অবসাদ ‍॥ সোনালী দে

0
29

নরম সবুজ গুল্মে ফুল আর ফুলের উপর আশ্বিনের শিশির, রাতফুল হোক বা দিনফুল চুঁইয়ে পড়ে ওর ভালবাসা। ও ভালবাসার পুতুল। বয়স সবে ষোলোর চৌকাঠ ডিঙিয়েছে। মাখোমাখো প্রেম দাদার বন্ধু নির্বাণের সঙ্গে। ছাদের পাঁচিলের ধারে সন্ধ্যে রাতে ফিস্ ফিস্ প্রেম যে কি ভয়ানক আবেগ-নির্বোধ করে দেয় তা যে অনুভব করেছে সেই জানে। মা ও বিশ্বাস করত নির্বাণকে। আর ‘বিশ্বাসে মিলায় কষ্ট, ক্ষতে ব্যথাময়’। সমাজ অনেক এগিয়েছে পরিপাটি কায়দায় মন খেলাতে। হায়ার সেকেন্ডারি শেষ, কোচিংও শেষ সঙ্গে সম্পর্কও। বিজ্নেস ম্যানেজমেন্ট পড়তে কানপুরে পাড়ি দিল নির্বাণ। ও আর খোঁজ খবরও নেয় না তুলির। তুলির তুলোর মতো মনে অচেনা বরফেরা ভিড় জমায়, তবে কি সেই জোনাকি দীপ্তিময় হীরে মাণিকের রাত, সবুজ ছোঁয়া প্রতিশ্রুতি সবই ছিল মিথ্যে! তুলির তখন সেকেন্ড ইয়ার ম্যাথ-এ অনার্স ভোরের বিদ্যাসাগর কলেজ ছিল প্রতিদিনের পাওনা স্থল। তখনই সে এল, বিবেক। বিবেক বেসরকারী সংস্থার উচ্চপদের কর্মী। বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। মেয়ে পছন্দ, বাবা মা আর দেরী করার পক্ষপাতী নন, বিয়ে হল। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ছেলে। তবে সুখের সংসার। কোন অশান্তিই নেই। কিন্তু নির্বাণ ওর থেকে যা নিয়ে গেছে তা ও আর ফেরত পায়নি। তাই কোথাও যেন একটা দাগ থেকে গেছে। তবুও মনকে মানিয়ে সংসার করে সযতেœ। শুধু যখন চাঁদ আসে এক চোখ ঘুম নিয়ে, ছাদের ফুলগুলো সব কিছু ওলট পালট করে দেয়। চলছিল বেশ, শ্বশুর শাশুড়ী গত হলেন মাস তিনেকের ব্যবধানে। এদিকে বিবেকের বদলির অর্ডার। সুবর্ণ তখন ক্লাস সিক্সে। অনেক কষ্ট করে ছেলেটাকে কলকাতার নামী ইংলিশ মিডিয়ামে ঢুকিয়েছিল। তাই ছাড়াতে মন চাইল না। তারপর বিবেকেরও আপত্তি টানা হেঁচড়ায় ছেলের পড়াশোনার ক্ষতি হবে। বিবেক চলে গেল রাজস্থান। সব চাপ এসে পড়ল তুলির ঘাড়ে। বেশ কিছুদিন এমনি ভাবেই কাটল। ভগবান বোধহয় সবসময় সদয় থাকেন না। অফিসের লিফ্ট গন্ডগোল থাকায় সর্বদা মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকা বিবেক সিঁড়ি দিয়ে পড়ে গেল বেখেয়াল বশে। তারপর আর কি ফিরল কলকাতায়, স্পাইনাল কর্ডের তিনটুকরো হাড় জোড়া লাগল ঠিকই কিন্তু অপারেশনের গাফিলতিতে দুটো পা এক্কেবারে অসাড়। অথর্বের একমাত্র সঙ্গী হুইল চেয়ার। তুলি দাঁতে দাঁত চিপে সহ্য করে সবই। ছেলেটাকে তো মানুষ করতে হবে। ছেলেটাও ব্রিলিয়ান্ট। মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট। ওর ছোট থেকেই সমুদ্র নেশা। এবার সফল। নেভিতে মোটা মাইনের চাকুরী নিয়ে কলকাতা ছাড়ল। তুলির