একদিন এক রহস্যের সন্ধানে

0
71

একটু বাতাস হবে! একটু আলো! একটু পানি হবে! বিশুদ্ধ পানি! হবে! আচ্ছা কিচ্ছু লাগবে না, একটু সাহস হবে ধার! হবে! বিশ্বাস করার সাহস,হবে! আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সুপ্ত নিজের কাছে সাহস চাইছে। কি কান্ড! সাহস! সে আবার নিজের কাছে পাওয়া যায় বুঝি! ও আবার হয় নাকি! সুপ্ত একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। পরিবারের অনেক আশা ছিল,এখনো হয়তো আছে ওকে নিয়ে। কিন্তু এ কেমন এক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে আজ সুপ্তকে! না, এমন তো হবার কথা না। জীবনটা হঠাৎ একি পরিস্থিতির সামনে এনে দাঁড় করালো! এমন এক পরিক্ষার মুখোমুখিই কেনো! অন্যের স্বপ্নের সাথে বাঁচতে বাঁচতেই হয়তো নিজের কোনো স্বপ্ন থাকতে পারে না। স্বপ্নের আর বাস্তবতার সাথে একটা নির্বিকার স্নায়ু যুদ্ধের ঘটনা ঘটতে থাকে। আসলে কোথায় কেনো কবে কিভাবে জীবনেরর শুরু হয়েছিল,কেনো হয়েছিল!  উদ্দেশ্যহীনতার একটা ঘোরের শুরু! কেউই জানে না এই অজানা প্রশ্নের উত্তর। জীবনটা আসলে নিজের করা অগোছালো রাস্তায় হাঁটতেই পচ্ছন্দ করে, ছন্দহীন কিংবা ছন্দের সাথে ঘুরে বেড়াতে।হয়তো সব গোছানো জীবনের কোনো এক মোরে হঠাৎ করেই কেমন যেনো ঝড়ের আগমনী বার্তা বয়ে আসে। আজকের রাতটা পেরোবার পর হয়তো সুপ্তের জীবনের শেষ হবে,  না হয় হবে নতুন সূচনা। কি জানি! এই সূচনার অপেক্ষায়ই ছিল কিনা সুপ্ত! একজন উচ্চবিত্ত ধাচের জীবনযাপন করতে থাকা মানুষ হিসেবেই সুপ্তকে সবাই দেখে আসছে। কিন্তু এই উচ্চবিত্তের চালচলনের মাঝে হেটে চলা সুপ্ত আসলে নিজের সাথে দীর্ঘকাল ধরে বয়ে নিয়ে চলছে অজানা এক উত্তর। যার উত্তর সুপ্তের মাঝে অন্যরকম জীবনের অভিসম্পাতের বিশাল আলোড়ন করে যাচ্ছে।  ‘এই সুপ্ত ওঠ, এই ওঠ বলছি,  আজকে না তোর অফিসের প্রথম দিন। আজই দেরি করবি নাকি! ওঠ এবার। দড়জাটা খোল।’ লাবনী (সুপ্তের বড় বোন) কয়দিন আগেই লাবনী আর সুপ্ত তাদের জীবনের অমূল্য প্রাপ্তি হারিয়ে ফেলেছে। তাদের বাবা মারা গেছেন কয়দিন হলো। পরিবার বলতে এখন লাবনী আর সুপ্তই। লাবনী সুপ্তের থেকে বছর দুয়ের বড়।  বিয়ে হয় নি এখনোও। পচ্ছন্দের একজন আছে যদিও কিন্তু মনে হয় না বিয়ে অব্দি যাবে সম্পর্কটা। মতের অমিল চিন্তা ধারার অমিল সবই কেমন এলোমেলো করে দিচ্ছে।বাবা চলে যাওয়ার পর লাবনী সংসারটা কেমন পাকা গিন্নীর মত আগলে নিয়েছে। দিন শেষে দীর্ঘশ্বাস ফেলারও সময় নেই। ভাইটার নতুন চাকরী হয়েছে ওকে কিছু উপহার দেয়া উচিত। বাবার কিছু ফেলে যাওয়া কাজ শেষ করতে হবে। কতশত দায়িত্ব এখন। সব থেকে বড় দায়িত্ব একজনকে একটা চিঠি দিতে হবে পোস্ট অফিসে দিলে হবে না। ঠিকানা খুঁজে দিয়ে আসতে হবে। ঠিকানার খোঁজ বাবার ঘরেই আছে। খুঁজতে হবে। সব গুছিয়ে বাবার অফিসেও যেতে হবে। সুপ্ত ঘুম থেকে উঠেছে অনেক আগেই। কংক্রিটের শহরে বাস করলেও সকালে