বাংলাদেশি পাসপোর্ট জোগাড় করে ক্যাম্প ছেড়ে পালাচ্ছে রোহিঙ্গারা

0
189

নিউজ ডেস্ক : বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা বিভিন্ন উপায়ে ক্যাম্প ছেড়ে পালাচ্ছে। তাদের কেউ সাগর পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করছে। আবার কেউ বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রামে ঢুকে বাংলাদেশিদের সঙ্গে মিশে গিয়ে কৌশলে পাসপোর্ট তৈরি করে বিদেশে পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার বার্তা সংস্থা ইউএনবির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।
রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করছে এমন কয়েকটি এনজিও-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা মানবিক সহায়তা পেলেও অনেকে মনে করছেন, সহসা তাদের স্বদেশে প্রত্যাবাসন হবে না। তাই ক্যাম্পে বসবাসের একঘেয়েমি জীবন থেকে বের হয়ে তারা স্বাধীনভাবে চলতে চায়। এ জন্য অনেকে ক্যাম্প থেকে পালিয়ে যাচ্ছে।
আশ্রিত রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা ইন্টার সেক্টর কোঅর্ডিনেশন গ্রুপের (আইএসসিজি) মুখপাত্র সৈকত বিশ্বাস জানান, রোহিঙ্গাদের অনেকে উন্নত জীবনের জন্য দেশের বাইরে যেতে চায়। আবার আত্মীয়স্বজন বিদেশে থাকায় সেখানে যেতে তৎপর অনেকে।
এ অবস্থা চলতে থাকলে আরেক ধরনের সংকট সৃষ্টি হবে বলে আশঙ্কা করছেন এই কর্মকর্তা।
এনজিও সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র জানিয়েছে, প্রতিদিন ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গারা পালাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের নির্দিষ্ট সীমানায় ঘেরা দিয়ে রাখতে না পারায় তারা বন-জঙ্গলসহ বিভিন্ন চোরাপথ দিয়ে সহজে বের হয়ে যাচ্ছে। সাগরপথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কিছু রোহিঙ্গা পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করলেও অধিকাংশ রোহিঙ্গা এখন কৌশল পাল্টাচ্ছে। তারা বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে ঢুকে পড়ছে। এরপর বাংলাদেশিদের সঙ্গে মিশে গিয়ে তাদের সঙ্গে বসবাস করছে। পরে তৈরি করছে পাসপোর্ট। আর উড়াল দিচ্ছে বিদেশে। এ সুযোগে রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প থেকে বের করে বিদেশে পাচার করতে গড়ে উঠেছে ক্যাম্পভিত্তিক দালাল চক্রও।
সূত্র জানায়, সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টাকালে বিজিবি, কোস্টগার্ড ও পুলিশের পৃথক ২১টি অভিযানে গত দেড় মাসে প্রায় ৬০০ রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়েছে। সর্বশেষ গত ৬ জুন কক্সবাজার শহরের লিংক রোড থেকে ১৮ রোহিঙ্গাকে আটক করে পুলিশ। এর আগে গত ৩০ মে সেন্টমার্টিনের দক্ষিণে গভীর সমুদ্রে মালয়েশিয়া পাড়ি দেওয়ার সময় দুই দালালসহ ৫৮ জনকে আটক করে কোস্টগার্ড। এর মধ্যে ২০ জন পুরুষ, ২৬ নারী ও ১০ শিশু রয়েছে। তারও আগে ২০টি অভিযানে ৫১৭ রোহিঙ্গাকে আটক করে ক্যাম্পে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে ৩২ দালালকে আটক করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
শুধু সাগরপথেই রোহিঙ্গারা পালানোর চেষ্টা করছে না, তারা বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে বৈধভাবে বিদেশ পাড়ি দেওয়ারও চেষ্টা করছে। গত ১০ মে রাজধানীর খিলক্ষেত থেকে বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে পালানোর সময় ২৩ রোহিঙ্গা ধরা পড়ে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাসপোর্ট করতে গিয়ে আরো অর্ধশত রোহিঙ্গা ধরা পড়েছে।
কক্সবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস সূত্রে জানা গেছে, পাসপোর্ট পাওয়ার জন্য রোহিঙ্গাদের করা ৩০০ আবেদন জব্দ করা হয়েছে।
জানা গেছে, রোহিঙ্গা মেয়েরা প্রথমে কিছুদিন স্থানীয়দের সঙ্গে বসবাস করে। পরে তারা স্থানীয় ভাষা রপ্ত করে স্থানীয়দের মতো পোশাক পরে। এ ছাড়া আচার-আচরণসহ সবকিছু স্থানীয়দের মতো শিখে ফেলে তারা। এরপর বিভিন্ন কাগজপত্র সংগ্রহ করার পর পাসপোর্ট অফিসে এসে হাজির হয়। হজে যাবে বা চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাবে বলে পাসপোর্ট নেওয়ার চেষ্টা করে। এভাবে নানা কৌশলে পাসপোর্ট নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে রোহিঙ্গারা।
সূত্র জানিয়েছে, বেশিরভাগ রোহিঙ্গা নারী বিদেশ পাড়ি দিতে মরিয়া হয়ে উঠছে। বিশেষ করে মালয়েশিয়া তাদের পছন্দের প্রথম গন্তব্য।
উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নারীদের নিয়ে কাজ করে নারী জাগরণ সংস্থা। এই সংস্থা সূত্রে জানা যায়, রোহিঙ্গা নারীদের অনেকেই মালয়েশিয়া গিয়ে বিয়ে করার স্বপ্নে বিভোর। তারা মনে করে যে মালয়েশিয়া যেতে পারলে তাদের ভালো বিয়ে হবে। এ ধারণা তাদের ঢুকিয়ে দিয়েছে মানবপাচারকারী চক্র। ফলে তাদের অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যেতে আগ্রহী।
অপর একটি সূত্র জানায়, রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে কেন্দ্র করে এখন মানবপাচারকারীদের তৎপরতাও বেড়েছে। তা ছাড়া কিছু রোহিঙ্গা আছে, যাদের স্বজন মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছে। তারা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাসরত স্বজনদের মালয়েশিয়া নেওয়ার জন্য যোগাযোগ করে। এ ক্ষেত্রেও মানবপাচারকারীরা সহায়তা করছে।
এদিকে, একসঙ্গে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। নানা কৌশলে ক্যাম্প থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছে রোহিঙ্গারা। এমন অনেকে বেরও হয়ে যাচ্ছে। রোহিঙ্গারা যাতে ক্যাম্প থেকে বের হতে না পারে, এ জন্য সাধ্যমতো প্রচেষ্টা রয়েছে। পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সবাই সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন। ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গাদের বের হওয়ার বিষয়টি কঠোরভাবে তদারক করা হচ্ছে।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার জানান, রোহিঙ্গারা নিরাপত্তা বাহিনীর চেকপোস্ট এড়িয়ে পাহাড়-জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এলাকা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। তারা এখন স্থানীয় ভাষা শিখে গেছে। স্থানীয়দের মতো পোশাক পরিধান করছে। এ ছাড়া অনেকে স্থানীয়দের সঙ্গে ভিড়ে কৌশলে পালানোর চেষ্টা করছে।

Share on Facebook