মইনুল হোসেনের জামিন আবেদন নামঞ্জুর, কারাগারে প্রেরণ

0
19

নিজস্ব প্রতিবেদক: রংপুরে দায়ের হওয়া একটি মানহানি মামলায় গ্রেফতার সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার অতিরিক্ত মহানগর হাকিম (এসিএমএম) কায়সারুল ইসলামের আদালত এ আদেশ দেন। আদালতে মইনুলের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে ছিলেন খন্দকার মাহবুব হোসেন, অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া ও ঢাকা বারের সভাপতি গোলাম মোস্তফা খান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রায় পাঁচ শতাধিক আইনজীবী। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন মহানগর পিপি আব্দুল্লাহ আবু। সোমবার দিবাগত রাতে রংপুরে দায়ের করা মানহানির এক মামলায় জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রবের উত্তরার বাসা থেকে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। গ্রেফতারের পর মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে নেয়া হয়। সেখান থেকেই গতকাল মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা মহানগর মুখ্য হাকিমের আদালতে নেয়া হয়। রংপুরে সোমবার ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের বিরুদ্ধে ১০ কোটি টাকার মানহানির মামলা করেন মানবাধিকারকর্মী মিলি মায়া। তিনি রংপুর নগরীর মুলাটোল মহল্লার বাসিন্দা। মামলাটি তার পক্ষে রংপুরের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দাখিল করেন সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আইনুল হোসেন। আদালতের বিচারক আরিফা ইয়াসমিন মুক্তা মামলাটি গ্রহণ করেন। উল্লেখ্য, সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টিকে ‘চরিত্রহীন’ বলায় ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের বিরুদ্ধে ঢাকাসহ দেশের বেশ কয়েকটি এলাকায় মানহানির মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটিতে তিনি উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়েছেন। গত ১৬ অক্টোবর একাত্তর টেলিভিশনের টক শো ‘একাত্তরের জার্নাল’-এ সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টির এক প্রশ্নে রেগে গিয়ে মইনুল হোসেন বলেন, ‘আপনার দুঃসাহসের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ দিচ্ছি। আপনি চরিত্রহীন বলে আমি মনে করতে চাই। আমার সঙ্গে জামায়াতের কানেকশনের কোনো প্রশ্নই নেই। আপনি যে প্রশ্ন করেছেন তা আমার জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর।’শুরুতে ঢাকা বারের সভাপতি গোলাম মোস্তফা খান মইনুল হোসেনের বসার অনুমতি চাইলে আদালত তা মঞ্জুর করেন। এরপর সানাউল্লাহ মিয়া আদালতকে বলেন, কোন মামলায় মইনুল হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তা জানা দরকার। এ বিষয়ে অন্ধকারে আছি। তখন তাদের জানানো হয়, মইনুল হোসেনকে রংপুরের মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে অন্য কোনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে কি না, তাও জানতে চান আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। তখন তাদের জানানো হয়, আর কোনো মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি।এরপর মামলার ধারা এবং আবেদনে কী বলা হয়েছে, তা জানতে চান মাসুদ আহম্মেদ তালুকদার। আদালত তাদের পুলিশের আবেদনটি দেখান। তখন তারা বলেন, এখানে কোনো ধারা উল্লেখ নেই। ধারা সম্পর্কে নিশ্চিত না হলে কীভাবে আদেশ দেবেন, আদালতকে এ কথা বলেন মাসুদ আহম্মেদ তালুকদার।তখন কাজী নজিবুল্লাহ হিরু জানান, ধারা আছে কি না, তা আমাদের জানার বিষয় না। মামলাটি রংপুরের আর অনুমান করতে পারি, সারা দেশে যে মামলাগুলো হচ্ছে সেগুলোর মতো অথবা অন্য হতে পারে।