এখন সঙ্গী অসুস্থ বিবেক আর লক্ষাধিক অবসাদ। মাথাটা মাঝে মাঝেই বেশ ঝিম্ঝিম্ করে। হাত পা কাঁপে, কাকেই বা বলবে। আর বলেই বা কি করবে ! নার্ভের ঔষুধ খায় লুকিয়ে। বাজার দোকান সবই একা। একা থাকতে থাকতে দিন দিন কেমন যন্ত্র হয়ে উঠছিল। ভাগ্য কখন যে কার সঙ্গে কি খেলে। একদিন পার্কস্ট্রীটে শপিং করতে গিয়ে নির্বাণের সঙ্গে দেখা। ভারী অদ্ভুত যোগাযোগ। চলমান সিঁড়ির ডাউনে তুলি আপ-এ নির্বাণ। ওর বাঁ হাতে একটা রং-এর তুলির ট্যাটু করা ছিল হঠাৎ চোখ চলে যায় তুলির।তারপর যা হবার তাই হল। নতুন করে বাক্য বিনিময় ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট, হোয়াটস্ অ্যাপ, ম্যাসেঞ্জার। শুধু প্রেম আর প্রেম। ওর কি যে হল সুবর্ণর সাথে কথা বলারও সময় পায় না। বন্ধ ঘরে কখনো কখনো ভাবে না যে তা নয়। সে অন্যায় করছে না তো ? নির্বাণতো প্রতারণাই করেছিল তবে আজ কেন ওর প্রতি এতো নরম হলো। উত্তর পায় না তবে কি চাহিদাই ওর জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রু। ও কী লোভী হয়ে উঠেছে ? ও কি বিবেককে নিত্য ঠকাচ্ছে ? বুঝতে পারে না কিছুই। ওর শরীরটা বেশ ভালো বোধ করে আজকাল। নার্ভের ঔষুধগুলো ও আর খেতে হয় না। মাল্টিপ্লেক্সে সিনেমা, পার্কে, ময়দানে কোথায় না ছুটছে। বিবেক কিছু আঁচ করেও মুখ ফুটে কিছুই বলে না। চাপা রাগ হলেও প্রকাশ করে না। তুলি ভালো আছে দেখে মনে মনে বেশ তৃপ্তিও পায়। যেদিন নির্বাণের হাত ধরে বসে ছিল পার্কের সীটে আর ওর স্মার্ট ফোনটা ছিল তুলিরই হাতের তালুতে সেদিনই ফোনটা এল লুকোতে পারেনি কিছু নির্বাণ। ওর সমস্ত সত্য মিথ্যের দর্পণ ভেঙে বেড়িয়ে এসেছিল তাজা বুলেটের মতো। স্ত্রী বিয়োগের মিথ্যে অভিনয় করে যে সহানুভ‚তি আদায় করেছিল সব এক নিমেষে ঘৃণায় পর্যবসিত হল, খাল উপছানো পাঁকের মতো। তুলি ভাবতে থাকে নিজে হাতে মনের খাল কেটে ঐ ভয়ঙ্কর কুমীরকে তো ওই ঢুকতে দিয়েছিল। প্রতারককে বিশ্বাস করে ও কি ভুল করেছিল তা এখন প্রতিটি পদক্ষেপে মালুম পাচ্ছে। সে সন্ধ্যের চাঁদ বিষে নীল হয়ে রাত নামলো কলকাতার প্রাণহীন ছাতে। রাত বাড়লো, গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন বিবেক। ডাইনিং-এ পেট্রল ঢেলে একটা দেশলাই কাঠি। ব্যস ভয়ঙ্কর চীৎকারে পাড়া কেঁপে উঠল। বিবেকের ঘুম ভেঙে ও হুইল চেয়ার নিয়ে ছুটে গেল তুলির দিকে। জ্বলন্ত তুলি ওকে জাপটে ধরল। এ কোন দুঃস্বপ্ন! বিপদ বুঝি অসুস্থকে ও মুহূর্তের জন্য শক্তিশালী বানিয়ে দেয়। ও মেইন দরজা খুলে গড়িয়ে পড়ে সিঁড়ি দিয়ে বিবেকও জ্বলছে পোড়া বস্তার মতো। সামনের ফ্লাটের নীপাদি কোনরকমে বিবেকের আগুন নেভায়। বিবেক বসে আছে সিঁড়ির শেষ ধাপটাতে। পিচ্ গলানো ধোঁয়ার থেকেও ভয়ঙ্কর কালো হয়ে পুড়ছে তুলির ঝলসানো দেহটা ভাগ্য কখন যে কার সঙ্গে কি খেলে। একদিন পার্কস্ট্রীটে শপিং করতে গিয়ে নির্বাণের সঙ্গে দেখা। ভারী অদ্ভুত যোগাযোগ। চলমান সিঁড়ির ডাউনে তুলি আপ-এ নির্বাণ। ওর বাঁ হাতে একটা রং-এর তুলির ট্যাটু করা ছিল হঠাৎ চোখ চলে যায় তুলির।