ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন শিক্ষাবিদ ও সমাজ সংস্কারক

0
62

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর । জন্ম :  ২৬ সেপ্টেম্বর ১৮২০। মৃত্যু : ২৯ জুলাই ১৮৯১। উনবিংশ শতকের একজন বিশিষ্ট বাঙালি শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক ও গদ্যকার। তাঁর প্রকৃত নাম ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যে অগাধ পাÐিত্যের জন্য প্রথম জীবনেই তিনি বিদ্যাসাগর উপাধি লাভ করেন। সংস্কৃত ছাড়াও বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় বিশেষ বুৎপত্তি ছিল তাঁর। তিনিই প্রথম বাংলা লিপি সংস্কার করে তাকে যুক্তিবহ করে তোলেন ও অপরবোধ্য করে তোলেন। বাংলা গদ্যের প্রথম সার্থক রূপকার তিনিই। তাঁকে বাংলা গদ্যের প্রথম শিল্পি বলে অভিহিত করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি রচনা করেছেন জনপ্রিয় শিশুপাঠ্য বর্ণপরিচয় সহ, একাধিক পাঠ্যপুস্তক, সংস্কৃত ব্যাকরণ গ্রন্থ। সংস্কৃত, হিন্দি ও ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন সাহিত্য ও জ্ঞানবিজ্ঞান সংক্রান্ত বহু রচনা। অন্যদিকে বিদ্যাসাগর মহাশয় ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারকও। বিধবা বিবাহ ও স্ত্রীশিক্ষার প্রচলন, বহুবিবাহ ও বাল্য বিবাহের মতো সামাজিক অভিশাপ দ‚রীকরণে তাঁর অক্লান্ত সংগ্রাম আজও স্মরিত হয় যথোচিত শ্রদ্ধার সঙ্গে। বাংলার নবজাগরণের এই পুরোধা ব্যক্তিত্ব দেশের আপামর জনসাধারণের কাছে পরিচিত ছিলেন ‘দয়ার সাগর’ নামে। দরিদ্র, আর্ত ও পীড়িত কখনই তাঁর দ্বার থেকে শ‚ন্য হাতে ফিরে যেত না। এমনকি নিজের চরম অর্থসংকটের সময়ও তিনি ঋণ নিয়ে পরোপকার করেছেন। তাঁর পিতামাতার প্রতি তাঁর ঐকান্তিক ভক্তি ও বজ্রকঠিন চরিত্রবল বাংলায় প্রবাদপ্রতিম। মাইকেল মধুস‚দন দত্ত তাঁর মধ্যে দেখতে পেয়েছিলেন প্রাচীন ঋষির প্রজ্ঞা, ইংরেজের কর্মশক্তি ও বাঙালি মায়ের হৃদয়বৃত্তি। বাঙালি সমাজে বিদ্যাসাগর মহাশয় আজও এক প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুরে তাঁর স্মৃতিরক্ষায় স্থাপিত হয়েছে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়। রাজধানী কলকাতার আধুনিক স্থাপত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন বিদ্যাসাগর সেতু তাঁরই নামে উৎসর্গিত।
