চলতি মাসেই যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মামলা

0
42

আনোয়ারা পারভীন : বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি দল রিজার্ভ থেকে চুরি যাওয়া অনুদ্ধারিত ৬ কোটি ৬৪ লাখ ডলার উদ্ধারে মামলার কার্যক্রম চুড়ান্ত করে দেশে ফিরেছেন। চলতি মাসের যে কোন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মামলাটি করা হবে। সমঝোতার মাধ্যমে টাকা উদ্ধার সম্ভব না হওয়ায় মামলায় ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংক (আরসিবিসি)-কে প্রধান আসামী এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক’ (ফেড)-কে দ্বিতীয় আসামী করা হতে পারে। মামলা দায়েরের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দুটি ল’ ফার্ম চুড়ান্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এই মামলা পরিচালনায় ব্যায় হবে ৬৬ লাখ ৪০ হাজার ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম গতকাল এ তথ্য জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক মামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দুটি ল’ ফার্মকে নিয়োগ দিয়েছে। এই ফার্ম দুটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলামের নের্তৃত্বে উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল যুক্তরাষ্ট্রে যান। আর ৮ জানুয়ারি রাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান আবু হেনা মোহাম্মদ রাজি হাসান যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ঐ দলের সাথে মিলিত হন। ৪ সদস্যের প্রতিনিধি দল সোমবার দেশে ফিরে আশা প্রকাশ করে বলেছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সেখানে মামলা করা সম্ভব হবে। নিয়ম অনুযায়ী, আগামী ৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে এ মামলা করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র জানান, রিজার্ভ চুরির বিষয়ে প্রধান আসামি করা হবে ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংককে (আরসিবিসি)। ল’ ফার্মের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপের পর যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে দ্বিতীয় আসামি করার কথা বলা হয়েছে। বিষয়টি সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে। এর আগে গত নভেম্বরে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক (ফেড) এর পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে চিঠি দিয়ে বলা হয়েছে, ফেড বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির অর্থ উদ্ধারে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম জানান, ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে গচ্ছিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ লেনদেনকারী হিসাব হতে সুইফট সিস্টেম ব্যবহার করে মোট ৭০টি ভুয়া পেমেন্ট বার্তা পাঠানো হয়। এর মাধ্যমে সর্বমোট ১৯২ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার স্থানান্তরের প্রচেষ্টা চালায় হ্যাকাররা। এর মধ্যে ১টি বার্তার বিপরীতে শ্রীলংকায় ২ কোটি মার্কিন ডলার এবং ৪টি বার্তার মাধ্যমে মোট ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার ফিলিপাইনের একটি ব্যাংকের চারজন গ্রাহকের হিসাবে প্রেরণ করা হয়।
শ্রীলঙ্কার প্যান এশিয়া ব্যাংকিং করপোরেশনে চলে যাওয়া অর্থ আটকে যায় একটি বানান ভুলের কারণে। শ্রীলংঙ্কায় শালিকা ফাউন্ডেশন নামে একটি এনজিওর অ্যাকাউন্টে ২ কোটি ডলার পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু হ্যাকার অর্ডারে ভড়ঁহফধঃরড়হ এর জায়গায় ভধহফধঃরড়হ লিখেছিল। তাতেই ব্যাংক কর্মকর্তাদের সন্দেহ হয়। স্থানান্তর আটকে দেওয়া হয়। পরে যোগাযোগ করা হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে। ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ‘স্টপ পেমেন্ট রিকোয়েস্ট’ ম্যাসেজ পাঠানোর পর ২ কোটি ডলার আটকে দেয় সে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০ মিলিয়ন ডলার চলে আসলেও ৮১ মিলিয়ন ডলার চলে যায় ফিলিপাইনের জুয়ার আসরে। ফিলিপাইনের রিজল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশনের (আরসিবিসি) ৪টি হিসাবে জমা হয় সেই অর্থ। যা পরবর্তীতে একটি মানি রেমিটেন্স কোম্পানি হয়ে ফিলিপাইনে পরিচালিত ক্যাসিনোতে চলে যায় এবং পরবর্তীতে তা একজন ফিলিপিনো-চাইনিজ ব্যবসায়ী কর্তৃক তুলে নেওয়া হয়। মোট ৮১ মিলিয়ন ইউএস ডলার আরসিবিসির জুপিটার স্ট্রিট, মাকাতি সিটি শাখায় পরিচালিত ভূয়া হিসাবে স্থানান্তর হয়। ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের বাণিজ্যিক ব্যাংক আরসিবিসির বিরুদ্ধে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্তের ভার তাদের এন্টি মানিলন্ডারিং বিভাগের উপর অর্পণ করে। পরে রিজল ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখাসহ তিনটি ব্যাংকের হিসাবসমূহ স্থগিতকরণসহ আনুষ্ঠানিক তদন্তের নির্দেশ জারি করা হয়। ফিলিপাইনের সিনেটের ব্লু রিবন কমিটিতে মোট ৭টি শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে যেখানে অর্থ চুরির বিষয়ে ফিলিপিনো চাইনিজ ব্যবসায়ী কিম, রিজল ব্যাংকের বিভিন্ন কর্মকর্তা, মানি রেমিটেন্স কোম্পানি ফিলমোর সার্ভিসেস কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট অন্যদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়গুলো উন্মোচিত হয় এবং এর ভিত্তিতে প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্য ব্যবহার করে ফিলিপাইনের আইনি প্রক্রিয়া চলতে থাকে।
ফিলিপিনো-চাইনিজ ব্যবসায়ী কিম অং কর্তৃক নগদে ফেরতকৃত ১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বাংলাদেশকে ফেরত প্রদানের জন্য এন্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিল ও কিম অং কর্তৃক আদালতে একটি জয়েন্ট মোশন দাখিল করা হয়। এর মাধ্যমে দেড় কোটি ডলার বাংলাদেশ ফিরে পাবে বলে আশা করা হয়েছে। কিন্তু উদ্ধার করা যায়নি ৬ কোটি ৬৪ লাখ ডলার।
রিজার্ভ চুরির এই ঘটনা ঘটার এক মাস পর্যন্ত সরকার ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে গোপন রাখে বাংলাদেশ ব্যাংক। সে সময় দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান ব্যাপক সমালোচনার প্রেক্ষিতে পদত্যাগ করেন।
ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংকের তখনকার ব্যবস্থাপক মায়া সান্তোস-দেগুইতোকে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দিয়েছে দেশটির আদালত। গেলো ১০ জানুয়ারি মায়ার বিরুদ্ধে আটটি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় প্রতিটি অপরাধে তাকে চার থেকে সাত বছরের কারাদন্ডের রায় দিয়েছে ফিলিপাইনের মাকাতির আঞ্চলিক আদালত। একই সঙ্গে ১০ কোটি ৯০ লাখ ডলার জরিমানা পরিশোধ করারও আদেশ দেওয়া হয়েছে। মাকাতির আঞ্চলিক আদালত ২৬ পৃষ্ঠার রায়ে বলা হয়েছে, ওই ঘটনার সময় আরসিবিসি জুপিটার শাখার দায়িত্বে ছিলেন মায়া। সুতরাং অর্থ পাচারের দায়ে অবশ্যই তিনি অপরাধী। চারটি অজানা ও কাল্পনিক হিসাবে কোটি ডলার অর্থ জমা এবং তা তুলে নেওয়ার সুযোগ দিয়েছেন মায়া। এ অর্থ একটি রেমিট্যান্স প্রতষ্ঠানের মাধ্যমে পেসোতে রূপান্তর করে জুয়ার বাজারে নিয়ে যাওয়া হয়।
ফিলিপাইনে যাওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলারের মধ্যে এখনো উদ্ধার করা যায়নি ৬ কোটি ৬৪ লাখ ডলার। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের জন্য আইনি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চূড়ান্ত আলোচনা করতে বর্তমানে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি দল যুক্তরাষ্ট্রে আছেন। দফায় দফায় সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময়ে ফিলিপাইন ও যুক্তরাষ্ট্র গমন করলেও তিন বছর পার হয়ে গেছে। এ দিকে এ ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে মতিঝিল থানায় করা মামলার তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। দায়িত্ব পাওয়ার পর সিআইডি বারবার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আদালতের কাছ থেকে সময় চেয়ে নিয়েছে। উল্লেখ্য, গত ৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকার পার্ক জিনের জড়িত থাকার তথ্য প্রকাশ করে এফবিআই। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত আনুষ্ঠানিকভাবে পার্ক জিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনেরও নির্দেশ দেন। এই ঘটনায় বাংলাদেশের চুরি যাওয়া টাকা ফেরত পাওয়ার ব্যাপারে বেশি আশাবাদী হয়ে উঠেছে। বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলা এই রিজার্ভ চুরির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্ণর ড. ফরাস উদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত তদন্তকারী দলের দেয়া চুড়ান্ত প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬ জনের নাম এসেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখিত অভিযুক্তরা হলেন, অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের যুগ্ম পরিচালক জুবায়ের বিন হুদা, উপ-পরিচালক মিজানুর রহমান ভূঁইয়া, জিএম আব্দুল্লাহ ছালেহীন, শেখ রিয়াজউদ্দিন, রফিক আহমেদ মজুমদার, ও গভর্নর সচিবালয় বিভাগে কর্মরত মইনুল ইসলাম। বাংলাদেশ ব্যাংকের করা মামলায় সিআইডি বারবার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আদালতের কাছ থেকে সময় চেয়ে নিচ্ছেন।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here