কেমন যেনো মাটির মৃদু গন্ধ ঘাসের হালকা ভেজা শিশির কণা সব কিছুই সুপ্তের মাঝপ হাহাকারেরর সৃষ্টি করে। বাবা নেই, আর হয়তে গ্রামে যাওয়া হবে না। আজলে নতুন ন একটা দিন শুরু করতে যাচ্ছে সুপ্ত,আজ বাবা থাকলে হৈহুল্লোর করে বাড়ি মাথা করতেন। আর মা! মা কথাটা আসতেই সুপ্ত একজন চুপ হয়ে যায়। এই একটা শব্দেই সুপ্ত শীতল বরফ হয়ে যায়। আপা,বাবা কোনো দিনও এই প্রশ্নের উত্তর দেয়নি। ‘বাবা নেই। আপাও কি জানাবে না! মা। আমার মা কোথায়। মা বেঁচে আছেন এতটুকই জানবো আমি! আর কিছু জানবো না! আমার শেকড় কোথায়! আমার সাথে যে নাড়ের বন্ধন ছিল দশ মাস সে বেঁচে আছে এই টুকুই জানবো শুধু!’ ভাবতে ভাবতে সুপ্ত ভাবে আজ আবার আপাকে জিগ্যেস করবো। হয়তো বলবে।হয়তোবা না। খাবার টেবিলে বসে সুপ্ত সহাস্যমুখে লাবনীর সাথপ গল্প করছে আর খাচ্ছে। কিছুক্ষন আগে সুপ্তের মাঝে হয়ে যাওয়া ঝড়ের বিন্দুমাত্র ছাপ নেই। আর কিছু শিখুক না শিখুক সুপ্ত অভিনয়টা শিখে গেছে। জীবনের সাথে খাপ খাওয়ানো শিখে গেছে।  সুপ্তত লাবনীকে হঠাৎ বলে উঠলো ‘এই আাপা আজ তোর অফিস নেই? ছুটি নিয়েছিস নাকি! আরে আমার নতুন শুরু আর তাই তুই বাসায় থাকবি নাকি সারাদিন একা একা! করবিটাকি শুনি! দেড়ি হলেও চল আজ একসাথে বের হই। যা রেডি হয়ে নে।’ লাবনী বলে, ‘আচ্ছা রে হয়েছে পাকামো, আজ আর যাবো না অফিস। তুই যা তোকে এগিয়ে দিয়ে আসি।তুই অফিস যাবি আমি দূর থেকে দেখবো। বাবা থাকলে আমরা দুজন মিলে দেখতাম।’ মূর্হুতের জন্য পরিবেশটা একটু নীরব হয়ে ওঠে। বাবার চেয়ারটা ফাঁকা। সুপ্ত আর লাবনী পরক্ষনেই প্রানবন্ত হয়ে ওঠার অভিনয় করে।  সুপ্ত অফিসে চলে যায়। সুপ্তকে বিদায় দিয়ে লাবনী বদ্ধ ঘরে এটা ওটা গুছাতে থাকে সব কিছুর মাঝেও বাসাটা বড্ড বেশি হাহাকারের হাতছানি। বাবা বেঁচে থাকলে হয়তো এতোটাও ফাকা লাগতো না সব কিছু। ঘর গুছিয়ে লাবনী বাবার দেয়া একটা অসম্পাত্ত কাজ করতে বের হয়। সুপ্তের অফিসটা বেশ সুন্দর। আজ প্রথম দিন হওয়াতে খুব বেশি  কাজের চাপ নেই। সবার সাথে পরিচয় আর অফিসটা দেখা। আগামি এক বছর তার শিক্ষানবিশ কাল চলবে এর পরে পাঁকাপোক্ত হবে চাকরী। আজ বিকেল বিকেলই ফেরা হলো বাসায়। বাসায় ফিরেই লাবনীর কাছে গিয়ে ছোট্ট বাচ্চার মতো আবদার করে সুপ্ত, ‘আপু চল আজকে সন্ধ্যা হওয়া দেখবো চট করে চা করে আনতো। গল্প করবো।’  লাবনী হঠাৎ করেই প্রানবন্ত হয়ে ওঠে,চা করে এনে দুভাই বোন মিলে চা নিয়ে ছাদে চলে যায়। বিকেল গড়াতে চলেছে,আকাশটা একটা রূপনগরে পরিনত হয়েছে।”আপা দেখ কত সুন্দর সব কিছু। প্রকৃতি এত সুন্দর কেনো রে বলতে পারবি! তবুও এর মাঝেও রহস্যের শেষ নেই। কত শত কত কালের রহস্য লুকিয়ে রাখে নিজের কোটোরে।‘(একটা দীর্ঘশ্বাস)। লাবনী সুপ্তের দীর্ঘশ্বাসের কারণ বুঝতে পারে কিনতু কোনো উত্তর দেয় না। ‘চল তো সুপৃত ঘরে ফিরি এতো রহস্য তোকে বুঝতে হবে না।’ সুপ্ত বলে,‘আপু তোকে একটা কথা জিগ্যেস করি? একটা অনুরোধ রাখ আমার। এই রহস্যের উৎঘাটন করে দে আপু।’ লাবনী,  বল। ‘(দীর্ঘশ্বাস,প্রশ্নটা জানা,উত্তর দেয়ার প্রস্তুতি) সুপ্ত,‘আপু,মা, মা কোথায় রে কেনো আসে না মা! তুই জানিস সব তবুও কেনো বলিস না! আমাী নাড়ীর বন্ধনের শিকরটা কোথায় রে আপু! কেনো এই রহস্য,দীর্ঘ বছরের রহস্য। কেনো!’  ‘লাবনী, সব রহস্যের সন্ধান জানতে নেই রে।  আমার কাছে এই রহস্যের উত্তর দেয়ার অনুমতি নেই। প্রকৃতি আমায় বারণ করে রেখেছে। আমি যে শিকলে বাধা। আমায় এই প্রশ্ন করিস না রে।’ মুহূর্তের মাঝে পরিবেশটা কেমন নিস্তেজ হয়ে যায়।প্রানহীন হয়ে যায়। প্রকৃতির তৈরি রহস্যের কাছে সবাই হেরে যায়। গতকালের সন্ধ্যার পর আর তেমন কথা হয় নি লাবনীর সুপ্তের সাথে। খাবার টাও দায়পড়া ভাবে শেষ হয়েছে। ‘আজকে সকালেও সুপ্ত কোনো কথা বললো না! ছেলেটা খুব কষ্ট পেয়েছে। কিছু কিছু সময় কেনো এতো নিষ্ঠুর হতে হয়! কেনো কাছের মানুষের কাছে রহস্যঘন করে রাখতে হয় তার প্রাপ্য জানার স্থান থেকে! কেনো এতো নিষ্ঠুর হয় কিছু রহস্য! সুপ্ত সত্য জানলে ভেঙে পরবে। ওকে আমি ভেঙে পরতে দেখতে পারবোনা।না না ওকে আমি জানাবো না কিচ্ছু জানাবো না। সব ঠিক হয়ে যাবে।’ নিজের মনের মাঝেই বিরবির করতে থাকে নিজের ভিতরে বাস করা লাবনীর প্রতিচ্ছবি। অফিসের ২য় দিন, সুপ্ত গতকালের থেকেও বেশি প্রানোচ্ছল। (ভিতরে বইতে থাকা ঝড়ের আভাস,চলতে থাকা যুদ্ধের আভাস যে জানানো যাবে না বাইরের পৃথিবীকে। প্রকৃতির সাথেও অভিনয় করে চলতে হবে। সব কাজ গুছিয়ে নেয় পরিপক্ষ কর্মকর্তার মতোন। দিনশেষে আজ আর ঘরে ফিরতে ইচ্ছে করছে না। সন্ধান করতে ইচ্ছে করছে রহস্যের। কিন্তু…চাইলেই সব হয় কি! না হয় না। ঘরে ফিরতেই হবে। গতকালকে সুপ্ত নিজে যতটা কষ্ট পেয়েছে তার থেকেও বেশি কষ্ট পেয়েছে লাবনী। সুপ্ত হঠাৎ ভাবলো ‘আজ আর কোথাও যাবো না। আজ ঘরেই ফিরবো। আজ আবার আপুর সাথে হাসিমুখে নতুন প্রানে কথা বলবো। মায়ের সন্ধান এক না একদিন প্রকৃতিই আমাকে দিবে, প্রকৃতিকে দিতেই হবে। প্রকৃতি নাকি কাওকে তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে না! তবে আমিও অপেক্ষায় থাকবো। হোক না সে সময় অনন্তকালের। আপুকে আর কষ্ট দিবো না। ঘরে ফিরতে হবে। আজ বই পড়বো। পুরোনো গান শুনতে হবে।কালকে সরকারি ছুটির দিন। কালকে ঘুরতে যাবো। আপুর বিয়ের আগে আপুকে পুরো শহরটা দেখাবো। আমি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে শহরটা যেমন দেখার সুযোগ পেয়েছি আপু পায়নি। ওকে শহরের কিছু জাগয়ায় জ্বলতে থাকা সোডিয়াম আলোর ভাষা শোনাবার চেষ্ঠা করবো। শহরের মাঝে আমাদের রহস্যের থেকেও বড় রহস্যের সন্ধান করবো আমরা।’ দিনটা ফুরোচ্ছে…সুপ্ত রিক্সা করে ঘরে ফিরছে,শহরে সোডিয়াম বাতির আলোয় নতুন রহস্য  বুননের কাজ চলছে। সব রহস্যের সন্ধান চলে না সব সন্ধানে মেলেও না…

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here