নেতৃত্বের সংঘাতই অনৈক্যের পিছনে কাজ করেছে

0
134

সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন নেতৃত্বের শেষ পর্যন্ত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আত্মপ্রকাশ ঘটলেও জন্ম লগ্নেই অনৈক্য সৃষ্টি হয়েছে। এই ঐক্য প্রক্রিয়ার অন্যতম উদ্যোক্তা সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রফেসর ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে বাইরে রেখেই এই ঐক্য হয়েছে। নেতৃত্বের দ্বন্ধ ও সংঘাতের পাশাপাশি রাজনৈতিক আদর্শিক বিরোধেরই বহি:প্রকাশ এই অনৈক্য বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ মহল মনে করেন। ডা. বি চৌধুরী ও মাহী বি চৌধুরীর সঙ্গে সরকারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে বিএনপির কাছে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য রয়েছে। তাদের নিয়ে জাতীয় ঐক্য গঠন করার পর এবং তফসিল ঘোষণার পর জামায়াত প্রশ্নে তারা সরে গিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন বলে গভীর সংশয় রয়েছে বিএনপির মধ্যে। সেক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে বিএনপি অধিকতর ক্ষতিগ্রস্থ হবে আশঙ্কায় বিএনপির মধ্যে বিকল্প ধারাকে ছাড়াই ঐক্যফ্রন্ট গঠনের আগ্রহ দেখা যায়।
এক বছর আগে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া মুক্ত থাকা অবস্থায়ই ঐক্য প্রক্রিয়ার সুচনা করেছিলেন। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, রব, বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনাও করেন। জামায়াত প্রশ্নে প্রবল আপত্তি জানিয়ে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী এই প্রক্রিয়া থেকে সরে দাড়ান। জাতীয় ও আন্তজার্তিকভাবে সমধিক পরিচিত হলেও ড. কামাল হোসেনের মধ্যে একটা পলায়নপর মানসিকতা বরাবরই লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক কর্মসূচি, আন্দোলনের পুরোভাগে তাকে কমই দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রক্ষায় বছরের অধিকাংশ সময়ই তিনি বিদেশে থাকেন। সাংগঠনিক ভাবে কর্মী- শক্তিহীন ড. কামালকেই নেতৃত্বে বেছে নিতে হয়েছে। নিরুপায় হয়ে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব ডা বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে নিয়েও দলটির মধ্যে যথেষ্ট আগ্রহ ছিল। যদিও ডা.বি চৌধুরীর বিভিন্ন সময়ের বক্তব্য নিয়ে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ ছিল। ডা. কামাল ও বি চৌধুরীর মতো ব্যক্তিত্বদের নিয়ে জাতীয় ঐক্য গড়া হলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্যতা পাবে বলেই বিএনপি শিবিরের ধারণা। নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা সম্পন্ন একাধিক নেতা থাকা সত্বেও বিএনপির মতো বিশাল সংগঠন জাতীয় ঐক্যের নেতৃত্ব ড. কামালের হাতে ছেড়ে দেন।