তারপর যা হবার তাই হল। নতুন করে বাক্য বিনিময় ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট, হোয়াটস্ অ্যাপ, ম্যাসেঞ্জার। শুধু প্রেম আর প্রেম। ওর কি যে হল সুবর্ণর সাথে কথা বলারও সময় পায় না। বন্ধ ঘরে কখনো কখনো ভাবে না যে তা নয়। সে অন্যায় করছে না তো ? নির্বাণতো প্রতারণাই করেছিল তবে আজ কেন ওর প্রতি এতো নরম হলো। উত্তর পায় না তবে কি চাহিদাই ওর জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রু। ও কী লোভী হয়ে উঠেছে ? ও কি বিবেককে নিত্য ঠকাচ্ছে ? বুঝতে পারে না কিছুই। ওর শরীরটা বেশ ভালো বোধ করে আজকাল। নার্ভের ঔষুধগুলো ও আর খেতে হয় না। মাল্টিপ্লেক্সে সিনেমা, পার্কে, ময়দানে কোথায় না ছুটছে। বিবেক কিছু আঁচ করেও মুখ ফুটে কিছুই বলে না। চাপা রাগ হলেও প্রকাশ করে না। তুলি ভালো আছে দেখে মনে মনে বেশ তৃপ্তিও পায়। যেদিন নির্বাণের হাত ধরে বসে ছিল পার্কের সীটে আর ওর স্মার্ট ফোনটা ছিল তুলিরই হাতের তালুতে সেদিনই ফোনটা এল লুকোতে পারেনি কিছু নির্বাণ। ওর সমস্ত সত্য মিথ্যের দর্পণ ভেঙে বেড়িয়ে এসেছিল তাজা বুলেটের মতো। স্ত্রী বিয়োগের মিথ্যে অভিনয় করে যে সহানুভ‚তি আদায় করেছিল সব এক নিমেষে ঘৃণায় পর্যবসিত হল, খাল উপছানো পাঁকের মতো। তুলি ভাবতে থাকে নিজে হাতে মনের খাল কেটে ঐ ভয়ঙ্কর কুমীরকে তো ওই ঢুকতে দিয়েছিল। প্রতারককে বিশ্বাস করে ও কি ভুল করেছিল তা এখন প্রতিটি পদক্ষেপে মালুম পাচ্ছে। সে সন্ধ্যের চাঁদ বিষে নীল হয়ে রাত নামলো কলকাতার প্রাণহীন ছাতে। রাত বাড়লো, গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন বিবেক। ডাইনিং-এ পেট্রল ঢেলে একটা দেশলাই কাঠি। ব্যস ভয়ঙ্কর চীৎকারে পাড়া কেঁপে উঠল। বিবেকের ঘুম ভেঙে ও হুইল চেয়ার নিয়ে ছুটে গেল তুলির দিকে। জ্বলন্ত তুলি ওকে জাপটে ধরল। এ কোন দুঃস্বপ্ন! বিপদ বুঝি অসুস্থকে ও মুহূর্তের জন্য শক্তিশালী বানিয়ে দেয়। ও মেইন দরজা খুলে গড়িয়ে পড়ে সিঁড়ি দিয়ে বিবেকও জ্বলছে পোড়া বস্তার মতো। সামনের ফ্লাটের নীপাদি কোনরকমে বিবেকের আগুন নেভায়। বিবেক বসে আছে সিঁড়ির শেষ ধাপটাতে। পিচ্ গলানো ধোঁয়ার থেকেও ভয়ঙ্কর কালো হয়ে পুড়ছে তুলির ঝলসানো দেহটা…

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here