সুধা সাগর সন্ধানে || সু ম না চ ক্র ব র্তী

0
181

পাহাড়ি এলাকার জীবনযাপন খুব সুন্দর। সেখানে অন্ধকার থাকতে সকাল হয় আর সূর্য ডুবলে ঝুপ করে দিনটা ফুরিয়ে যায়। আলো থাকতে সব কাজ সেরে নেয় পাহাড়ের বাসিন্দারা। তা বলে ওরা কুঁড়ে নয়। শীতের আমেজ গায়ে নিয়ে ওরা সব কাজ করে। এমনকি শিশুরাও দুর্গম পথ পেরিয়ে স্কুল যায়। কারণ এই পথে বাস খুব কম চলে। আর চললেও সে কখন আসবে জানা নেই কারও। পাহাড়ি মানুষগুলো আরও  ভালো। এরা সবাইকে আপন করে নিতে জানে। নিজেরা যেমন হাসিমুখে সব সয় তেমন অন্যের মুখে হাসি ফোটাতে পারে। এদের কাজ কর্ম, খাওয়াদাওয়া, সব কিছুর সাথে মিশে গেছে রিক্তার জীবন।
সে আজ অনেকদিন হল পাহাড়ের বাসিন্দা। এখানে কাছেই একটা মিশনে সে ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের পড়ায়। ওরা কত সুন্দর করে প্রার্থনা করে । রিক্তা তখন মিশনের বাইরে চলে আসে । ঐ প্রার্থনা শুনতে তার আর ভালো লাগে না। তার পঞ্চেন্দ্রিয় বোধহয় কোটি কোটি প্রার্থনার সাক্ষী । তবু সে বিমুখ । মিশনের বাইরে ঘোরানো রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে সে ভুলে যায় তার অস্তিত্বের কথা। মাথা চিন্তা শূন্য করে থাকতে বেশ লাগে। এও এক নেশা । প্রকৃতিকে ভালবাসার নেশা, নিজের করে পাওয়ার নেশা। মন প্রাণ ভরে রিক্তা প্রকৃতির রূপ রস পান করে।
পাহাড়ি পথে তার পা টেনে চলতে অসুবিধা। ডান পায়ের হাঁটু কবে কারা যেন ভেঙ্গে দিয়েছে সে মনে করতে পারে না। মনের ওপর জোর না দেওয়াই উচিত। তবু মাঝে মাঝে কিছু কথা উঁকি দেয়।
আজ যেমন সে বসে আছে বিশিষ্ট চিকিৎসক ডাঃ চন্দ্রর সামনে। ডাক্তার রোজ কিছু প্রশ্ন করে আর সে উত্তর দেয়। তবে সে চোখ বন্ধ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে উত্তর গুলো দেয়। ডাক্তার প্রশ্ন করল, আগে কখনও সাঁতার কেটেছ?
রিক্তা চোখ বুজেই উত্তর দিল,” না, জলে ভয় লাগে। আ আমি সাঁতার কা ট বো না।
ডাক্তার আবার বলে,” ভালো করে মনে করো আগে জলে নেমেছ কখনও?
রিক্তা আবার একই উত্তর দেয়,” জলে ভয় লাগে।
এভাবে বেশ কিছুক্ষন প্রশ্ন উত্তরের পর সে ঘুমিয়ে পড়ে। যখন ঘুম ভাঙ্গে তখন সে ঘরে । তার মাথার কাছে বসে থাকে সিরিন ।সিরিন বাড়িতে রিক্তার দেখাশোনা করে। রান্না করা, খেতে দেওয়া, বাসন মাজা, ঘর পরিষ্কার সবই সে করে। আগে রিক্তা নিজে সব কাজ একাই করত। কদিন সরিরতা খারাপ থাকায় তার কোনও কাজেই মন নেই। রিক্তা ভাবতে বসল। কলকাতার অবস্থাপন্ন পরিবারের মেয়ে রিক্তা গবেষণার কাজ নিয়ে আসে কালিম্পং। এখানকার অর্কিড হাউসে তার কাজের ভার পড়ে।
তিন মাস ধরে কাজ করে যখন তার ঘরে ফেরার পালা তখন পাহাড়ে খুব গÐগোল। জল নেই, খাবার নেই, ওষুধ নেই। এমনকি বাচ্চাদের দুধও পাওয়া যাচ্ছে না। এই সময় রিক্তারা কয়েকজন বন্ধু মিলে অর্কিড হাউসের পাশে একটা বাড়িতে অতিথি হিসেবে থাকত।
গÐগোল একটু কমলে বাকিরা যে যার মতো করে সমতলে নেমে আসে।
