আচমকাই চলে গেলেন সুষমা স্বরাজ

0
44

নিউজ ডেস্ক: ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ভারতীয় জনতা পার্টির প্রবীণ নেতা সুষমা স্বরাজ মারা গেছেন। তাকে দিল্লির এআইআইএমএস হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। মঙ্গলবার সন্ধে ৭টা ২৩ মিনিটে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে টুইট করেছিলেন, ‘‘এই দিনটা দেখার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।’’ তার কিছু ক্ষণ পরে ফোন আসে আইনজীবী হরিশ সালভের। তাঁকে বলেন, বুধবার বাড়িতে এসে যেন এক টাকা নিয়ে যান! কুলভূষণ যাদব মামলা লড়ার জন্য ওই এক টাকাই ফি নেবেন হরিশ!
এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আচমকা হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন সুষমা স্বরাজ। বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। কিডনির সমস্যায় ভুগছিলেন। তাই এবার লোকসভা ভোটে লড়েননি। অনেকে ভেবেছিলেন, তবু হয়তো নরেন্দ্র মোদী তাঁকে মন্ত্রী করবেন। কিন্তু সেই ফোন আসেনি। সুষমা অবশ্য শপথের দিন রাষ্ট্রপতি ভবনে দর্শকাসনে গিয়ে বসেছিলেন। আর দলের জন্য শেষ যে-রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, সেটি বাংলার বিজেপি কর্মীদের উপরে আক্রমণ নিয়ে গণশুনানি।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক টুইট বার্তায় সুষমা স্বরাজের এই মৃত্যুর ঘটনায় শোক ও শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। ওই টুইট বার্তায় তিনি লিখেছেন, “ভারতীয় রাজনীতির একটি দুর্দান্ত অধ্যায়ের শেষ হল। ভারত তার এক অসাধারণ নেতার মৃত্যুতে শোক করছে, যিনি মানুষের সেবা এবং দরিদ্রদের জীবনযাত্রার উন্নতির জন্য তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছেন।” “সুষমা স্বরাজ অনন্য ছিলেন, তিনি কোটি কোটি মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস ছিলেন। সুষমা জি ছিলেন একজন দুর্দান্ত বক্তা এবং দুর্দান্ত সংসদ সদস্য। তিনি সব পক্ষের কাছ থেকে সম্মান পেয়েছেন। তিনি কখনও বিজেপির আদর্শ ও আগ্রহ নিয়ে আপোস করেননি। বিজেপির উন্নয়নে তিনি বড় অবদান রেখেছেন।”
সুষমার মৃত্যুতে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের নেতারাও শোকপ্রকাশ করেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা. নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং, ভারতে নিযুক্ত ইজরায়েলের রাষ্ট্রদূত রন মালকা, চিফ একজিকিউটিভ অব দ্য ইসলামিক রিপাবলিক অব আফগানিস্তান আবদুল্লা আবদুল্লা।
শোক প্রকাশ করেছেন বলিউড অভিনেতা অমিতাভ বচ্চন, অক্ষয় কুমার, রবিনা ট্যান্ডন এবং আশা ভোঁসলে-সহ আরও অনেকেই। অক্ষয় কুমার বলেন, “এক জন প্রাণবন্ত নেতা ছিলেন সুষমা স্বরাজজি। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছি।” শোক প্রকাশ করেছেন বিরাট কোহালি, সচিন তেন্ডুলকরও। সচিন বলেন, “নারীশক্তির এক জন আইকন ছিলেন সুষমা স্বরাজ।”
মধ্য প্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহানও টুইট করে শোক প্রকাশ করেন। এক টুইট বার্তায় সুষমা স্বরাজের স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী। গত বছর সুষমা স্বরাজ ঘোষণা করেছিলেন যে, তিনি ২০১৯ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করবেন না। এই ঘোষণার পরে, সুষমার স্বামী এবং প্রাক্তন রাজ্যপাল স্বরাজ কাউশাল বলেছিলেন, “মিলখা সিংও কিছু সময়ের পরে দৌড় বন্ধ করেছিলেন। আর আপনি তো গত ৪১ বছর ধরে নির্বাচনে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করছেন।” সুষমা ২৫ বছর বয়সে রাজনীতিতে আসেন। তার রাজনৈতিক গুরু ছিলেন লাল কৃষ্ণ আদভানী।
