একগুচ্ছ কবিতা ॥ হাসানআল আব্দুল্লাহ

0
960

সময়ের সহজ ভগ্নাংশ
এই দশ মিনিট আমার। কেউ এতে
ভাগ বসাবার চেষ্টা করবে না।
আমি একটি সাগর কলা, একখÐ
শুকনো পা-রুটি আর এক কাপ চায়ে
ক্ষুধার্ত বাঘের মতো ব্যস্ত রাখবো নিজেকে।

মাত্র দশটি মিনিট। তারপর আল জবরের
উদ্ভাবনা আর পিথাগোরাসকে নিয়ে
সময় কাটাবো। জ্যামিতি ও বীজগণিতের
সাধারণ ও ফলিত জ্ঞান
থাকবে সাজানো পরপর। বিন্দু, রেখা,
কোণ, বৃত্ত, আয়ত ও বর্গক্ষেত্র সহ
নানাবিধ আকার আকৃতে
আমার দারুণ কেটে যাবে।

রেখাংশের মধ্যবিন্দু বের করা,
কার্টিশিয়ান প্লেনের উল্লম্ভ-আনুভূমিক অক্ষ ধরে
উভয় প্রান্তের শেষ সীমানায় পৌঁছানোর বিবিধ উপায়,
পরিমাপ; দ্বিঘাত সমীকরণ,
সূচকের বৃদ্ধি, অতঃপর নিদারুণ ক্ষয়
নিয়ে কাটাবো সারটা দিন। তার আগে
আমার সামান্য এইটুকু সংহত সময়!
এখনই শিক্ষার্থীরা দরজায় টোকা দেবে।
সুপ্রভাত, সুপ্রভাত বলে হইহুল্লোড়ে পড়বে ঢুকে।

০৯.২৫.২০১৮
উডহেভেন, নিউইয়র্ক

সাতশ’ কথার মালা
তোমার মতন হবো বলে গুছিয়ে রেখেছি ঘর
দুপুর রোদের যাত্রী নিয়ে, চমকপ্রদ দাবার
ঘুঁটি, নিয়ে সুদ্ধস্বর, বিছিয়ে দিলাম অগ্রন্থিত
সকল তারার আলো, রাত্রিগুলো সাজিয়ে দেবার

তুমিও সময় পাবে; তোমার ব্যথার পাহাড়েরা
স্বরবর্ণ আটকাবেÍসাপের মতন ফণা তুলে
ইচ্ছা হলে তখন তুমিও ভয় দেখাতেই পারো।
আবার তোমার ইচ্ছা যদি করে আমার মতন

হতে, সাতশ’ কথার মালা তুমি ভাসিয়ে দিতেও
পারো তোমার পাড়ায় বয়ে চলা ব্যস্ত নদী-স্রোতে।
০৯.১১.২০১৬
উডহেভেন, নিউইয়র্ক
Untitled-5
ধুলো প্রতিপাদ্য
সম্ভবত ধুলোগুলো আমাকে বলতে
পারেনি যে তারা একান্তে আমার গায়ে
লেগে থেকে পরিচ্ছন্ন সময় কাটাতে চায়।
বলতে পারেনি যে
নক্ষত্রগুলো ধুলো দিয়ে তৈরি,
মহাবিশ্বের কোনায় কোনায় অসংখ্য ধুলো জমে জমে
কোটি কোটি বছরে এভাবে গায়ে পায়ে বর্ধিত হয়েছে;
বস্তুত ধুলোই সৃষ্টির প্রথম মৌল,
একমাত্র খাঁটি।
১০.০৫.২০১৩
উডহেভেন, নিউইয়র্ক

আকাশ Untitled-6
আকাশ মানে সুবিস্তৃত
রহস্যময় জলের কণা
মেঘের উপর এবং নিচে
সামনে এবং আমার পিছে
আদর মাখা আলতো ছোঁয়া
ফুলের উপর প্রজাপতি
নদীর গতি স্রোতের গতি
আকাশ মানে পাতায় পাতায়
সন্ধ্যা সকাল কোলাকুলি
সবুজ বনের কোনায় কোনায়
রোদের ঝিলিক
আকাশ মানে বিল হাওড় আর
নানা রকম মাছের পিরিত
কেউ বলে শীত কেউবা আবার
ডুগডুগি আর ঢোলক বাজায়
রাজায় রাজায় কথা বলার
সুস্থ সবল হরেক মিছিল
আকাশ মানে সোনালি চিল
আমার কাব্যে তোমার কাব্যে
তাদের কাব্যে অজস্র মিল

আকাশ মানে বউয়ের কাছে
হাবাগোবা ব্যর্থ স্বামী
সব স্বামীই ব্যর্থ থাকে
অথচ এই ব্যর্থতাকে
ঢাকতে তারা
খানাখন্দে গুঁজে দেবেন
টুকরো টুকরো ছেঁড়া কাপড়
পাপড় ভাজা খায়নি যারা
তারা কোথায় আকাশ চেনে
আকাশ মানে এরোপ্লেনে
ঘোরাঘুরি শুধুই তো নয়
আরো আছে ফন্দি ফিকির
পীরের জিকির হীরের জিকির
আকাশ মানে একটা সিকির
আধেক দিয়ে বাদাম কেনা
তারপরেও হাজার দেনা
পরিশোধের উপায় তো নেই
থাকে না আর কানাকড়ি
ঘুরিয়ে ছড়ি উড়িয়ে ছড়ি
কেউ বা আবার আকাশ বানায়

