শ্রমিক বিক্ষোভ থামছে না: সাভারে অর্ধশতাধিক কারখানা ছুটি

0
88

সোলাইমান, আশুলিয়া প্রতিনিধি: বেতন বৈষম্যের অভিযোগে টানা চতুর্থ দিনেও সাভার-আশুলিয়ার পোশাক কারখানার শ্রমিকদের সাথে পুলিশের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। এতে শ্রমিক ও পুলিশসহ আহত হয়েছে অন্তত ৩০জন। শিল্পাঞ্চলের প্রায় অর্ধশতাধিক পোশাক কারখানার শ্রমিকরা আন্দোলনে অংশ নেয়। এসময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে রাখতে বিভিন্ন পোশাক কারখানার সামনে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে ।
বুধবার সকালে সাভারের উলাইল ও আশুলিয়ার জামগড়া, নরসিংহপুর, ঘোষবাগ, নিশ্চিন্তপুর, সরকার মার্কেট ও কাঠগড়া এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে শ্রমিক বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। পুলিশের সাথে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের চলে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া।
পুলিশ ও শ্রমিকদের একাধিক সূত্র জানান, প্রতিদিনের মতো সকাল ৮টায় কারখানায় প্রবেশ করে শ্রমিকরা বেতন বৈষম্যর দাবি তুলে সাভারের উলাইল ও আশুলিয়ার কাঠগড়া, জামগড়া, ঘোষবাগ, নিশ্চিন্তপুর ও নরসিংহপুর এলাকায় বেশ কয়েকটি কারখানার অভ্যন্তরে কাজ বন্ধ রেখে বসে থাকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শ্রমিকরা সাভারের উলাইল এলাকার আনলিমা অ্যাপারেলস পোশাক কারখানার ৬ষ্ঠ তলায় ফিনিশিং সেকশনের শ্রমিক সুমন মিয়া (২২)  নিহতের কথা জানতে পারেন। এরপরই শ্রমিকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে সহকর্মী হত্যার প্রতিবাদ ও বেতন কাঠামোর বৈষম্য দূর করার দাবীতে কারখানা থেকে বেড়িয়ে এসে রাস্তায় নেমে আসে। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা রাসন্তায় নেমে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপসহ রাস্তায় বস্তা ও বড় বড় ইটের চাকা ফেলে অবরোধ করে রাখে। সকাল ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত সাভারের হেমায়েতপুর থেকে নবীনগর (ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক), আশুলিয়া বাজার বাসস্ট্যান্ড থেকে বাইপাইল (আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল মহাসড়ক) অবরোধ করে যান চলাচলে বাধা দেয়। মহাসড়কগুলোতে পুলিশ ও বিজিবির গাড়ী পৌছলে শ্রমিকরা তাদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে, পুলিশও পাল্টা রাবার বুলেট, টিয়ারসেল নিক্ষেপ করলে উভয়পক্ষের মধ্যে কয়েখদফা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এসময় পুলিশ শ্রমিকদের উপর লাঠিচার্জ ও কাদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। এতে উভয় পক্ষের প্রায় ৩০ জনের মত আহত হয়েছে। আহতদের স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার হয়েছে বলে শ্রমিকরা জানান।
আশুলিয়ার বেরন এলাকার নারী ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্রের পরিচালক রফিকুল ইসলাম জানান, সকালে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত প্রাপ্ত ১৪ জন শ্রমিককে চিকিৎসা দিয়েছেন। এদের মধ্যে মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত স্টার্লিং এ্যাপারেলসের আয়রন ম্যান শাহীনকে রক্তাক্ত অবস্থায় ভর্তি করেন তার সহকর্মীরা। আশুলিয়ার বিভিন্ন প্রাইভেট হাসপাতালে বশে কয়েকজন শ্রমিক চিকিৎসা নিয়েছেন বলে শ্রমিকরা জানান।
মহাড়কে যানবাহন না থাকায় বিপাকে পড়েন যাত্রীরা। দুপুর ১২টার পর বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের উপস্থিতি কমতে থাকলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে থাকে।
এরই মধ্যে সাভারের স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের শামস স্টাইল ওয়্যারস লিমিটেডসহ তিনটি কারখানা ও আশুলিয়ার জামগড়া, নরসিংহপুর, ঘোষবাগ, নিশ্চিন্তপুর, সরকার মার্কেট ও কাঠগড়া এলাকার প্রায় অর্ধশতাধিক কারখানা ছুটি ঘোষনা করেন কর্তৃপক্ষ। আশুলিয়ার চারাবাগ এলাকার নিউ এশিয়া এবং ম্যাট্রো কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছেন মালিকপক্ষ।
এব্যাপারে শিল্প পুলিশ-১ এর পরিচালক সানা শামীনুর রহমান শামীম জানান, পোশাক কারখানাগুলোতে কাজের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে মালিকপক্ষের সাথে আলোচনা হচ্ছে। তিনি আরো জানান, সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে বেতন কাঠামো নিয়ে পোশাক কারখানার শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনের সুষ্ঠু সমাধানের জন্য এক মাসের সময়সীমা দেওয়া হয়েছে। একটি সমস্যার সমাধান নিয়ে যখন আলোচনা হয় তখন আর আন্দোলনের কোন কারন থাকে না। সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে একটি মহল শ্রমিকদের দিয়ে শান্ত পরিবেশ আশান্ত করতে চেষ্টা করছে বলে ধারনা করছেন তিনি। কারখানাগুলোর কর্মপরিবেশ ফিরিয়ে আনতে ও শ্রমিকদের কাজে ফেরাতে পুলিশের সাথে বিজিবি সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ৮ জানুয়ারী মঙ্গলবার বিকালে মতিঝিলের শ্রমভবনে মালিকপক্ষ, শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে দুই ঘণ্টা বৈঠক করেন নতুন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি ও শ্রম প্রতিমন্ত্রী বেগম মুন্নুজান সুফিয়ান। বৈঠক শেষে মালিক পক্ষের ৫ জন, শ্রমিক পক্ষের ৫ জন এবং সরকারের বাণিজ্য সচিব ও শ্রম সচিবকে নিয়ে মোট ১২ সদস্যের কমিটি করা হয়। এ কমিটি আগামী এক মাসের মধ্যে মজুরির অসঙ্গতিগুলো খতিয়ে দেখবে এবং সমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ নেবে।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের জানেেনা হয় নতুন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী যে বেতন কাঠামো ঘোষনা করা হবে এতে যারা কম বেতন পায় পরবর্তীতে ওই বেতন পরিশোধ করা হবে।
বর্তমান শ্রমিক আন্দোলনের পেছনে শিল্পের বাইরের লোকের ইন্ধন আছে বলেও নিজের সন্দেহের কথা জানান  বানিজ্য মন্ত্রী টিপু মুনশী।
তিনি আরো বলেন, তৃতীয় পক্ষের কেউ শ্রমিকদের বিভ্রান্ত করছে। শ্রমিকরা যাতে কোনো রকম গুজব কিংবা উস্কানিতে পা না দেন সেদিকে নজর রাখতে হবে। এখন থেকে ইন্ডাস্ট্রিবিরোধী কোনো কর্মকা- করলে তা কঠোর হাতে দমন করার হুশিয়ারীও উচ্চারণ করেন তিনি।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here