রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা যুদ্ধাপরাধের শামিল : জাতিসংঘ -সরকার কঠোর হবে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

0
186

নিউজ ডেস্ক: নিজ দেশে ফিরে যেতে নানা দাবি তুলেছে রোহিঙ্গারা। এসব দাবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, প্রত্যাবাসনের জন্য আগে তাদের পূর্ণ নাগরিকত্ব দিতে হবে; জমি-জমা ও ভিটেমাটির দখল ফেরত দিতে হবে; নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে; রাখাইনে তাদের সঙ্গে যা হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এসব দাবীর কারনে বৃহস্পতিবার প্রত্যাবাসন শুরুর কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। ফলে রোহিঙ্গাদের অনিহায় দ্বিতীয় দফা ভেস্তে গেছে তাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া।  এছাড়া রাখাইন রাজ্যে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মোতায়েন, মিয়ানমারের আইডিএফ ক্যাম্পে থাকা ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে মুক্তি দেয়ার নতুন দাবিও তুলেছে রোহিঙ্গারা।
রোহিঙ্গারা যখন নিজদেশে ফিরে যেতে অনিচ্ছুক, তখন মিয়ানমারে তাদের ফিরে যাওয়ার অনুক‚ল পরিবেশ নেই বলে জানালো জাতিসংঘ। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ২০১৭ সালে জাতিগত নিধনযজ্ঞের অংশ হিসেবে রোহিঙ্গা নারী ও কিশোরীদের ওপর সেনাবাহিনী যৌন সহিংসতা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে মিয়ানমারের জাতিসংঘের তথ্য-অনুসন্ধানী মিশন। বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলছে, রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু মুসলমান রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর যৌন সহিংসতা যুদ্ধাপরাধের শামিল। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন কর্তৃক গঠিত স্বতন্ত্র আন্তর্জাতিক সত্য-অনুসন্ধানী মিশন জানিয়ে, তারা হদিস পেয়েছেন যে, মিয়ানমার সেনাবাহিনী ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ এবং নারীদের ওপর বিভিন্নভাবে যৌন নিপীড়ন চালিয়েছে। এমনকি তারা শিশু ও কিশোরের উপরও এ ধরনের নির্যাতন চালিয়েছে। যা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন বলেও জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, নৃতাত্তি¡ক সংখ্যালঘুদের শাস্তি দিতে ও আতঙ্কিত করতে যৌন এবং লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। নিউইয়র্কে দেয়া এক বক্তৃতায় জাতিসংঘের তথ্য-অনুসন্ধানী মিশনের রাধিকা কুমারস্বামী বলেন, নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের পরিবেশ নিরাপদ নয়।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা তাদের গ্রামে ফিরে যাবে না। পুরুষ, বালক ও হিজড়াদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার ঘটনায় চারপাশের নিরবতা ভাঙতে হবে। জাতিসংঘের মিশন বলছে, উত্তরাঞ্চলীয় কাচিন রাজ্য ও পশ্চিম মিয়ানমারের রাখাইনের কয়েকশ যৌন সহিংসতা থেকে বেঁচে যাওয়া ও প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষাৎকার নিয়েছে মিশন। আগামী মাসে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়া হবে। রাধিকা বলেন, সামরিক কৌশল হিসেবে যৌন সহিংসতাকে ব্যবহার করছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এটা তাদের কৌশলের অংশ। কিন্তু রোহিঙ্গা এলাকায় এটা এতই ভয়ঙ্কর হিংস্র ও নৃশংস যে এতে বোঝা যাচ্ছে তারা এই স¤প্রদায়কে ধ্বংস করে দিতে চাচ্ছে। নিপীড়নে জড়িতদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে না পারার ব্যর্থতার জন্য মিয়ানমারের নিন্দা জানিয়েছে তথ্য-অনুসন্ধানী মিশনের প্রতিবেদনে।
