ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে ডেঙ্গু : ২৬ জনের মৃত্যু, আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে ৩ লাখের অধিক

0
30

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশের রাজধানীর মশা নিধনে দুই সিটি করপোরেশনের ব্যবহার করা ওষুধের সমালোচনা করেছে হাইকোর্ট। সাধারণ মানুষও এই ওষুধকে বিশ্বাস করতে পারছে না বলে মনে করেন আদালত। গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারপতি তারিকুল হাকিম ও বিচারপতি সোহরাওয়ার্দীর হাইকোর্ট বেঞ্চ এক শুনানিতে এসব কথা বলেন। গত সোমবার ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়াসহ অন্যান্য মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে আদালত সন্তোষ না হওয়ায় দুই সিটির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে তলব করেন হাইকোর্ট।
এর পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার আদালতে হাজির হন ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. শরীফ আহমেদ ও উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মোমিনুর রহমান মামুন।
এসময় আদালত অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের উদ্দেশে বলেন, ‘এ বছর অ্যালার্মিং সিচ্যুয়েশন কেন হলো? এক্ষেত্রে কী সমস্যা, তা কি চিহ্নিত করেছেন?’ জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘চিন্তা করতে হবে। নিঃসন্দেহে বিষয়টা সবার হেলথ কনসার্ন। এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনই বলুক, সেটাই ভালো হয়।’ এরপর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, ‘আমার এই সিটি করপোরেশনে এক কোটির বেশি লোক। আর ১০টি জোনে ৭৫টি ওয়ার্ডে মশক নিধন কার্যক্রমে জনবল মাত্র ৪২৯।’ তখন আদালত বলে, ‘এ বছর ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব এত কেন?’

জবাবে প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, ‘এটা একটা বৈশ্বিক সমস্যা। ক্লাইমেট সেনসেটিভ ডিজিজ। আর এ বছর আমাদের দেশে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত, সর্বোচ্চ আর্দ্রতা ও সর্বোচ্চ উষ্ণতা ছিল। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এমনটা হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় এর ভয়াবহ প্রভাব চলছে। সব দেশেই তো ডেঙ্গু আছে।’ এ সময় তিনি কয়েকটি দেশের ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ও মৃতের সংখ্যা তুলে ধরেন।
এ প্রসঙ্গে কৌতুকপ্রদ মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। গতকাল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে আয়োজিত ডেঙ্গু এক বৈজ্ঞানিক সেমিনারে মন্ত্রী বলেন, ‘এডিস মশার প্রজনন ক্ষমতা রোহিঙ্গাদের মতো, যে কারণে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। বাংলাদেশে ডেঙ্গু হঠাৎ করেই বেশি হওয়ার কারণ এডিস মশা বেশি বেড়ে গেছে। এই মশাগুলো অনেক হেলদি ও সফিস্টিকেটেড, তারা বাসাবাড়িতে বেশি থাকে।’
মন্ত্রী সেমিনারে আরও বলেন, এডিস মশার প্রডাকশন অনেক বেশি। যেভাবে রোহিঙ্গা পপুলেশন আমাদের দেশে এসে বেড়েছে, সেভাবেই এই মসকিউটো পপুলেশনও বেড়েছে। আমরা তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি।
তবে মশা নিধন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ না, এটি সিটি করপোরেশনের কাজ বলে মন্তব্য করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ কাজে সিটি করপোরেশনকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ারও আহŸান জানান মন্ত্রী।
এদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র (ডিএসসিসি) সাঈদ খোকন সাড়ে ৩ লাখ ডেঙ্গু আক্রান্তের খবরকে সম্পূর্ণভাবে কাল্পনিক তথ্য বলে মন্তব্য করেছেন। গতকাল সকালে রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউতে জাতীয় মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা সপ্তাহ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডিএসসিসি মেয়র বলেন, ছেলে ধরার গুজব আর সাড়ে ৩ লাখ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত একই সূত্রে গাঁথা। সরকার দৃঢ়ভাবে প্রতিজ্ঞ জনগণকে নিয়ে এই ষড়যন্ত্রকারীদের মোকাবিলা করা হবে। ডেঙ্গু রোগীদের পাশে থেকে ডেঙ্গু মোকাবিলার মধ্যে দিয়ে এর কঠিন জবাব দেয়ার জন্য সরকার সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
অপরদিকে, বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করেছেন ডেঙ্গু মহামারি আকার ধারণ করলেও সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না।
গতকাল দুপুরে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে রিজভী বলেন, ‘দেশে মহামারি আকারে দেখা দিয়েছে ডেঙ্গু। ডেঙ্গু রোগীতে সয়লাব হাসপাতাল। তিল ধারণের জায়গা নেই। ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে। প্রতিদিনই রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, যা আগের রেকর্ড ভেঙে দিচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসাবে প্রতি তিন মিনিটে একজন করে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে।’
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এরইমধ্যে ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে উল্লেখ তিনি বলেন, ‘হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন ও কন্ট্রোল রুমের সংকলন অনুযায়ী, জানুয়ারির ১ তারিখ থেকে বুধবার পর্যন্ত ৭ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গু রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। ২২ জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্তের অনুমিত সংখ্যা ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৯৫০ জন।’
রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ডেঙ্গু জ্বর ছড়িয়ে পড়েছে অভিযোগ করে বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘বুধবার হাইকোর্ট বলেছেন, ডেঙ্গু মহামারি হতে বাকি নেই। ডেঙ্গুবাহী এডিস মশার কামড়ের ভয়ে সরকারের মন্ত্রী-সচিবরা অফিসে যাচ্ছেন না। ঢাকা সিটি করপোরেশনের উত্তর ও দক্ষিণের মেয়র নির্লজ্জের মতো বলে আসছেন, ‘কিছুই হয়নি, আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।’

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here