নিজের বাড়ির সদর দরজা খুলে এক প্রবীণ মানুষ দেখলেন সামনে ডাঁই করে রাখা কাঁটাগাছ। আরেকটু হলে তার ওপর হুমডড় খেয়ে পড়ে রক্তারক্তি হতে পারত। সঙ্গে স্ত্রী। আহত হতে পারতেন তিনিও। সময়মতো চোখে পড়ে গিয়েছিল বলে রক্ষে। ফের পরের দিন। এ বার দরজার সামনে ডাঁই করা এক গাদা জীবজন্তুর লাশ! দেখলেন স্ত্রী। তবু ভয়ডর তো নেই-ই, ভ্রুক্ষেপও না। ইদানীং এ সব যেন গা-সওয়া হয়ে গেছে। ছেলে বিধবাদের বিয়ে দিতে উঠেপড়ে লেগেছেন। গাঁয়ের পÐিতসমাজ ছ্যা ছ্যা করছেন। যুক্তির যুদ্ধে তাঁরা হেরেছেন বটে, কিন্তু ঘুরপথে নাকাল করতে ছাড়ছেন না তাঁরা। তাই দিনের পর দিন দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন সমাজসংস্কারক ছেলের প্রবীণ বাবা-মা। ভগবতী দেবী। ছেলের পরিচয়ই আজও তাঁর একমাত্র পরিচয়। তার আঙালে আশ্চর্য ওই মানবীর জীবনের আখ্যানটুকু জানলই বা ক’জনে! তাঁকে লাগাতার হেনস্থা করার খবর পৌঁছল বিদ্যাসাগরের শ্বশুরমশাই শত্রুঘ্ন ভট্টাচার্যের কাছে। তিনি আবার ক্ষমতাবান ব্যক্তি। গাঁয়ের লোক তাঁকে সমীহ তো করেই, ভয়ও পায়। খবর পেয়ে তিনি সটান হাজির বীরসিংহ গ্রামে। রীতিমতো কঙা ভাষায় সাবধান করে দিলেন গোঁড়া পÐিতসমাজকে। কিন্তু তাতেও যে পুরোপুরি টনক নড়ল পÐিতকুলের, তেমন নয়। উৎপাত চলতেই থাকল। এ বার খবর গেল জাহানাবাদের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ঈশ্বরচন্দ্র ঘোষালের কাছে। তিনি আবার বিদ্যাসাগরের বিশেষ সুহৃদ। ঘোষালমশাই ছদ্মবেশে বীরসিংহে এলেন। সব দেখেশুনে ঠাকুরদাসের কাছে পÐিতদের নাম চাইলেন। ঠাকুরদাস কিছুতেই নামধাম দেবেন না। ভগবতী দেবীও তাই। কিন্তু কেন? দিনের পর দিন যা নয় তাই অত্যাচার করে যাঁরা তাঁদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছেন, তাঁদের নাম দিতে কীসের সঙ্কোচ? গ্রামের ‘নিরীহ’ মানুষগুলো যদি সরকারি রোষে পড়ে যান, বাঁচাবেন কী করে! তাই নাম দিতে তো নারাজ বটেই, উপরন্তু কোনও স‚ত্রে যদি সরকারি তরফে সবটা জানাজানি হয়ে যায়, তাই ঘুম ছুটে যাওয়ার দশা ঠাকুরদাস-ভগবতীর। শেষমেশ একটা উপায় বের করলেন ভগবতীদেবী নিজেই। যাঁরা প্রতিদিন উৎপাত শুরু করেছিলেন, প্রত্যেকের বাডড়-বাডড় হাজির হলেন ভগবতীদেবী। নেমন্তন্ন করলেন সকলকেই। উদ্দেশ্য একটাই। হাকিম সাহেবের যেন মনে হয়, কোথাও কোনও গোলমাল নেই। পÐিতকুলের কিন্তু লাজলজ্জা বলে কিছু নেই। তা ছাড়া সরকারি তল্লাশির খবরও তত ক্ষণে তাঁদের কানে গেছে। ফলে ভগবতীর ডাকে সাঙা দিয়ে সুঙসুঙ করে নেমন্তন্ন রক্ষা করতে চলে এলেন তাঁরা। এমনই ছিলেন ভগবতী দেবী। এ ঘটনা যখন ঘটছে, বিধবা বিবাহ আন্দোলন তখন তুঙ্গে। বিদ্যাসাগর আঁতিপাঁতি করে খুঁজে বেড়াচ্ছেন বিধবাবিবাহের সপক্ষে শাস্ত্রের কোথায় কী বিধান আছে। পরাশর সংহিতা থেকে বিধান মিলল বটে। কিন্তু এর পরেও কিঞ্চিৎ দোনামোনায় যেন তিনি। গেলেন মা’য়ের কাছে। সব শুনে ভগবতীদেবীর একটাই উত্তর, ‘‘এক বার যখন কাজ শুরু করেছ, সমাজের কর্তাদের ভয়ে পিছিয়ে এসো না, উপায় একটা বেরোবেই।’’ এখানেই থামলেন না।  