নদী জীবন্ত সত্তা : হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

0
55

নিজস্ব প্রতিবেদক : তুরাগ নদকে ব্যক্তি-আইনি সত্তা বা জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। রায়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মধ্যে এবং বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সব নদ-নদী একই মর্যাদা পাবে।
গতকাল সোমবার বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের দেওয়া ২৮৩ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে।
তুরাগ নদ রক্ষায় মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের করা এক রিটের চূড়ান্ত শুনানি শেষে গত ৩ ফেব্রুয়ারি রায় দেন হাইকোর্ট।
রায়টি লিখেছেন বিচারপতি আশরাফুল কামাল। তাঁর সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি। রায়ে ১৭ দফা নির্দেশনা রয়েছে। রায়ে আদালত বলেছেন, নদীর বাঁচা-মরার ওপর বাংলাদেশের অস্তিত্ব জড়িত। বাঁচলে নদী বাঁচবে দেশ, বাঁচবে প্রিয় বাংলাদেশ।
রায়ের নির্দেশনায় বলা হয়, নদী রক্ষা কমিশনকে তুরাগ নদসহ দেশের সব নদ-নদীর দূষণ ও দখলমুক্ত করে সুরক্ষা, সংরক্ষণ ও উন্নয়নের নিমিত্তে আইনগত অভিভাবক ঘোষণা করা হলো। নদ-নদীসংশ্লিষ্ট সব সংস্থা অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় আজ থেকে বাংলাদেশের সব নদ-নদীর দূষণ ও দখলমুক্ত করে স্বাভাবিক নৌ চলাচলের উপযোগী করে সুরক্ষা, সংরক্ষণ, উন্নয়ন, শ্রীবৃদ্ধিসহ যাবতীয় উন্নয়নে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন বাধ্য থাকবে।
নদ-নদী সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে নদী কমিশনকে সঠিক এবং যথাযথ সাহায্য-সহযোগিতা দিতে বাধ্য থাকবে। রায়ে বলা হয়, ‘আগাম প্রতিরোধের নীতি এবং দূষণকারী কর্তৃক ক্ষতিপূরণ প্রদানের নীতি আমাদের দেশের আইনের অংশ হিসেবে ঘোষণা করা হলো।’
এর আগে গত ৩ ফেব্রুয়ারি নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে উল্লেখ করেন হাইকোর্ট। আদালত বলেন, ‘মানুষের জীবন-জীবিকা নদীর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মানবজাতি টিকে থাকার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে নদী। নাব্যসংকট ও বেদখলের হাত থেকে নদী রক্ষা করা না গেলে বাংলাদেশ তথা মানবজাতি সংকটে পড়তে বাধ্য। নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সরকার আইন প্রণয়ন করে নদীকে বেদখলের হাত থেকে রক্ষার চেষ্টা করছে। নদী রক্ষায় আন্তর্জাতিকভাবে জাগরণ শুরু হয়েছে। এখন সবারই ভাবনা, পরিবেশের জন্য নদী রক্ষা করতে হবে।’
রায়ে হাইকোর্ট তুরাগ নদকে লিগ্যাল পারসন (আইনগত ব্যক্তি) ঘোষণা করে বলেন, অবৈধ দখলদাররা প্রতিনিয়তই কমবেশি নদী দখল করছে। অবৈধ স্থাপনা তৈরি করায় সংকুচিত হয়ে পড়ছে নদী। এসব বিষয় বিবেচনা করে তুরাগ নদকে লিগ্যাল/জুরিসটিক পারসন হিসেবে ঘোষণা করা হলো। মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইট অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) করা রিট মামলায় এই রায় দেওয়া হয়। আদালতে রিট আবেদনকারীর পক্ষে আইনজীবী ছিলেন অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ। গাজীপুরের তুরাগ নদের টঙ্গী কামারপাড়া সেতুর দুই পাশে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দখল করাকে কেন্দ্র করে এইচআরপিবির করা এক রিট আবেদনে এ রায় দেওয়া হয়।
আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ সাংবাদিকদের বলেন, এর মধ্য দিয়ে মানুষের মতোই নদীর মৌলিক অধিকার স্বীকৃতি পেল। নদী যাতে জীবন্ত থাকতে পারে, দখল বা দূষণ না হয় সে জন্য একটা মেসেজ দিতে যাচ্ছেন আদালত। ভবিষ্যতে আর কেউ যেন নদী দখলের সাহস না করে। নদী রক্ষায় বিভিন্ন দেশের আদালতের দেওয়া রায়ের উদাহরণ দিয়ে হাইকোর্ট বলেন, ‘আমাদের দেশের সব নদীকে রক্ষা করার সময় এসেছে। যদি তা না করতে পারি তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ রায়ে বলা হয়, ঢাকার চারপাশে বহমান চার নদী রক্ষায় এর আগে আদালত থেকে কোনো নির্দেশনা দেওয়া না হলে এত দিনে বুড়িগঙ্গা নদীর ওপর হয়তো বহুতল ভবন দেখা যেত। অথবা তুরাগ নদে অবৈধ দখলদারদের হাউজিং এস্টেট থাকত। আদালত আক্ষেপ করে বলেন, এত রায় ও নির্দেশনার পরও তা সঠিকভাবে বাস্তবায়নে বিবাদীরা কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। আদালতের নির্দেশনা সঠিকভাবে প্রতিপালন হলে তুরাগ নদ রক্ষায় হাইকোর্টে আরেকটি মামলা করতে হতো না। আদালত আরো বলেন, ‘শুধু যে তুরাগ নদই আক্রান্ত তা নয়; গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনাসহ দেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত ৪৫০টি নদ-নদীও অবৈধ দখলদারদের দ্বারা আক্রান্ত। এখন এসব নদী রক্ষায় আমরা (আদালত) কি হাজারখানেক মামলা করার ব্যাপারে উৎসাহ/অনুমতি দেব? নাকি অবৈধ দখলের হাত থেকে সব নদী রক্ষায় এই মামলা ধরে নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেব? যে নির্দেশনার আলোকে নদী দখলমুক্ত করার মামলা আর আদালতের সামনে আসবে না?’

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here