দেশের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ করার অধিকার কারো নেই : মিয়ানমার সেনাপ্রধান

0
51

 জাতিসংঘ ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন রোহিঙ্গা ‘গণহত্যার’ জন্য মিয়ানমারের শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাদের বিচারের সুপারিশ করার এক সপ্তাহের মাথায় দেশটির সেনাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং বলেছেন, তার দেশের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ করার অধিকার কোনো দেশ, সংস্থা বা গোষ্ঠীর নেই। মিয়ানমারে গণতন্ত্র বিকাশের পথ তৈরি করতে ‘সশস্ত্র সংঘাত থামিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার’ কাজ সেনাবাহিনী চালিয়ে যাবে এবং রাখাইনের ঘটনা নিয়ে ‘অগ্রহণযোগ্য কোনো দাবি’ সেনাবাহিনী মেনে নেবে না বলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) রাখাইনের ঘটনা নিয়ে প্রাথমিক তদন্ত শুরুর পর এই প্রথম জেনারেল মিন অং হ্লাইং প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কথা বললেন। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত পত্রিকা মায়াবতির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রোববার নে পি দোতে সেনাবাহিনীর এক অনুষ্ঠানে গণতন্ত্র, জাতিসংঘ ও রাখাইন প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলেন জেনারেল মিন অং হ্লাইং। তিনি বলেন, বিশ্বের একেক দেশের গণতন্ত্র চর্চার ধরন একেক রকম। একটি দেশ সেই ধরনের গণতন্ত্রের চর্চা করে, যা তার জন্য উপযুক্ত। সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে মিয়ানমারও স্বাধীন একটি পররাষ্ট্র নীতির চর্চা করে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ একটি অবস্থান বজায় রেখে চলে। তাছাড়া জাতিসংঘের একটি সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে মিয়ানমার জাতিসংঘের যেসব চুক্তিতে সই করেছে, সেগুলো প্রতিপালন করে। প্রতিটি দেশ যেহেতু নিজের মত করে আলাদা মানদÐ ও আদর্শ নির্ধারণ করে, সেহেতু তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার বা তাদের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার কোনো দেশ, কোনো সংস্থা বা কোনো গোষ্ঠীর নেই। অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে কথা বলতে গেলে যেমন ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে, একইভাবে কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রেও একই ফল হতে পারে বলে সতর্ক করেন মিয়ানমারের সেনাপ্রধান। ২০১৭ সালের ২৫ অগাস্টের পর রাখাইনে সেনাবাহিনীর যে অভিযানের কারণে লাখ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে, সেই অভিযানকে ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ হিসেবে বর্ণনা করে আসছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘ গঠিত স্বাধীন আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন বলেছে, রাখাইনে যে ধরনের অপরাধ হয়েছে, আর যেভাবে তা ঘটানো হয়েছে, মাত্রা, ধরন এবং বিস্তৃতির দিক দিয়ে তা ‘গণহত্যার অভিপ্রায়কে’ অন্য কিছু হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টার সমতুল্য। গত ১৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে উপস্থাপন করা ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য মিয়ানমারের সেনাপ্রধান এবং জ্যেষ্ঠ পাঁচ জেনারেলকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) বা বিশেষ ট্রাইব্যুনাল করে বিচারের মুখোমুখি করার কথা বলা হয়েছে।
এই মিশনের প্রধান মারজুকি দারুসমান বলেছেন, তাতমাদো যতদিন আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে, ততদিন শান্তি ফেরানো সম্ভব হবে না। মিয়ানমারের উন্নয়ন এবং একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয়ে ওঠার পথে দেশটির সেনাবাহিনীই সবচেয়ে বড় বাধা। এদিকে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলামদের ওপর মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের বিষয়ে প্রাথমিক তদন্তও শুরু করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত। আন্তর্জাতিক চাপে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে গতবছরের শেষ দিকে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করলেও এখনও প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়নি। মিয়ানমারের সেনাপ্রধান বলেন, জনগণের ইচ্ছায় মিয়ানমার বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথে রয়েছে, আর সেজন্য রাজনৈতিক, জাতিগত ও প্রশাসনিক পর্যায়ে সমন্বিতভাবে আলোচনার মধ্যে দিয়ে সশস্ত্র সংঘাতের অবসান ঘটাতে হবে। অভ্যন্তরীণভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠার এই চেষ্টা তাতমাদো (সেনাবাহিনী) অব্যাহত রাখবে। রাখাইন রাজ্যের বুথিডং ও মংডু এলাকায় যা ঘটেছে, সেজন্য অগ্রহণযোগ্য কোনো দাবি তাতমাদো মেনে নিতে পারে না। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী সব কাজ আমরা এগিয়ে নেব। রাখাইনে কয়েকশ বছর ধরে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বসবাসের ইতিহাস থাকলেও ১৯৮২ সালের ওই আইনের মাধ্যমে তাদের নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এবং সরকার রোহিঙ্গা শব্দটি উচ্চারণ না করে বোঝাতে চায় যে, ওই নামে কোনো জাতিগোষ্ঠী মিয়ানমারে নেই। এর বদলে রোহিঙ্গাদের তারা বর্ণনা করে ‘বাঙালি বা বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অবৈধ অভিবাসী হিসেবে। জেনারেল মিন অং হ্লাইং বলছেন, বাঙালিসহ সবার ক্ষেত্রেই ওই আইন প্রযোজ্য। মিয়ানমারে থাকতে হলে ওই আইন মেনেই চলতে হবে। যারা অন্য দেশে পালিয়ে গেছে, এ আইনে যাচাই করেই তাদের ফেরত নেওয়া হবে।  এ বিষয়ে সঠিক তথ্যও প্রকাশ করা হবে।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here