দলের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকের মধ্যেই সুষমার মৃত্যুর খবর পান রাহুল গাঁধীও। তিনিও লেখেন, ‘‘খবরটা শুনে স্তম্ভিত। অসাধারণ নেত্রী। ভাল বক্তা। তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল সকলের কাছে।’’ কংগ্রেস নেতা গোলাম নবী আজাদ, সুষমা স্বরাজকে স্মরণ করে বলেন, “আমি সর্বদা জিজ্ঞাসা করতাম যে একজন বোনের কেমন হওয়া উচিত আর তিনি পাল্টা প্রশ্ন করতেন যে একজন ভাইয়ের কেমন হওয়া উচিত। আমরা একটি বোন হারিয়েছি। তিনি দুর্দান্ত বক্তা ছিলেন, তিনি সর্বদা স্মরণে থাকবেন। ” কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদ বলেন, “তিনি আমার বড় বোনের মতো ছিলেন, তিনি দলে, সরকারে, ঘরে আমাকে ছোট ভাই হিসাবে অনেক কিছু শিখিয়েছেন। সুষমা জি পার্টিকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছেন। ” কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নিতিন গাদকরী বলেছেন যে, “তিনি বিশ্বজুড়ে ভারতের মর্যাদা বাড়ানোর কাজটি করেছিলেন। তার ঘাটতি কখনও পূরণ করা যাবে না।” বিজেপির নির্বাহী সভাপতি জে পি নদ্দা বলেছেন, “শ্রদ্ধেয় সুষমা জি আমাদের মধ্যে নেই, তিনি আমাদের অনুপ্রাণিত করেছিলেন যেন আমরা রাজনীতিতে অবদান রাখতে পারি।”
এদিকে এ ঘটনায় বিজেপি নেতা শাহনাওয়াজ হুসেন বলেছেন, “সুষমা স্বরাজের মৃত্যু দলের জন্য, দেশের জন্য এবং পাশাপাশি আমার জন্যও অনেক বড় ক্ষতি। আমি তার থেকে অনেক কিছু শিখেছি। তিনি এত তাড়াতাড়ি চলে যাবেন, ভাবতেও পারিনি।” সুষমা স্বরাজের মরদেহ গতকাল বুধবার দুপুর বারোটা থেকে দুপুর তিনটা পর্যন্ত শেষবারের মতো দেখার জন্য দলীয় কার্যালয়ে রাখা হয়।।”বিকেলে লোদিঘাটে তাঁর শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়।
সুষমা স্বরাজের গল্প …
সুষমা স্বরাজকে একজন বুদ্ধিমান ও শক্তিশালী বক্তা, কার্যকর সংসদ সদস্য এবং দক্ষ প্রশাসক হিসাবে বিবেচনা করা হয়।
একটা সময় ছিল যখন প্রমোদ মহাজন এবং অটল বিহারী বাজপেয়ীর পরে বিজেপির সবচেয়ে জনপ্রিয় বক্তা হিসেবে সুষমা স্বরাজকেই ধরা হতো। গত চার দশকে তিনি ১১ বার নির্বাচন করেছেন এবং তিনবার বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। সুষমা সাতবার সংসদ সদস্যও হয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেছেন যে, ২০১৩ সালে নরেন্দ্র মোদীকে প্রধানমন্ত্রীর প্রার্থী থেকে বাধা দেওয়ার লক্ষ্যে লাল কৃষ্ণ আদভানীর প্রচারণায় যুক্ত ছিলেন সুষমা স্বরাজ। এই প্রচারে তিনি শেষ অবধি আদভানীকে সমর্থন করেছিলেন। তবে ২০১৪ সালে মোদীর জয়ের পরে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তার।
মোদীর বিশেষজ্ঞ ও সমালোচকরা বিশ্বাস করেছিলেন যে, সুষমা ভবিষ্যতে এই অপরাধের জন্য শাস্তি পাবেন। ইন্দিরা গান্ধীর পরে সুষমা স্বরাজ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদে অধিষ্ঠিত দ্বিতীয় নারী। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে সুষমা স্বরাজ টুইটারে বেশ সক্রিয় ছিলেন। মূলত টুইটকে হাতিয়ার করেই মোদী সরকারের আগের মেয়াদে বিদেশ মন্ত্রককে নয়া উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন সুষমা। বিশেষত বিদেশে অসুবিধায় পড়া ভারতীয় নাগরিকেরা তাঁকে টুইট করলেই সক্রিয় হয়ে উঠতেন তিনি। চিকিৎসার প্রয়োজনে পাকিস্তানি নাগরিকেরা ভিসা সমস্যায় পড়লে তাঁদেরও মুশকিল আসান ছিলেন সুষমা। মার্কিন সংবাদমাধ্যম তাঁকে ‘সুপার মম’ আখ্যা দেয়।
সুষমার রাজনৈতিক জীবন শুরু এবিভিপি-র সদস্য হিসেবে। জরুরি অবস্থার পরে বিজেপিতে যোগ দেন। ১৯৭৭ সালে দেবীলালের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিজেপি হরিয়ানায় ক্ষমতা দখল করলে ২৭ বছর বয়সে শিক্ষামন্ত্রী হন সুষমা। ১৯৯০ সালে রাজ্যসভার সাংসদ হিসেবে জাতীয় রাজনীতিতে আসেন। ১৯৯৮ সালে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির ঘটনায় সরকার পড়ে যাওয়ায় জাতীয় রাজনীতিতে ফিরে যান তিনি। বাজপেয়ী সরকারে প্রথমে তথ্য-স¤প্রচার মন্ত্রক এবং পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রকের দায়িত্ব পান। ২০০৯-১৪ সাল পর্যন্ত লোকসভার বিরোধী দলনেতা হিসেবে বিজেপির প্রধান মুখ ছিলেন তিনি। দলে লালকৃষ্ণ আডবাণীর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ছিলেন।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here