আকাশ মানে আমি তুমি
আমরা তারা জগত জোড়া
নানান কাজের নতুন দোকান
কেউবা কিছু কম অথবা
কেউবা আবার বেশিই খান
মোদ্দা কথা গরু ছাগল
ভেড়া খাশি মুরগি মোরগ
ছাড়াও আছে
গ্যালাক্সি আর দুধের বাটি
সারা বছর কাটাকাটি
শুয়োর কুকুর বেজি বিড়াল
আজকে এবং আগামি কাল
বউয়ের ব্যথা মায়ের মালিশ
ছেলেপুলের হাজার নালিশ
নগর শহর গ্রাম ও বাগান
খোন্তা কোদাল কাঁচি কাছি
আর যা কিছু সব নিয়েই
আমরা থাকি এই আকাশে
আকাশ মানে আর কিছু নয়
যা যা আছে চারিপাশে
০৯.২৭.২০১৮
উডহেভেন, নিউইয়র্ক

আড়ং Untitled-9
কবিতা না চিনে তিনটি বেজিতে
মানুষগুলোকে মাপছে কেজিতে;
তামাশা দেখছে চতুর ফড়িয়া।
সুযোগ আবার যাবে কি সরিয়া!

বুদ্ধি বিবেক দিচ্ছে হাজিরা
অল্প খরচে কিনছে কাজিরা
মঞ্চে নিচ্ছে দু’ঠ্যাং ধরিয়া।
সুযোগ আবার যাবে কি সরিয়া!

মেলার খেলায়, অশেষ ঠেলায়
কখনো বা বেলা কিবা অবেলায়
দু’পায়ে পড়ছে ঝপাত করিয়া।
সুযোগে আবার যাবে কি সরিয়া!
০৫.২১.২০১৬
উডহেভেন, নিউইয়র্ক

আসল মানুষ
একটি বাতিল কাগজের টুকরো অক্লেশে
ছুঁড়ে ফেলে দিতে মন তোমারও চায়।
কথা আর কোদালের মাঝখানে
যখন অতৃপ্ত গলনালি
কেউ দাঁড় করিয়ে দিতেও
কসুর করে না,
তোমার কাছেও বোধ করি
তখন অন্তত মনে হওয়া
অস্বাভাবিক নয় যে
সক্রেটিস আদতেই আসল মানুষ।
০৬.১৬.২০১৭
উডহেভেন, নিউইয়র্ক

এবং প্রস্থান
দাঁড়াতে পারতেন যে সব কঙ্কাল
ঘুরেও বেড়াতেন যতোটা মন চায়
বিবিধ আড্ডায় সকালে সন্ধ্যায়
গল্প বলতেন শোক ও সাহসের।

এখন নেই আর শক্তি দাঁড়াবার
নেয় না সন্তান খবর প্রতিদিন
উঠতে বসতেও ভীষণ সংকট
শক্তি নেই আর মাছিও তাড়াবার।

তাই তো বাঁকা হয়ে নরম বিছানায়
এমন কোরে যেনো থাকেন তারা পড়ে
ভাবেন মনে মনে জীবন ধারণের
এখন কিবা আর রয়েছে দরকার!

তবুও দিন যায়, মাস ও বছরের
হিসেব ছাড়াই তো ধ্বংস হয় সব
স্মৃতির ঘাটে ঘাটে অশেষ পড়ে থাকা
হীরের চাঁই দিয়ে বাঁধানো সঞ্চয়।

পাড়া ও প্রতিবেশী হঠাৎ এক দিন
ভীষণ সচকিত, সভয়ে কান পেতে
দূরের রাস্তায় শুনতে পান কোনো
এম্বুলেন্সের অমোঘ সাইরেন।
১০.০৯.২০১৮
উডহেভেন, নিউইয়র্ক

যাত্রী
বাতাসে পর্যাপ্ত অক্সিজেন না থাকায়
আমার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
এমনও হতে পারে যে আমার
ফুসফুস যথাযথ শক্তি ধারণে সক্ষম
না হওয়ায় অন্যান্য জীবাণু সেকে
ওটু কণাগুলো প্রয়োজন মতো বের
করে নিতে পারছে না। আমার হাত পা
ক্রমাগত অসাড়-অবশ হয়ে যাচ্ছে।
চোখে অন্ধকার। আলোগুলো কে জেনো নিভিয়ে
দিতে লম্বা হাত বাড়িয়ে নক্ষত্রগুলো
ইচ্ছা মতো দূর গহŸরে মারছে ছুঁড়ে।
ঝাড়বাতিগুলো নিজে থেকেই নিরব
হয়ে আস্তে আস্তে কালো পিÐে পরিণত হচ্ছে।
ঘামে ভিজে গেছে আমার শরীর।
এতো পানি কোথা থেকে এলো?
কোষগুলো কেনো ছেড়ে দিচ্ছে
ধারণকৃত তাদের প্রয়োজনীয় তরল!
ট্রেনে এতো লোক,
পা রাখার ঠাঁই পর্যন্ত এখানে নেই-
অথচ আমার অবস্থাটা কেউ বুঝতে পারছে না।
ওরাও কি আমারই মতন নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে?
ওদেরও কি নিশ্বাস নিতে ভয়ঙ্কর কষ্ট হচ্ছে!

১০.০২.২০১৮
মাটহল হাইস্কুল, নিউইয়র্ক

Share on Facebook