কোনপথে যাবে পথহারা বিএনপি

0
56

নিজস্ব প্রতিবেদক : জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে মূলত বিএনপিকে নির্বাচনে আনার উদ্দেশে যতটা তড়িঘড়ি করে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হয়েছিল, নির্বাচনের পর তারচেয়েও দ্রুতগতিতে নিষ্প্রভ, নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় ঐক্যফ্রন্ট। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বলে কোন সংগঠন আদৌ আছে বলে সাধারণের কাছে প্রতীয়মান হচ্ছে না। খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নতুন নির্বাচনের দাবিতে কর্মসূচি দেয়ার কথা ড. কামাল, মির্জা ফখরুলেরা ঘরোয়া আলোচনায় বললেও বাস্তবে অবস্থাটা আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তির অপেক্ষায়। ঐক্যফ্রন্টের মূল শক্তি বিএনপির নেতাকর্মীরা ড. কামাল ও তাঁর ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। বিএনপির ব্যাপারেও তারা হতাশা কাটিয়ে উঠতে পারছেন না।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন দেশের বাইরে অবস্থানরত বিএনপির মূল নেতৃত্বের রাজনৈতিক পরিপক্কতা ও ঢাকায় শীর্ষস্থানীয় নেতাদের প্রতি আস্থার অভাবের পাশাপাশি খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি, আত্মীয়স্বজন ও দলের কারো কারো বিভ্রান্তিকর তথ্য গ্রহণ, নেতৃত্বের পারস্পরিক অবিশ্বাস, ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতাদের ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত স্বার্থ বিএনপি ও ফ্রন্টের ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণ।
বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনের আগে ও পরে বিপরীতমুখী ভূমিকা, বক্তব্য ও সিদ্ধান্ত নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত, হতাশ ও তাদের প্রতি আস্থাহীন করে তোলে। সর্বশেষ গণফোরাম ও বিএনপির নির্বাচিত সদস্যদের শপথ গ্রহণ, মির্জা ফখরুলের পদত্যাগ এবং বগুড়ায় তাঁর আসনে বিএনপির প্রার্থিতাসহ আরো কিছু ঘটনা বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকেও বিস্মিত করেছে। নেতৃত্বের অদূরদর্শিতা ও ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত স্বার্থ উদ্ধারের চাতুর্যময় কার্যক্রমই প্রতিভাত হয়েছে। অসহায শিকার হয়ে বিএনপির নেতা-কর্মীরা এখন সামনে চলার পথ খুঁজে পাচ্ছেন না।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল আরো মনে করেন সরকারের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতেই যে বিরোধী শিবিরের রাজনীতি পরিচালিত, নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে রাজনীতি সচেতন মানুষের কাছে তাও আর অস্পষ্ট নয়। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ও ২০ দলীয় জোটের শরিকদের মধ্যেও সকল দাবি অপূর্ণ রেখে নির্বাচনে অংশগ্রহণ, নির্বাচিতদের শপথ গ্রহণ, বেগম খালেদা জিয়ার প্যারোলো মুক্তি, তারেক রহমানের বিষয় ঝুলিয়ে রাখা, ড. কামাল হোসেনের রহস্যময় ভূমিকাসহ আরো বেশকিছু বিষয়ে উত্তরহীন প্রশ্ন জমে আছে। ক্ষুব্ধ বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী এরি মধ্যে ঐক্যফ্রন্ট ত্যাগ করার কথা বলেছেন। মাহমুদুর রহমান মান্নাও ফ্রন্ট ছাড়ার অপেক্ষায় আছেন। মাথার ওপর মামলার খড়গ থাকায় আগে পিছে ভেবে তাকে চলতে হচ্ছে। এদিকে আন্দালিব রহমান পার্থের বিজেপি ২০ দলীয় জোট ছেড়েছে। আরো দুটি শরিক জোট ছাড়ার হুমকি দিয়েছে। বিএনপির নেতৃত্ব নিয়ে জোটের অন্যতম শরিক ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদও প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
পরিস্থিতি সামাল দিতে শীর্ষ নেতৃত্বের অবর্তমানে বিএনপির নেতৃত্বেও পরিবর্তন আনার কথা ভাবা হচ্ছে। সাংগঠনিক-রাজনৈতিক বাস্তবতাই তা করা হবে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট রাখা হলেও বিএনপি ২০ দলীয় জোটকেই অধিকতর গুরুত্ব দেবে। জোটের শরিকরাও তাই চান। ২০ দলীয় জোট পরিচালনার জন্য যৌথ নেতৃত্ব গড়ে তোলা হবে। বিএনপি থেকে ড. খোন্দকার মোশাররফ হোসেন, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অপর শরিকদের মধ্যে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির কর্নেল অলিসহ আরো একজনকে নিয়ে জোটের কেন্দ্রীয় পরিচালনা কমিটি গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। এতে ব্যারিস্টার আন্দালিবকেও সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাঁকে জোটে ফিরিয়ে আনতে নবতর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
লিবারেল ডেকোক্রেটিক পার্টি প্রধান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল ইবরাহিম ২০ দলীয় জোটে ভাঙন বা একে দুর্বল করার পক্ষে নন। তাদের অসন্তোষ, ক্ষোভ প্রধানত ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্ব মেনে নিয়ে সরকারের সঙ্গে নির্বাচন-পূর্ব আলোচনা, নির্বাচনে অংশগ্রহণসহ আরো কিছু বিষয়ে। তাদের মতে, রাজনৈতিক অঙ্গনে মৃতপ্রায় ড. কামাল হোসেনকে নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তাকে রাজনৈতিক পুনরুজ্জীবন দেয়া হলেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিএনপি ও ২০ দলীয় জোট। এই জোট বিএনপির নেতৃত্বে দীর্ঘদিন আন্দোলন, সংগ্রামে থাকলেও নির্বাচনে তাদের উপেক্ষা করা হয়েছে। ২০ দলীয় জোট থাকার পরও ঐক্যজোট গঠনের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও তাদের প্রশ্ন রয়েছে। গণফোরামের দুই সদস্যের ড. কামালের নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জ করে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ, ড. কামাল কর্তৃক তাদের লোক দেখানো শোকজ এবং পরবর্তীতে দলটির কাউন্সিলে দলের প্রাথমিক সদস্যপদ খারিজ করা মোকাব্বির খানের উপস্থিতি এবং তাকে স্বসম্মানে প্রেসিডিয়মে অন্তর্ভুক্ত করার ঘটনা ড. কামালের নেতৃত্ব ও উদ্দেশ জাতির কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এখন তাঁকেই নেতৃত্বে রেখে পথচলা বিএনপিকে আরো প্রশ্নের মুখে ফেলবে বলে ২০ দলের শরিকরা ও বিএনপির অনেক নেতাই মনে করেন। ড. কামালকে নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বিলুপ্ত করে ২০ দলীয় জোটকে শক্তিশালী করার উপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা। ২০ দলীয় জোটের এই শরিকদের সাথে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অধিকাংশ সদস্যই একমত। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান অসন্তুষ্ট হতে পারেন Ñ এই ভয়েই তারা মুখ খুলছেন না। তবে তাদের নীরব জোরালো সমর্থন রয়েছে জাতীয় ঐক্যজোট বিরোধী মতের পক্ষে। রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে ঐক্যজোট এখনই বিলুপ্ত না করে আরো কিছুদিন রাখা হবে। ফ্রন্টে যৌথ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হবে।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here