্মা সেতু চালুর দিন থেকেই ট্রেন চলাচল করতে পারে। পদ্মা সেতুর রেল প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সাউথ এশিয়ার সাব-রিজিওনাল ইকোনোমিক কো-অপারেশনের সদস্য দেশসমূহের মধ্যে আন্তঃদেশীয় যাত্রী ও মালামাল পরিবহনে কানেকটিভিটি স্থাপিত হবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। বর্তমান সরকার ২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সময়ে সারাদেশে রেলওয়ের উন্নয়নে ৫১টি প্রকল্প হাতে নেয়। ব্যয় হয় নয় হাজার ২২ কোটি টাকা। এ সময়ে ২৮০ কিলোমিটার নতুন রেলপথ নির্মাণ, ৭৯টি নতুন স্টেশন নির্মাণ, ২৪০টি নতুন রেলসেতু নির্মিত হয়। যাত্রী সাধারণের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কথা বিবেচনা করে আন্তঃনগর ও মেইল ট্রেনসহ সর্বমোট ১১৪টি নতুন ট্রেন বিভিন্ন রুটে চালু রয়েছে। অনলাইন টিকিটিং ব্যবস্থা চালু, ট্রেনট্র্যাকিং অ্যান্ড মনিটরিং সিস্টেম চালু এবং যাত্রীদের তথ্য প্রদানের জন্য কল সেন্টার চালু হয়েছে।
পদ্মা সেতু রেল লাইন নির্মাণ প্রকল্প : পদ্মা সেতু রেলপথ ব্যবহার করে ঢাকা থেকে মাওয়া হয়ে জাজিরা-ভাঙ্গা-যশোর পর্যন্ত দক্ষিণ-পশ্চিমের ২৩টি জেলায় যাওয়া যাবে। এ রেলপথের দূরত্ব ১৬৯ কিলোমিটার। চায়না রেলওয়ে গ্রুপ এ প্রকল্পের কাজ হাতে নিয়েছে। ৩৫ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পে ১৬৯ কিলোমিটার নতুন রেললাইন স্থাপিত হলে ঢাকা থেকে খুলনায় ট্রেনযাত্রা সাড়ে তিন ঘণ্টায় নেমে আসবে। বর্তমানে ঢাকা থেকে খুলনায় রেলপথের দূরত্ব ৪১২ কিলোমিটার, যেতে লাগে নয় ঘণ্টা সময়। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ঢাকা থেকে খুলনার দূরত্ব ২১৩ কিলোমিটার কমবে। ২০২২ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। এ রেল সংযোগটি পরবর্তীতে পশ্চিমে ভারতের কলকাতার সঙ্গে যশোর বেনাপোলের মাধ্যমে এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল সংযোগের মাধ্যমে চীন-মিয়ানমার-ভারত-বাংলাদেশ রেলওয়ে করিডোরে সংযুক্ত হবে। ফলে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক প্রসার ঘটবে।
ঢাকা-ফরিদপুর-বরিশাল-পায়রা রেলওয়ে প্রকল্প : সরকার প্রাথমিকভাবে ফরিদপুর (ভাঙ্গা) থেকে বরিশাল পর্যন্ত প্রায় ১০০ কিলোমিটার রেলওয়ে ট্রাক নির্মাণের কাজ হাতে নিয়েছে। পরবর্তীতে আরও ৮৫ কিলোমিটার বাড়িয়ে ফরিদপুর থেকে পায়রা পর্যন্ত ১৮৫ কিলোমিটার রেলপথ সম্প্রসারিত হবে। এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে নয় হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। ঢাকা থেকে পায়রা পর্যন্ত ২৪০ কিলোমিটার রেলওয়ে নির্মাণ করতে খরচ পড়বে ছয় হাজার কোটি টাকা। ব্রিটিশ কোম্পানি ডিপি রেলের সঙ্গে এ প্রকল্পের কাজের জন্য ইতোমধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। সম্পূর্ণ প্রকল্পটি (ঢাকা থেকে পায়রা) বাস্তবায়ন হতে ২০২৪ সাল লেগে যাবে।
আখাউড়া-আগরতলা রেলওয়ে প্রকল্প : দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও পারস্পরিক সহযোগিতার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আখাউড়া-আগরতলা পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এ রেলপথের মধ্যে পাঁচ কিলোমিটার ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা এবং ১০কিলোমিটার বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়া উপজেলায় অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশের অংশে আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশন থেকে গঙ্গাসাগর রেলওয়ে স্টেশন হয়ে সীমান্তবর্তী মনিয়ন্দ ইউনিয়নের শিবনগর পর্যন্ত রেলপথ হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় পাঁচ দশমিক ছয় মিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ হবে। গত বছরের ৩১ জুলাই এ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কার্যসম্পাদন করে ২০১৯ সালের শুরুতেই কার্যকরভাবে এটি ব্যবহারের কথা। এ রেলপথ হবে ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের একটি অংশ। রেলপথে পাঁচটি স্টেশন এবং ট্রেনের গতি হবে ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার।