ছেলেকে আরও বললেন, ‘‘আমি প্রসন্ন মনে আশীর্বাদ করিতেছি। আহা! জন্মদুঃখিনীদের যদি কোনও গতি করিতে পারো, তাহা বাবা এখনই করো।’’ আরেক বারের কথা। ছেলেবেলায় প্রচÐ দারিদ্রের মধ্যে বড় হওয়া ভগবতীর গয়নাগাটির দিকে ঝোঁক ছিল ভালই। কিন্তু বয়স বাড়তে সে সব যেন হঠাৎই উধাও হয়ে যায়। তখন এমনকী বাড়ির মেয়ে, বউদেরও গয়না নিয়েও আদিখ্যেতা মোটেও পছন্দ করেন না তিনি। একবার বিদ্যাসাগরের ভারী ইচ্ছে হল মা’কে গয়না পরাবেন। তিনি তখন সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ। মাস গেলে মাইনে পান ৩০০ টাকা। মা’কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘কেমন গয়না তোমার ভাল লাগে?’ উত্তরে ভগবতীদেবী বললেন, তিনটি গয়না গডড়য়ে দিতে হবে। মায়ের এই উত্তরে বিদ্যাসাগর তো মহা খুশি। এত দিন পর মা’কে কিছু দেওয়ার সুযোগ হয়েছে! ভগবতী বললেন, ‘‘গ্রামে একটি অবৈতনিক স্কুল, দাতব্য চিকিৎসালয়, আর একটি অন্নসত্র প্রতিষ্ঠা করো।’’ পরের দিন বিদ্যাসাগরকে দেখা গেল অন্য ভাইদের সঙ্গে কোদাল হাতে মাটি কোপাচ্ছেন তিনিও। স্কুলবাডড়র ভিত তৈরি করতে হবে যে! মায়ের প্রথম গয়না! সালটা ১৮৬৮। হ্যারিসন নামে এক সাহেব আয়কর দফতরের কমিশনার পদে সদ্য যোগ দিয়েছেন। বিদ্যাসাগরের সঙ্গে তাঁর ভারী খাতির। এক দিন বিদ্যাসাগর সাহেবকে বীরসিংহ গ্রামের বাড়ি যেতে খুব অনুরোধ করলেন। সাহেব বেজায় রসিক। তিনি জানালেন, হিন্দু বাড়িতে কর্তা বা কর্তা-মা নেমন্তন্ন না করলে তিনি তা রক্ষা করেন না। বিদ্যাসাগর এ বারও শরণাপন্ন হলেন মা’য়ের। ভগবতী দেবী কিন্তু স্বচ্ছন্দে নেমন্তন্ন করলেন সাহেবকে। তখনকার দিনে গোঁড়া হিন্দু পরিবারে সাহেবসুবো মানে সেøচ্ছ। তাঁদের ছোঁয়াচ এড়িয়ে চলে গোঁড়া সমাজ। ভগবতীদেবী এ সব তোয়াক্কা করেন না। সাহেব এলেন বীরসিংহের বাড়ি। ভগবতীদেবীকে দেখেই তাঁর সাষ্টাঙ্গে প্রণাম। প্রাণ ভরে আশীর্বাদ করলেন ভগবতীদেবীও। ঝানু সাহেবের মতলবটি ছিল অবশ্য অন্য। তিনি ভগবতীদেবীর হাবেভাবে বুঝে নিতে চাইছিলেন, উনিশ শতকের মহান সমাজ-সংস্কারকের বাড়ির অন্দরের চিত্রটা ঠিক কেমন। ভগবতীদেবীকে খানিক ঠাহর করেই হ্যারিসন বুঝলেন, এ বাডড় পল্লিসমাজের আর পাঁচটা বাড়ির মতো নয়। পাত পেড়ে খেতে বসলেন সাহেব। হ্যারিসন এ বার আরওই অবাক। পাখা হাতে চেয়ারের উপর বসে আছেন স্বয়ং ভগবতীদেবী। অতিথির খাওয়াদাওয়ার তদারকি করছেন তিনি নিজেই। সাহেবের তা’ও যাচাই করা যেন থামে না। তাঁর আয়করি বুদ্ধি। গেরস্থের ধনরতেœর খবর নেবেন না, তাও কি হয়? ভগবতীদেবীকে প্রশ্ন করলেন, ‘‘বাড়িতে কত ধন আছে আপনার?’’ এ বার রসিকতা করতে ছাড়লেন না ভগবতীদেবীও। বললেন, ‘‘চার ঘড়া।’’ ভগবতীর জবাবে একেবারে হতচকিত সাহেব। দরিদ্র পÐিতের বাড়িতে এত সম্পদ! এও আবার সম্ভব নাকি! কী বলতে চান এই গৃহিণী? সাহেবের অবস্থা বুঝতে পেরে এ বার ভগবতী নিজেই রহস্য ফাঁস করলেন। তাঁর চার পুত্রের দিকে আঙুল দেখিয়ে ভগবতী বললেন, ‘‘এই যে! এই আমার চার ঘড়া ধন।’’ অতিথি সেবা হল। সাহেব চলে যাবেন অল্প বাদে। তার মাঝে ভগবতীদেবী কমিশনার সাহেবকে অনুরোধ করলেন, গাঁয়ে সবই প্রায় গরিবগুর্বো মানুষ। সাহেবের জন্য তাঁদের যেন কখনও হেনস্তা না হয়। এটুকু অনুরোধ তিনি যেন রাখেন। শোনা যায়, ভগবতীর অনুরোধ নাকি মেনেওছিলেন সাহেব হ্যারিসন। পরে বিদ্যাসাগরকে লেখা একটি চিঠিতে ভগবতী দেবীর সেই অনুরোধের কথা উল্লেখও করেন তিনি। অন্যের দুঃখে কাতর হওয়া ছিল ভগবতীদেবীর স্বভাব। তা নিয়েও গল্পের অন্ত নেই। একবার নাতি নারায়ণচন্দ্রকে নিয়ে কলকাতায় আসছেন ভগবতী। খানিক দ‚র যেতে না যেতেই হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন। কোথা থেকে যেন কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে! নাতি নারায়ণচন্দ্রকে পথের ধারে বসিয়ে রেখে দেখতে গেলেন কী হয়েছে। চোখে পঙল সামনেই একটি গৃহস্থ বাড়ি। কান্নার আওয়াজ আসছে সেখান থেকেই। ভগবতী গেলেন সে-বাড়ি। দেখলেন পরিবারের এক ছেলের মৃত্যু হয়েছে। গোটা বাড়ি তারই শোকে আত্মহারা। কলকাতায় যাওয়া মাথায় উঠল তাঁর। সম্প‚র্ণ অপরিচিত একটি পরিবারের সঙ্গে শোক ভাগ করে নিতে ভগবতীদেবীও হয়ে পড়লেন তাঁদের সঙ্গী। ও দিকে পথেই বসে থাকল তাঁর নাতি নারায়ণচন্দ্র। গাঁয়ের আর একটি ঘটনা শোনানো যাক। বামনি নামে একটি পুকুরে প্রতিদিন স্নানে যেতেন ভগবতী। এক দিন দেখলেন এক ব্রাহ্মণ পুকুর পাড়ের ঝোপ থেকে পাটভাড়া পোশাক পরে কোথায় যেন চলেছেন। ব্রাহ্মণ তো চলে গেলেন। কিন্তু মাটিতে পড়ে এটি কী! উঁকি মেরে দেখলেন, একটি পুঁটলি। খুলে ফেললেন পুঁটলি। খান কতক পোশাক। সামান্য কিছু টাকা। আর গুটিকয় সোনার গয়না। কে এর মালিক? কাছেপিঠে তো আর কেউ নেই। তা হলে? কী করবেন এটি নিয়ে? ভগবতী পড়লেন মহা চিন্তায়। সময় কাটতে লাগল। পুঁটলি আগলে বসে রইলেন ভগবতী। সকাল গড়িয়ে বিকেল এল। তবু মালিকের দেখা নেই। অনেক পরে দেখেন সকালের সেই ব্রাহ্মণ উদয় হলেন। রীতিমতো কাঁদতে কাঁদতে তিনি পুকুর পাড়ে এসে পৌঁছলেন। তার মুখে সব শুনে ভগবতীর বুঝতে অসুবিধে হল না যে, ওই পুঁটলিটা ব্রাহ্মণেরই। পুঁটলির ভিতর গচ্ছিত ছিল তাঁর মেয়ের বিয়ের জিনিসপত্র। হারানো সেই পুঁটলি হাতে পেয়ে ব্রাহ্মণের যেন ধড়ে প্রাণ এল। স্বস্তি পেলেন ভগবতী। কথায় কথায় শুনলেন, এই পুঁটলির চিন্তায় দিনভর কিছু খাননি ব্রাহ্মণ। ভগবতী তখন তাঁকে নিয়ে গেলেন নিজের বাডড়। শুধু তাই-ই নয়, খাওয়া-দাওয়ার পর