৭ হাজার কোটি টাকার নির্বাচন

0
28

নিজস্ব প্রতিবেদক :  গত অষ্টম নবম সংসদ নির্বাচনের ব্যয়ের তুলনায় এবারের নির্বাচনী ব্যয় সাধারণভাবে দ্বিগুণ এবং কোন কোন ক্ষেত্রে তিনগুণের বেশি বেড়েছে। নির্বাচন কমিশন কর্তৃক বেঁধে দেয়া খরচের চেয়ে বড় তিন দলের প্রার্থী পিছু ব্যয় বেড়েছে কয়েক শতগুণ। এই ব্যয়ের সবগুলো দৃশ্যমান ও বৈধ নাহলেও এই খরচটাই মুখ্য এবং ফলাফল নির্ধারণে নিয়ামক।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, চোরাচালানের নেপথ্য নায়কদের সংখ্যা থাকছে উল্লেখযোগ্য। আওয়ামী, বিএনপি, জাতীয় পার্টি এই তিন দলেই এরা থাকছেন। এই সংসদে ব্যবসায়ী, শিল্পপতির সংখ্যা দেড় শতাধিক। তিন দলেই মনোনয়ন দৌড়ে রয়েছেন দেড় সহস্রাধিক ব্যবসায়ী-শিল্পপতি। মনোনয়ন নিশ্চিত করতেই প্রত্যেকে এক থেকে পাঁচ কোটি টাকা নিয়ে মাঠে নেমেছেন। নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার জন্য প্রত্যেকেরই দুই থেকে দশ কোটি টাকার বাজেট রয়েছে। এ ধরনের পঁচিশ জনের বেশি প্রার্থী ও মনোনয়ন প্রত্যাশী ও তাদের ঘনিষ্টজনদের সঙ্গে আলাপ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। এদের হিসেবে প্রধান খবরই হচ্ছে ভোটারদের রাতের আঁধারে টাকা দিয়ে ভোট কেনা। নানা কৌশলে সঙ্গোপনে দিবালোকেও এ কাজটি করা হবে। নির্বাচন কমিশন প্রার্থী প্রতি দশ লাখ টাকা থেকে সর্বোচ্চ পঁচিশ লাখ টাকা বেঁধে দিয়েছে। প্রত্যেক ভোটারের জন্য তারা দশ টাকা খরচ করতে পারবেন। বৈধ পথের এ’ খরচগুলোর খাতওয়ারি হিসাবও নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা দেয়া হবে। কিন্তু নেপথ্যের বিশাল ব্যয় নির্বাচন কমিশনের অজানাই থেকে যাবে। কালো টাকা নিয়ন্ত্রণে নির্বাচন কমিশনের কোন কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ার অবর্তমানে অবৈধভাবে অর্থ ব্যবহার রোধ করা সম্ভব হবে না।
নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা খাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ব্যয়ের বড় অংশ ব্যবহার করবে। সরকারিভাবে মোট ব্যয় হচ্ছে ৩ হাজার ২৬৫ কোটি টাকার বেশি। ইভিএম প্রকল্পেই যাচ্ছে ২ হাজার কোটি টাকা। পুলিশ, আনসার, র‌্যাব, বিজিবির পিছনে ব্যয় হবে প্রায় ৫শ’ কো্িট টাকা। সেনাবাহিনীর জন্য যাবে ৫০ কোটি টাকা। ব্যালট পেপার ছাপানো, অমোচনীয় কালি, স্ট্যাম্প, সীল, মুদ্রণ সামগ্রী ক্রয়, ব্যাপক যাতায়াত, ব্যালট বাক্স, ব্যালট পেপারসহ সরঞ্জামাদি পরিবহন, নির্বাচনী দায়িত্বে থানা কর্মকর্তাদের যাতায়াতে জ্বালানি খরচসহ আনুষঙ্গিক বিভিন্ন খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১শ কোটি টাকা। সোয়া সাত লাখ নির্বাচন পরিচালনা কর্মী, প্রায় ৬ লাখ পোলিং অফিসার, ৮০ হাজার ২৯৮ জন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার, ৪০ হাজার ১৯৯ জন প্রিজাইডিং অফিসারের পিছনে খচর হবে ২শ কোটি টাকা। ৩শ আসনে ভোটকেন্দ্র থাকবে ৪০ হাজার ১৯৯টি। এর মধ্যে ২০ হাজারের বেশি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ। সব মিলিয়ে সরকারিভাবেই ব্যয় হবে ৩ হাজার ৩২৫ কোটি টাকার বেশি।
বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করবেন প্রার্থীরা। দলীয় মনোনয়ন নিশ্চিত করতে অনেক প্রার্থীকেই মোটা অঙ্কের অর্থ খরচ করতে হয়েছে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ব্যক্তিগতভাবে দেখার পরও দলের কোন কোন শীর্ষস্থানীয় নেতা, জেলার নেতা ও নেপথ্যের শক্তিশালী মহল কর্তৃক ২০ লাখ থেকে ৫০ কোটি টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ১৪ দলের শরিক কয়েকটি দলের শীর্ষ নেতাদের সম্পর্কেও একই কথা রয়েছে। ধর্মভিত্তিক কয়েকটি দলেও মনোনয়ন বাণিজ্যে জড়িত থাকার ঘটনা রয়েছে। সকলের শীর্ষে রয়েছে জাতীয় পার্টি প্রধান এরশাদ, রুহুল আমিন হাওলাদার এবং তাদের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন নেতা। নির্বাচনের জন্য পার্টি ফান্ডগঠনের নামে এভাবে অর্থ ছাড়াও প্রত্যেক প্রার্থীকে বিশাল অংকের অর্থ ব্যয়ের বাজেট করতে হচ্ছে। প্রচলিত বিধিবদ্ধ খরচ ছাড়াও অপ্রদর্শিত খরচই এখানে অনেক বেশি। এ ধরনের খরচ প্রায় সকল প্রার্থীই কমবেশি। তবে এভাবে তা অভাবনীয় রকম বেশি।
অপ্রদর্শিত ব্যয়ের প্রধান খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে হাতে রাখা, দলের অঙ্গ সংগঠনসমূহের স্থানীয় সভাপতি, সম্পাদকসহ ওয়ার্ড ও ইউনিয়নভিত্তিক নেতাদের ও নেতৃস্থানীয় কর্মী, সংগঠকদের সন্তুষ্ট রাখা, ওয়ার্ডভিত্তিক প্রভাবশালীদের হাতে নেয়া, বিরোধী দলীয় প্রার্থীদের প্রভাবশালীদের প্রভাবিত করা, মসজিদ, মন্দির, ক্লাবকে গোপনে অনুদান প্রদান। বড় খরচ হবে বিভিন্ন ওয়ার্ডে দরিদ্র, অতি দরিদ্রদের সহায়তা দান। ভোটের দুদিন আগে থেকে শুরু হবে ভোট কেনা। নির্দিষ্ট এলাকাসমূহে নির্দিষ্ট লোক দিয়ে অত্যন্ত গোপনে এই অর্থ দেয়া হয়।
নির্বাচনী এলাকাসমূহে প্রতিদ্ব›িদ্বতা হবে আওয়ামী লীগ, বিএনপির মধ্যে। অনেক এলাকায় জাতীয় পার্টিও ফ্যাক্টর হবে। প্রত্যেক নির্বাচনী এলাকায় এই তিন পার্টির প্রার্থীরা মাথাপিছু দুই কোটি থেকে পাঁচ কোটি টাকার নির্বাচনী বাজেট নিয়ে মাঠে নেমেছে। এলাকার জনসংখ্যা, দারিদ্র্য হার এবং প্রার্থীদের আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী নির্বাচনী অপ্রদর্শিত ব্যয়ের পরিমাণও বাড়বে। অনেক নির্বাচনী এলাকায়ই এই ব্যয়ের পরিমাণ দশ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। তিন পার্টির মনোনয়নের ক্ষেত্রে প্রার্থীর আর্থিক সামর্থের ব্যাপারটি অন্যতম বেরোমিটার হিসেবে নেয়। জামায়াত ইসলামীও মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়ে নির্বাচনে নেমেছে। প্রত্যেক প্রার্থীকে পার্টি থেকে প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান দেয়া হচ্ছে। প্রত্যেক নির্বাচনী এলাকায় নির্বাচন কমিশন নির্ধারিত খাতগুলো ছাড়াও প্রার্থীদের অপ্রদর্শিত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে ৭ থেকে সাড়ে ৭ কোটি টাকা। সারাদেশে ছড়িয়ে পড়বে আড়াই হাজার কোটি টাকার বেশি।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here