যমুনা নদীর ওপর বিকল্প রেলসেতু : যমুনা নদীর ওপর বিদ্যমান বঙ্গবন্ধু সেতুর সমান্তরালে বিকল্প একটি আলাদা রেলসেতু নির্মাণকাজ হাতে নিয়েছে সরকার। বর্তমান বঙ্গবন্ধু সেতুটি পুরনো হওয়ায় রেল চলাচলে গতি ও মালামাল বহনে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ কারণে বিকল্প হিসেবে বর্তমান রেলওয়ের পশ্চিম পাশে দ্বিতীয় রেলওয়ে ব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার খরচ হবে। দ্বৈত গেজ ডাবল ট্রাকে ব্রিজ (চার দশমিক আট কিলোমিটার) তৈরি করতে সময় লাগবে ২০২০ সাল পর্যন্ত। তবে ব্রিজের দু-পাশে ফুলছড়ি ঘাট (গাইবান্ধা) থেকে বাহাদুরাবাদ ঘাট (সিরাজগঞ্জ) পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার অ্যাপ্রোচ রোড হবে যা শেষ করতে সময় লাগবে ২০২২ সাল। ২০২৩ সালে টেস্ট রান সমাপ্ত করে একই বছরের শেষের দিকে সম্পূর্ণভাবে ওই রেলপথ চালু হওয়ার কথা। এই রেলসেতুর ওপর দিয়ে গ্যাস ট্রান্সমিশন লাইন এবং অপটিক্যাল ফাইবার লাইনও নেয়া হবে। রেলপথটি ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ের (টিএআর) অংশ হিসেবে নেপাল, ভুটান ও ভারতের সঙ্গে আঞ্চলিক যোগাযোগ উন্নত করবে। এছাড়া দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
ঢাকা-যশোর ১৭২ কিলোমিটার রেলওয়ে প্রকল্প : ঢাকা-মাওয়া-যশোর রেলওয়ে প্রকল্পটি ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-চীন-ভারত ও মিয়ানমার (বিসিআইএম) করিডোরের সাব রিজিওনাল রুট হিসেবে ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে (টিএআর) অংশ হিসেবে পরিগণিত হবে। এ প্রকল্পটিতে মোট ১৪টি সেকশন থাকবে । এগুলো হলো- কেরানীগঞ্জ-নিমতলা-শ্রীনগর-মাওয়া-জাজিরা শিবচর-ভাঙ্গা-নগরকান্দা-মুকসুদপুর-মহেশপুর-লোহাগড়া-নড়াইল-জামদিয়া ও পাদমাবিলা। বর্তমানে ছয়টি স্টেশন ওই রেলওয়ের সঙ্গে সংযুক্ত হবে। এ স্থানগুলো হচ্ছে- ঢাকা-গেন্ডরিয়া-ভাঙ্গা-কাশিয়ানী-রূপদিয়া ও সিনজিয়া। প্রকল্পটি দুই পর্বে শেষ হবে। প্রথম পর্বে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা (পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে) যা জুন ২০২০ সালের মধ্যে এবং দ্বিতীয় পর্বে ভাঙ্গা-যশোর, যা জুন ২০২২ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৩ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার। বিদেশি কোম্পানি চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এ রেলপথে ১০০টি বগি লাগানো হবে, যার মাধ্যমে বহুসংখ্যক যাত্রী কম খরচে ও কম সময়ে যাতায়াত করতে পারবে। এছাড়া ঢাকা-যশোর রুটে ১৮৫ কিলোমিটার এবং ঢাকা-খুলনা রুটে ২১২ কিলোমিটার দূরত্ব কমবে।
মংলা-খুলনা ৬৫ কিলোমিটার রেলওয়ে নির্মাণ : মংলা থেকে খুলনা পর্যন্ত রূপসা নদীর ওপর দিয়ে রেলওয়ে সেতুসহ ৬৫ কিলোমিটার সিঙ্গেল লাইন ব্রডগেজ রেলওয়ে ট্র্যাক নির্মাণের কাজ হাতে নিয়েছে সরকার। রূপসা নদীর ওপর পাঁচ কিলোমিটার রেলওয়ে সেতু নির্মিত হবে। এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৪০ বিলিয়ন ডলার। সম্পূর্ণ কাজ শেষ হতে ২০২০ সাল লেগে যাবে। মংলা থেকে খুলনা পর্যন্ত আটটি রেলওয়ে স্টেশন নির্মিত হবে। পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হলে ঢাকা-খুলনা-মংলা রেলওয়ের নেটওর্য়াক আরও জোরালো হবে এবং মংলা বন্দর ব্যবহারের ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমবে। এছাড়া খুলনা থেকে দর্শনা পর্যন্ত আলাদা ২১৭ কিলোমিটার রেলওয়ে ট্র্যাক স্থাপনের কাজ চলছে। এটি নির্মাণের ফলে বাংলাদেশের পাশাপাশি নেপাল, ভুটান ও ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে।
খুলনা-দর্শনা ২১৭ কিলোমিটার রেলওয়ে নির্মাণ : খুলনা থেকে দর্শনা পর্যন্ত বর্তমান সিঙ্গেল লাইনের পাশ দিয়ে ২১৭ কিলোমিটার ডাবল রেল লাইন স্থাপনের কাজ ইতোমধ্যে হাতে নিয়েছে সরকার। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ৩৫ বিলিয়ন (সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা) ডলার খরচ হবে। আগামী ২০২২ সালের মধ্যে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা।
পদ্মা সেতুর কাজ সম্পন্ন হলে ঢাকা-খুলনা ও মংলা-খুলনা-দর্শনা একই রেলওয়ে নেটওয়ার্কের মধ্যে আসবে। ফলে একদিকে যেমন মংলা বন্দর ব্যবহারে চট্টগ্রাম বন্দরের চাপ কমে যাবে, অন্যদিকে মংলা বন্দর ব্যবহার করে বাংলাদেশের পাশাপাশি নেপাল, ভুটান ও ভারতের মালামাল পরিবহনের ক্ষেত্রে টিএআর’র অংশ সহজলভ্য হবে। এছাড়া সুদীর্ঘ রেলপথকে ঘিরে বিভিন্ন খাতে বিভিন্ন পেশার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here