এরপর সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, আমার কাছে মামলার একটা কপি আছে। সেখানে ৫০০, ৫০৬ ও ৫০৯ ধারা উল্লেখ আছে।এরপর তারা মইনুল হোসেনের পক্ষে জামিন শুনানি করেন।শুনানিতে তারা বলেন, ঘটনা ঢাকার, আসামিও ঢাকায় আর মিলি মায়া বেগম রংপুরে মামলা করেছেন। এখানে তার কি মানহানি হয়েছে? আর একটা টকশোর ব্যাপারে ঢাকায় মামলা হয়েছে। আর মামলাটি জামিনযোগ্য ধারার, তাকে আদালত জামিন দিতে পারেন। আদালত তাকে জামিন দিয়ে একটা যুক্তিসঙ্গত সময় দিয়ে নির্দেশনা দিতে পারেন। আর অজামিনযোগ্য হলে কী হবে, আপনার ভালো জানা আছে। মামলাটি জামিনযোগ্য ধারার এবং মইনুল হোসেন বয়স্ক, অসুস্থ বিবেচনায় তাকে জামিন দেওয়ার প্রার্থনা করেন তার আইনজীবী। ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল্লা আবু বলেন, ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের বক্তব্য সারা জাতি শুনেছে। সারা দেশের নারী জাতিকে অবমাননা করা হয়েছে। আর মামলাটি রংপুরের, তাকে সেখান থেকে জামিন নিতে হবে। আমরা জামিন দিতে পারি না। এখানে ডকুমেন্ট নেই, আপনার জামিন দেওয়ার সুযোগ নেই। তাকে রংপুরে পাঠানোর আবেদন করেন তিনি। এরপর কাজী নজিবুল্লাহ হিরু বলেন, তিনি একটি ঘৃণিত কাজ করেছেন। প্রকাশ্য টেলিমিডিয়ায় একজন খ্যাতনামা সাংবাদিককে ‘চরিত্রহীন’ বলেছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি মা-বোন, নারী জাতিকে, যারা পেশায় রয়েছে সকলকে হেয় করেছেন। বিশিষ্ট সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীরা তার বক্তব্য প্রত্যাহারের কথা বললেও তিনি তা করেননি। পরবর্তীতে তিনি নিউ নেশন পত্রিকায় একটা খোলা চিঠি লিখলেন। সেখানে বলা হল, আমি কেন! এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপনাকে চরিত্রহীন বলা হচ্ছে। এছাড়া, একটা ভিডিওতে তিনি মাসুদা ভাট্টিকে ৫/৬ বার বাজে মহিলা উল্লেখ করেন। কন্যা সমতুল্য মনে করে বলতেন, ভুল হয়েছে, ক্ষমা চাইতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি সকলকে আহত করেছেন, ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন নারীসমাজকে। ব্যারিস্টার মইনুলের জামিন নামঞ্জুরের আবেদন করেন কাজী নজিুবুল্লাহ হিরু। এরপর মাসুদ আহম্মেদ তালুকদার বলেন, কাকে কী বলেছে, আমরা সবাই জানি। জামিনযোগ্য ধারায় জামিন না দিলে আমরা জামিনের আবেদন প্রত্যাহার করব। এ সময় বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা আদালতে চেঁচামেচি শুরু করেন।তখন বিচারক জামিন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। ১টা ৫২ মিনিটে বিচারক আদালত থেকে নেমে যান। উল্লেখ্য, শুনানির মধ্যে আদালতে প্রবেশ করাকে কেন্দ্র করে বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা পুলিশের সাথে বাকবিত-ায় জড়ান। তখন বিচারক বলেন, সিকিউরিটির কারণে আদালতে প্রবেশ করা রেস্ট্রিক্ট করা হয়েছে। আর আপনাদের সিনিয়ররা তো কোর্টে আছেন। এ সময় তিনি সবাইকে শান্ত হতে বলেন। এদিকে মইনুল হোসেনের জামিন নামঞ্জুরের আদেশের পর আসামিপক্ষের আইনজীবীরা সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। আর আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা সরকারের পক্ষে বিভিন্ন স্লোগান দেন। প্রসঙ্গত, সোমবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাজধানীর উত্তরায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডির) সভাপতি আ স ম আব্দুর রবের বাসা থেকে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টিকে ‘চরিত্রহীন’ বলার অভিযোগে রংপুরে দায়ের করা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here