রিক্তা পারেনি। যে মানুষগুলো সংকটময় মুহূর্তেও তাদের মুখে খাদ্য জুগিয়েছে তাদের ফেলে সে ফিরে যেতে পারেনি। তবে বাড়িতে সে খবর পাঠিয়েছিল যে অবস্থার উন্নতি হলে সে ফিরে যাবে। ধীরে ধীরে সে এখানকার মানুষদের সাথে একাত্ম হচ্ছিল। এরই মাঝে তার দেখা হল সুরজের সাথে। সুরজ কনভেন্টে পড়া ছেলে। এম টেক পাশ করে দুর্গাপুরে চাকরি করছিল। গÐগোলের খবর পেয়ে সে বাড়ি ফিরে আসে। নিজের লোককে অসহায় অবস্থায় থাকতে দেখে তার কষ্ট হয়। পাহাড়ি মানুষগুলো খুব সরল আর সৎ। মরে গেলেও অন্যের কাছ থেকে হাত পেতে কিছু চাইবে না। রিক্তা সেদিন দেখেছিল কি অসম্ভব মনের জোর ওদের। আর সুরজ একটা নামি কোম্পানির কর্মচারী হয়েও পাহাড়ের মানুষের পাশে দাঁড়াবে বলে চাকরিটা ছেড়ে দিল। রিক্তা দেখেছিল প্রকৃত শিক্ষা। আশেপাশের কিছু মানুষকে সম্বল করে পাহাড়ে জীবনের জোয়ার ফেরাতে চাইছিল সুরজ। রিক্তাও কিভাবে যেন ওদের মধ্যে মিশে গেল কে জানে। তখন সারাদিনে একবার তারা দল বেঁধে বাজার দোকান করত। বয়স্ক মানুষদের পরিচর্যা ঠিকভাবে হচ্ছে কি না সুরজ নিজে বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ করত। সুরজের সাথে থাকতে থাকতে, কাজ করতে করতে রিক্তা কোথাও যেন সুরজকে ভরসা করতে শুরু করেছিল। আশ্চর্য এই যে সুরজ মিশনেই বড় হয়েছে। তার বাবা মা নেই। সে অনাথ। মিশন থেকে তাকে খরচ দেওয়া হতো। রিক্তা এটা জানার পরে আরও বেশি সুরজের প্রতি আকৃষ্ট হয়। ঘর বাড়ি, বাবা মা, বন্ধু ক্রমাগত তার থেকে দূরে সরতে থাকে। আস্তে আস্তে তার মন থেকে সব মুছে যেতে থাকে। রিক্তা ঘরের জানলা দিয়ে দূরে অন্য পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। পাহাড়ের ওপর গুম্ফার চূড়া দেখা যায়। সে চোখ বন্ধ করে ফেলে।
সিরিন বেশ ভালো । রিক্তার জন্য পাতলা করে সব্জি আর রুটি নিয়ে আসে। রিক্তা টেবিলে বসে খায়। সিরিন জানতে চায়,” তোমার কি কিছুই মনে পড়ে না দিদি ? বাড়ির ঠিকানা, ফোন নম্বর কিছু?”
রিক্তা আপনমনে খেয়ে যায়। সেই যে একবার তারা কয়েকজন মিলে পাহাড়ের স্কুলগুলো বাঁচাতে পথে নামল তখন রিক্তা অচেনা কিছু মানুষের হাতে মার খেয়েছিল। ওরা সুরজকেও ধরে মেরেছিল। হুঁশ ফিরলে রিক্তা দেখেছিল সে মিশনের হাসপাতালে। শরীর এতটাই অবসন্ন ছিল যে কোনও কিছু মনে পড়েনি তখন। ভেবেছিল পড়ে সব মনে পড়ে যাবে। হায়! আজও সেসব মনে পড়ল না। সে মাথা নেড়ে না বলল।
সিরিন কাতর মুখে তাকায়। আজ তাদেরই জন্য রিক্তার এই হাল। তাদের ভালো হবার আশায় মেয়েটা ঘর ছাড়ল। বাবা মা কোথায় আছে এখনও জানে না। এরপর তো  বাড়ি ফেরা। কবে সব ঠিক হবে কে জানে?
সিরিনের কাছে থালা বাটি দিয়ে রিক্তা আবার স্মৃতিচারণ করতে লাগল। গÐগোলের সময় সে তার বাবাকে অনেক বুঝিয়ে সে রাজি করিয়েছিল তার মাঝে এই গÐগোল শুরু হয়ে গেল। আসলে রিক্তা পাহাড়কে ভালবেসেছিল। তাই এর আগে পরে কোনও কথা সে আমল দেয়নি। তাই জীবনের বেশ কিছুটা ফাঁক থেকে গেল।
সে মন দিয়ে ভালবেসেছিল সুরজকে, এখনও বাসে। একেক সময় রিক্তার মাথায় চেনা ছবি আসলে ভয়ে সে  ছবি গুলো নিয়ে ভাবে না। এক উদার মনস্ক, নিঃসম্বল, মেধাবী পুরুষ নিজের মর্জিতে যে কাজ শুরু করেছিল তাকে সম্পূর্ণ করার শপথ নিয়েছে রিক্তা। বিগত দিনের কথা মনে পড়ুক আর না পড়ুক সে এই কাজ ছেড়ে কোথাও যাবে না। পাহাড় ছেড়ে যাবে না। কারন পাহাড়ি মানুষগুলো তাকে ভালবাসে। রিক্তা জানে, এই জীবন সে উৎসর্গ করেছে ভালবাসার জন্য। সে অপেক্ষায় থাকবে  সুরজের। এ জনমে না হোক পরজনমে। বিবেকের কাছে হার মানুক কাম, ক্রোধ , লোভ। রিক্তা সিরিনের কথার উত্তর দিল না আর। তার চলার পথে কোনও বাধা আসুক সে চায়না। শরীর থাকলে উপদ্রব করবে তার জন্য ব্যাস্ত হয়ে কি লাভ? রিক্তা আবার জাণলায় চোখ মেলল। দূরে তখন  আরতি হচ্ছে গুম্ফায়।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here