আবারো ভেস্তে গেল রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন

0
30

নিউজ ডেস্ক: ব্যাপক প্রস্তুতি ও উদ্যোগ থাকা সত্তে¡ও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অনাগ্রহের কারণে শেষ পর্যন্ত এ দফায়ও শুরু করা গেলো না প্রত্যাবাসন কর্মসূচী। এর আগে গত বছর নভেম্বর মাসে একই রকমের একটি প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ রোহিঙ্গাদের অনাগ্রহের কারণেই ভেস্তে যায়। এ দফায় গত কয়েক দিন ধরেই গতকালকের তারিখটিকে প্রত্যাবাসন শুরুর জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয়া হয়েছিলো। গতকাল সকাল থেকে টেকনাফের নোয়াপাড়ার ২৬ নং ক্যাম্পের কাছে প্রস্তুত রাখা হয়েছিলো তিনটি বাস ও দুটি ট্রাক উদ্দেশ্য প্রত্যাবাসনে আগ্রহী রোহিঙ্গাদের এসব পরিবহণে করে কুড়ি কিলোমিটার দূরবর্তী বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে পৌঁছে দেয়া। পরে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন বিষয়ক কমিশনার আবুল কালাম, ঢাকাস্থ চীন দূতাবাসের দুজন প্রতিনিধি এবং মিয়ানমার দূতাবাসের এক জন প্রতিনিধি যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেন। আবুল কালাম সেখানে বলেন, ” প্রত্যাবাসন শুরুর জন্য রোহিঙ্গাদের সীমান্তে পৌঁছে দেয়ার জন্য সব ধরণের প্রস্তুতি রাখা হয়েছিলো। কিন্তু সেখানে কোন রোহিঙ্গা আসেনি”। তিনি বলেন “এ পর্যন্ত ২৯৫টি পরিবারের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে। যাদের কেউই মিয়ানমারে ফেরত যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেনি,”। তবে এই কর্মসূচী অব্যাহত থাকবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বাস ও ট্রাকগুলো উপস্থিত থাকবে সেখানে। প্রত্যাবাসনে আগ্রহী কোন শরণার্থী এলেই পরিবহণগুলোতে করে তাদের সীমান্তে পৌঁছে দেয়া হবে। তিনি জানান, প্রত্যাবাসনের তালিকায় মোট ১০৩৭টি পরিবার রয়েছে। তাদের মতামত নেয়ার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। এর ফলে খতিয়ে দেখা হবে তাদের মধ্যে কেউ ফিরে যেতে রাজি হয় কিনা। তবে কাউকে জোর করে ফেরত পাঠানো হবে না বলেও জানান তিনি।
চীনের প্রতিনিধি ঝেং তিয়ানঝু বলেন, প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনায় মধ্যস্থতার দায়িত্ব তার দেশ নিয়েছে। তবে সবচাইতে বড় যে প্রশ্ন, রোহিঙ্গারা কেন নিজ দেশে ফিরতে চায়না? কেন তারা মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষের ওপর আস্থা পায়না। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত মিয়ানমারের ক‚টনীতিকদের কাছে বাংলাদেশের সাংবাদিকেরা এই প্রশ্নগুলি বারবার তুলে ধরলেও তারা কোন জবাব দেননি। এর আগে, প্রত্যাবাসন শুরুর প্রস্তুতি হিসেবে টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে ঘুমধুম সীমান্ত পর্যন্ত নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা জানায় কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশে বর্তমানে এগারো লাখের মতো রোহিঙ্গা রয়েছে। যার বেশিরভাগই বাংলাদেশে প্রবেশ করা শুরু করে ২০১৭ সালের ২৫শে অগাস্টের পর। ওই সময়ে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী। এরপর জাতিসংঘসহ নানা সংস্থার নানা উদ্যোগের পর বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সরকারের আলোচনায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সিদ্ধান্ত হয়। এর আগে যে কয়বার প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে প্রতিবারই রোহিঙ্গাদের অনাগ্রহে ভেস্তে গেছে। বরং তারা নানা রকম শর্ত দিয়েছে। এর মধ্যে ছিল-নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, বাড়িঘর জমি ফেরত পাবার নিশ্চয়তার মতো বিষয়গুলো। এবার আবারও ২২শে অগাস্ট প্রত্যাবাসনের একটি সম্ভাব্য তারিখ মিয়ানমারের তরফ থেকে প্রকাশের পর বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন বিষয়ক কমিশন জানায়, প্রায় সাড়ে তিন হাজার রোহিঙ্গাকে ২২শে অগাস্ট ফেরত পাঠানোর বিষয়ে কাজ চলছে। এর আগে বাংলাদেশ ২২ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গার তালিকা মিয়ানমারকে দিয়েছিলো প্রত্যাবাসনের জন্য। তা থেকে সাড়ে তিন হাজারের মতো রোহিঙ্গার নাম প্রত্যাবাসনের জন্য নির্বাচন করে বাংলাদেশকে দেয় মিয়ানমার। ওই তালিকায় থাকা ১ হাজার ৩৩ পরিবারের মধ্যে ২৩৫ পরিবারের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন এবং ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধিরা।
নির্ধারিত প্রত্যাবাসন কর্মসূচি শুরু হবার সম্ভামনা কম হবার কারণ, রোহিঙ্গারা তাদের নাগিকত্ব, নিরাপত্তা, সহায়-সম্পত্তি ফেরত পাওয়া এবং নিজ দেশে চলাচলের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা ছাড়া মিয়ানমারে ফেরত যেতে আগ্রহী নয়। এদিকে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক এজেন্সি ইউএনএইচসিআর এবং বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষও বলেছে, রোহিঙ্গা স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে রাজি আছে সেটা তারা নিশ্চিত হতে চাইছে ।  এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, যতক্ষণ পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদার সঙ্গে না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারের এ প্রক্রিয়া শুরু করার পরিকল্পনা স্থগিত করা উচিত ।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক পরিচালক মিনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেছেন, মিয়ানমার এখনও রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক নিপীড়ন ও সহিংসতার সমাধান করতে পারেনি। তাই দেশে ফিরে গেলে প্রতিটি বিষয়ে নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ রয়েছে তাদের। জাতিসংঘ এ প্রক্রিয়ায় আলোচনা শুরু করার পর অনেক রোহিঙ্গা শরণার্থী হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে বলেছেন, তারা মিয়ানমারে ফেরত যেতে চান। কিন্তু বর্তমানে সেখানে যে অবস্থা তাতে ফিরে যাওয়াটা তাদের জন্য নিরাপদ নয়। প্রাথমিক তালিকায় যেসব শরণার্থীর নাম আছে তাদের অনেকে সমঝোতামুলক আলোচনায় উপস্থিত হতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here