ব্রাহ্মণকে বললেন, ওই পরিমাণ টাকায় আপনার মেয়ের বিয়ে কী করে সম্ভব? শুনে ব্রাহ্মণ মৌন। তাঁর মুখ দেখে সব বুঝলেন ভগবতী। নিজের সঞ্চয়ের কুডড়টি মুদ্রা ব্রাহ্মণকে দান করলেন তিনি। বিদায় নিলেন ব্রাহ্মণ। দীনদুঃখীর কষ্ট কিছুতেই সইতে পারতেন না ভগবতী। এক বারের গল্প যেমন। সে বার কলকাতা থেকে বাড়ির সবার জন্য ছ’টা লেপ পাঠিয়েছেন বিদ্যাসাগর। ভগবতী কিন্তু নতুন লেপগুলি পেয়ে সব বিলিয়ে দিলেন গাঁয়ের লোকজনকে। বাডড়র জন্য রাখলেন না একটিও। বরং ছেলেকে ফের আরও লেপ পাঠানোর জন্য চিঠি লিখলেন। মা’কে চিনতেন বিদ্যাসাগর। শুধু তিনি জানতে চাইলেন, কতগুলো লেপ তিনি পাঠাবেন। সঙ্গে এমন একটি সংখ্যা বললেন, যাতে গ্রামের সকল দুঃখীকে দিয়েথুয়ে, ও-বাড়িরও সবার জন্য রেখেও মা’য়ের লেপের যেন অভাব না হয়। ১৮৭৫। দেশ জুড়ে অনাবৃষ্টি। চাষাবাদ কিছুমাত্র হয়নি। গাঁ জুড়ে ভাতের আকাল। ভগবতীদেবী সে বার খুলে বসলেন অন্নসত্রতলা। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত দশটা সেখানে এসে ভিড় জমাতে লাগলেন নিরন্ন মানুষের দল। সকলকে যতœ-আত্তি, সেবা না করে ভগবতীর যেন শান্তি নেই। হিন্দু পেট্রিয়ট পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে ছাপাও হয়েছিল সে কথা। সেখান থেকেই জানা যায়, সেই বছর ভগবতীদেবী প্রতি দিন বাড়িতে চার-পাঁচ’শ লোকের খাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। প্রয়োজনে অকাতরে টাকা ধার দিতেও কসুর করতেন না তিনি। তবে সময়ে সময়ে তা আবার সংসারে বিপদও ডেকে আনত। একবার বাড়িতে টাকা নেই, চালও বাড়ন্ত। ভগবতীদেবী বেরোলেন গাঁয়ের পথে টাকা আদায় করতে। সকলেই খাতির-যতœ করতে শুরু করলেন, মিষ্টি কথা বলতে থাকলেন। ওঁদের কথাতে ভগবতী বেমালুম ভুলে গেলেন টাকার কথা। উল্টে অভ্যাসমতো বলে দিলেন, ‘‘ও বেলা বাড়িতে আসিস, প্রসাদ নিতে।’’ দরকারে নিজের বাডড়র সব থেকে দামি জিনিসটি দিয়েও অতিথি আপ্যায়ন করতে তাঁর এতটুকু দ্বিধা ছিল না। একবার স্কুল-ইনস্পেক্টর প্রতাপনারায়ণ সিংহ এসেছেন বাডড়তে। সেকালে সব বাড়িতে গিয়ে সবাই শালপাতায় খাওয়া-দাওয়া করতেন। বড় পরিবারে অত বাসনকোসন কোথায় মিলবে, তাই। খাওয়ার জন্য থালা-বাটি তখন রীতিমতো বিলাসিতা।  প্রতাপবাবুর জন্য কিন্তু ভগবতী খুঁজে পেতে কোথা থেকে ঠিক জোগাঙ করে আনলেন একটি থালা। তাতেই সাজিয়ে দিলেন তাঁর খাবার। অতিথি যে নারায়ণ! তাঁর জন্য কোনও কিছুই দুর্ম‚ল্য নয়। ১৮৬৯। সেই সময় বাঙালির কাছে কাশী যাত্রা ছিল বিশেষ পছন্দের।
ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় তখন কাশীতে রয়েছেন। বিদ্যাসাগর মা’কেও পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু কাশীতে এসে কিছুতেই মন টেকে না ভগবতীর। অচিরেই তাঁর মনখারাপ। বিমর্ষ স্ত্রী’কে দেখে ঠাকুরদাস জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘কী হয়েছে?’’ উত্তরে ভগবতী জানালেন, বীরসিংহের দরিদ্র মানুষগুলির জন্য মন কেমন করছে। মনে হচ্ছে কত দিন নিজের হাতে রেঁধে খাওয়ানো হয়নি ওঁদের। ভগবতী বলতেন, ‘‘বীরসিংহ আমার কাশী, সেখানেই আমার বিশ্বেশ্বর।’’ নিজের ঠাঁই, তাঁর মানুষজনকে এ ভাবেই ভালবাসতেন ভগবতীদেবী। উপস্থিত বুদ্ধিতেও এই মহিলার জুড়ি মেলা ভার। এক বার বিদ্যাসাগর বাড়িতে এসে অকাতরে টাকা-পয়সা বিলোচ্ছেন দুঃখী মানুষদের। খবর গেল ডাকাতদলের কাছেও। হানা দিল তারা বাড়িতে। তাতে বিদ্যাসাগরও নাকি ভয় পেয়ে যান। কিন্তু স্থিতধী থাকলেন তাঁর মা, ভগবতী। ডাকাতদলের চোখ এড়িয়ে বুদ্ধি করে ছেলেকে কোনও ক্রমে বাড়ির বাইরে বের করে দিলেন তিনি। ছেলেবেলা থেকেই ভগবতী দেবী এমনই ব্যতিক্রমী। বাবা, গোঘাটের বাসিন্দা। রমাকান্ত তর্কবাগীশ। মা, গঙ্গামণি দেবী। ধর্মকর্মের জেরে সংসারে মতি ছিল না রমাকান্তের। জামাইয়ের মতিগতি ভাল নয় বুঝে মেয়ের বাড়ির সকলকে পাতুল গ্রামে নিয়ে আসেন পÐিত পঞ্চানন বিদ্যাবাগীশ। মামার বাড়িতেই বড় হওয়া ভগবতীর। ছোট থেকেই পল্লিসমাজের জাতপাত, ছোঁয়াছুঁয়ির ব্যাপারে কোনও ভ্রুক্ষেপই ছিল না ভগবতীর। বামুনপাড়ার থেকে বেশ খানিকটা দ‚রে তেওর, বাগ্?দি পাঙাগুলোতেই তাকে দেখতে পাওয়া যেত বেশি। তবে ছোট ভগবতীর এই স্বভাবে দাদুর প্রশ্রয়ও ছিল খানিক। পরে বিদ্যাসাগরের বড় হওয়ার পিছনেও তো ভগবতীর অতলান্ত প্রশ্রয়। শিশু ঈশ্বরচন্দ্রের একটি ঘটনা যেমন। একবার ঈশ্বর পাড়ার এক ছেলের সঙ্গে খেলতে খেলতে দেখল বন্ধুর কাপড়টি প্রায় ছেঁড়া। অমনি নিজের কাপড় বন্ধুকে দিয়ে, ছেঁড়া কাপড় পরে বাড়ি ফিরল সে। ভগবতী সব শুনে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন, চরকায় সুতো কেটে তার জন্য নতুন একটা কাপড় তিনি তৈরি করে দেবেন। ছেলেরও আব্দার মেটাতে মা ভগবতীকে এক-এক সময় অদ্ভুত সব কাÐ করতে হয়েছে। একবার যেমন, বিদ্যাসাগরের খুব শখ হল মা’য়ের একখানা ছবি সঙ্গে রাখবেন। পাইকপাড়ার রাজার বাড়িতে এক জন ভাল ‘পোটো’ এসেছেন বলে খবর পেলেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে মা’কে লিখলেন কলকাতায় আসতে। সেই পোটো মায়ের ছবি আঁকবেন। এ দিকে ভগবতী কিছুতেই রাজি হন না। লোকলজ্জা রয়েছে যে! কিন্তু ছেলেও যে নাছোড়। শেষে হার মানলেন তিনি। কথা দিলেন আসবেন কলকাতায়। তবে শর্ত, ছেলেকেও সঙ্গে থাকতে হবে। শর্ত মেনেই মায়ের কাছে আব্দার আদায় করেছিলেন পুত্র ঈশ্বরচন্দ্র।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here