দুই নেতার ব্যক্তিত্ব, নেতৃত্বের সংঘাতই অনৈক্যের পিছনে মুখ্যত কাজ করেছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট কার নেতৃত্বে পরিচালিত হবে এ নিয়ে প্রশ্ন ছিল গোড়াতেই। পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী ড. কামাল হোসেনের বাসায় দুই নেতার শীর্ষ বৈঠকের সময় ও স্থান নির্ধারিত থাকার পরও ড. কামাল বাসায় না থেকে অফিসে চলে যাওয়া এবং টেলিফানে ডা বি.চৌধুরীকে সেখানে যেতে বলাটা শুধু শিষ্টাচার বর্হিভ‚তই নয়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই বিকল্প ধারার নেতৃবৃন্দ মনে করেন। বদরুদ্দোজা চৌধুরী ব্যথিত চিত্তে ড.কামাল হোসেনের বাসা ত্যাগ করে নিজ বাসায় এসে সংবাদ সম্মেলন করেন। অপরদিকে ড. কামাল হোসেন জাতীয় প্রেসক্লাবে বিএনপির নেতাদের দুপাশে নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নিজের নিরঙ্কুশ নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠা করলেন। জাতীয় ঐক্য প্রশ্নে রাজনৈতিক আদর্শিক বিরোধ বড় হয়ে আসে। জামায়াতের ব্যাপারে বিকল্প ধারা, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বরাবরই কঠোর অবস্থানে ছিলেন। এ ব্যাপারে বিএনপির বক্তব্য ও অবস্থান তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট থেকে জামায়াতকে বাদ দেয়ার দাবি ছিল তাদের। জামায়াত জোটে থাকলেও জাতীয় ঐক্য হবে তাদের বাইরে রেখে। বিকল্প ধারার কাছে এ বক্তব্য গ্রহনযোগ্যতা পায়নি। তারা স্বাধীনতা বিরোধী কোন শক্তির সাথে প্রত্যক্ষ পরোক্ষ কোন সম্পর্ক থাকতে পারেনা এবং এ ধরনের শক্তির সমন্বয়ে জাতীয় ঐক্য হতে পারেনা বলে সুস্পষ্ট অবস্থান ঘোষণা করেন।
ড.কামাল, আ.স.ম রব, মাহমুদুর রহমান মান্না, ভিন্নতর অবস্থান নেন। প্রকারান্তরে জামায়াতকে মেনে নিয়েই তারা ঐক্য করলেন। বিকল্প ধারা, আওয়ামী লীগ, ১৪ দলসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিসমূহের এ সংক্রান্ত অভিযোগ বক্তব্য খন্ডন করেননি ড. কামালা হোসেন।
সরকারকে চাপে ফেলে দাবি আদায়ের জন্য জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট কর্মসূচি ঘোষনা করতে যাচ্ছে। প্রথম পর্যায়ে নির্বাচন কমিশন ঘেরাও স্মারকলিপি পেশ, জেলা প্রশাসকদের কাছে স্মারকলিপি পেশ বিক্ষোভ, মানববন্ধন, প্রতীকী অনশন জাতীয় অহিংস কর্মসূচি দেবেন তারা। পরবর্তী ধাপে রাজপথ, রেলপথ, নৌপথ, বিমাবন্দর, সমুদ্র বন্দর অবরোধ, এমনকি সচিবালয় ঘেরাও এর মতো কর্মসূচি এবং শেষ পর্যায়ে অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দিতে পারেন। যেকোন কর্মসূচি সফল করার দায়িত্ব এসে পড়বে বিএনপির উপর। কারণ গণফোরাম, জেএসডি, নাগরিক ঐক্য সাংগঠনিকভাবে শক্তিহীন। বিএনপি সর্বশক্তি দিয়ে কর্মসূচি সফল করতে সচেষ্ট থাকবে। কিন্তু তাদের মধ্যে এবং তৃতীয় কোন শক্তি অহিংস কর্মসূচিতে সহিংিসতা ছড়ানোর মতো কর্মকান্ড চালাবেনা সে নিশ্চয়তা নেই। নির্বাচন ব্যহত করার জন্য দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী মহলের তৎপরতা যে নেই তাও বলা যাবেনা। শেষ পর্যায়ে  এসে কৌশলগত কারনেই শান্তিপূর্ন কর্মসূচিতে সরকার বাধা হবেনা। কিন্তু তার ব্যতিক্রম হলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার প্রস্তুুতিও রয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর নিবন্ধিত অধিকাংশ নির্বাচনী প্রচার প্রচারণা নেমে যাবে। বিএনপি ও তার সহযোগীদের আন্দোলন তাদের আদৌ দমিত করতে দল পারবে কিনা সংশয় রয়েছে। আন্দোলন সফল না হলে তার দায় এসে পড়বে বিএনপির ঘাড়ে।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here