মাছ চাষ করে কোটিপতি

0
35

রংপুর প্রতিনিধি : মাছকে কি খাবার খাওয়াতে হয়? মাছের কোন খাবার আছে নাকি? অথবা ডিজিটাল প্রযুক্তি ভিত্তিক মাছ চাষের কোন কৌশল আছে নাকি? এটাই জানতো না দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার মানুষজন।
২০০০ সালে পরিবারের অভাব অনটনের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে বেকার জামিনুর মেসার্স লুবনা ট্রেডার্স নামে মাছের খাবারের প্রতিষ্টান খুলে বসেন। যাদের পুকুর আছে তাদের বাড়ীতে বাড়ীতে গিয়ে মাছ ও মাছের খাবারের সুফল সম্পর্কে জ্ঞান দিতে থাকেন। অনেকেই হেসে উড়িয়ে দিয়েছে তার কথা।
অদম্য জামিনুর মানুষকে জানাতে কোন লজ্জ্বা নেই তার। মাছকে স্বাস্থ্যবান করতে মাছের স্বতন্ত্র খাদ্যের প্রয়োজন আছে এটি স্বীকার করা শুরু হয় ধীরে ধীরে। এরপর ২০০০ সালে নিজেই বানিজ্যিক ভাবে মাছ চাষের প্রজেক্টে হাত দেন জামিনুর। দাদার কাছ থেকে নেয়া ১০ বিঘা পুকুরে বিভিন্ন প্রজাতির দেশী মাছের পোনা অবমুক্ত করেন। মাছ উৎপাদন করেই বদলে যেতে পারে ভাগ্যের চাকা এই বিশ্বাসের দোলাচলে নিজেকে সপে দেন জামিনুর। সেই শুরু থেকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি জামিনুরকে। মাছের পোনা, খাবার, শ্রমিক মজুরী ইত্যাদি বাদ দিয়ে প্রথম বছরেই আয় হয় প্রায় দুই লক্ষ টাকা। সাহসী হয়ে উঠেন জামিনুর। যেখানেই হোক তার বড় পুকুর চাই। নবাবগঞ্জ উপজেলাসহ পার্শ্ববর্তী উত্তর জনপদের বিভিন্ন জেলায়, উপজেলার পরিত্যক্ত বড় পুকুর ও সরকারী জলমহল ১০-১৫ বছর মেয়াদে ইজারা নিয়ে ডিজিটাল প্রযুক্তিতে মাছ চাষের কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেন জামিনুর।
বর্তমানে তিনি ইজারা ও নিজেরসহ প্রায় ৭৫ একর জমিতে ছোট বড় শতাধিক পুকুরে মাছ চাষ করছেন। আয়ের টাকায় নিজস্ব ১০ একর জমি কিনে পুকুর খনন করেছেন। বাড়ী,গাড়ী করেছেন। কয়েকশত পরিবারকে করেছেন স্বাবলম্বী।
কর্মসংস্থান দিয়েছেন প্রায় দুইশত বেকার যুবকের। এখন তার ইচ্ছে একটাই দিনাজপুর জেলাকে লিচু কিংবা ধান উৎপাদনের জন্য সারাদেশে চেনে। এর সাথে মাছকে যুক্ত করতে চান তিনি। এ জন্য নিজেই বিভিন্ন উপজেলা গিয়ে বানিজ্যিক ভাবে মাছ চাষে বেকার উৎসাহী যুবকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। জামিনুর বলেন, পুরোদেশে দিনাজপুরের লিচু ও ধানের কদর আছে। সেদিন আর বেশী দুরে নেই যেদিন এর সাথে যুক্ত হবে দিনাজপুরের ফরমালিন মুক্ত টেষ্টি দেশীয় মাছের নাম। স¤প্রতি কুশদহ ইউনিয়নের পল্লী মোরলাই বিলে গিয়ে দেখা গেছে ৫০ একর এলাকা জুড়ে খন্ড খন্ড বিশাল বিশাল বিল। পাশে রয়েছে পোনা মাছ বিক্রি ও সংরক্ষণ করার অত্যাধুনিক হ্যাচারি। মাছের খাবারের জন্য শত শত বস্তা মাছের খাদ্য গোডাউনে মজুদ করে রাখা হয়েছে। হ্যাচারীর সামনে মাছ ও পোনা কিনতে আসা অগনিত মানুষ। জাল নামানো হয়েছে পুকুরে। দিনাজপুর,নবাবগঞ্জ শহর, রংপুর থেকে পাইকারী মাছ ক্রেতা (বেপারি) এসেছেন। ৫০ জন মৎস্য শ্রমিক ভোর রাত থেকে জাল টানা শুরু করেছে। চলবে বিকেল বিকেল ৩টা পর্যন্ত। মাছদের লাফালাফি, জাল ছিঁড়ে বেরুতে চাইছেন যেন। রুই, কাতলা, মৃগেল, মনোসেক্স তেলাপিয়া, পাঙ্গাস, সিলভার, কই, বোয়াল, টেংড়া, পবদা মাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছে ভরে আছে পুকুর।
সাথে সাথে ওখানেই পাইকারি দরে বিক্রি করা হচ্ছে মাছগুলো। খাঁচা ভর্তি করে রিকসা ভ্যানে, পিকআপে, অটোতে করে পাইকারী মাছ কিনে নিয়ে বাজার কিংবা আড়ৎ এর দিকে ছুটছে পাইকাররা।
এ বিষয়ে দিনাজপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. শিবলী সাদিক জানান, জামিনুর এলাকার একজন সফল কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী মৎস চাষী। সে তার পুকুরে ১০-২০ কেজি পর্যন্ত ওজনের মাছ চাষ করে থাকে। যা আমাদের দিনাজপুর বাসীর সুনাম বয়ে আনছে।
নবাবগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম জানান, নবাবগঞ্জের সেরা মৎস্য চাষি জামিনুর ইসলাম। আমি নিয়মিত তাঁর কাছে যাই। বিভিন্ন কারেন্ট পরামর্শ দেই। হ্যাচারিতে কর্মরক শ্রমিক মিজানুর রহমান জানান, আমরা তার প্রকল্পে চাকরি করে জীবিকা নির্বাহ করছি। জামিনুর শুধু নিজের উন্নয়নই করেনি বরং এলাকার কয়েকশত বেকার যুবক/ব্যবসায়ী/ ব্যাপারী ও মৎস চাষীর আয়ের পথ ও কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করেছেন।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here