এতে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে দায়মুক্তি ও মেনে নেয়ার পরিস্থিতি থেকেই এমন সহিংসতা সম্ভব। কারণ সেখানে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর শাস্তি কিংবা শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থার মুখোমুখি হওয়ার কোনো যৌক্তিক ভয় নেই। তবে মিয়ানমার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তাদের দাবি, রোহিঙ্গা যোদ্ধাদের হামলার জবাবে উত্তর রাখাইনের গ্রামে সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শত শত নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ৮০ শতাংশ ছিল গণধর্ষণ। আর এসব গণধর্ষণের ৮২ শতাংশের জন্য মিয়ানমারের সেনাবাহিনী দায়ী।
২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধন শুরু হলে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। বৃহস্পতিবার এসব রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে দ্বিতীয় উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সব প্রস্তুতি নেয়ার পরও রোহিঙ্গারা ফিরতে আগ্রহী না হওয়ায় প্রত্যাবাসন শুরুর দ্বিতীয় চেষ্টাও ভেস্তে গেছে। রাখাইনের গ্রামে গ্রামে হত্যা-ধর্ষণ আর ব্যাপক জ্বালাও পোড়াওয়ের মধ্যে প্রাণ হাতে করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা এই রোহিঙ্গারা ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে অন্তত চারটি শর্তের কথা বলছেন। তাদের দাবি, প্রত্যাবাসনের জন্য আগে তাদের নাগরিকত্ব দিতে হবে। জমি-জমা ও ভিটেমাটির দখল ফেরত দিতে হবে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। রাখাইনে তাদের সঙ্গে যা হয়েছে, সেজন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে মোমেন রোহিঙ্গাদের এই অনাগ্রহকে দুঃখজনক বলেছেন। আর জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর বলেছে, রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছ¡ায় ফেরা নিশ্চিত করতে হলে তাদের মধ্যে আস্থা তৈরির বিকল্প নেই।
এদিকে, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরাতে শক্ত অবস্থানে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন। গতকাল শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডিতে এক অনুষ্ঠান শেষে এ ঘোষণা দেন তিনি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সফল করার দায়িত্ব মিয়ানমার ও আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়ের। মানবিক দিক থেকে আমাদের যা যা করার ছিল, সব করেছি। এখন অনুক‚ল পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের বুঝিয়ে দেশে ফেরত নেয়ার দায়িত্ব মিয়ানমারের; কারণ তারা তাদের নাগরিক। মিয়ানমারকে তাদের লোকদের মধ্যে আস্থা আনাতে হবে। নিজেদের এবং এ অঞ্চলের শান্তি শৃঙ্খলার স্বার্থে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে হবে। ভিয়েতনাম, চীন, রাশিয়া এমনকি ভারতও এখন বাংলাদেশের অবস্থানের সঙ্গে একবাক্যে সমর্থন দিচ্ছে বলে দাবি করেন আব্দুল মোমেন।
তিনি আরো বলেন, রোহিঙ্গাদের যত দ্রæত সম্ভব ফেরত পাঠানো দরকার। তা না হলে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। প্রত্যাবাসন দীর্ঘায়িত হলে আঞ্চলিক শান্তি বিনষ্ট হতে পারে। ফলে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়ের উদ্দেশে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সমস্যা উত্তরনে একটি কমিশন করা যেতে পারে। এ কমিশন, জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা এবং অন্যান্য সবার এখন কাজ হচ্ছে মিয়ানমার যাওয়া। সেখানে গিয়ে রোহিঙ্গাদের জন্য অনুক‚ল পরিবেশ নিশ্চিত করা। আমাদের এখানে তাদের আর কাজ নেই। সেখানে যদি তাদের প্রবেশ করতে না দেয়, তাহলে আমি বলব তারা মিয়ানমারের সঙ্গে ব্যবসা করে কেন? আমেরিকায় মিয়ানমার এখনো জিএসপি সুবিধা পায় কেন? আমি বলব, জাতিসংঘ রোহিঙ্গা ইস্যুতে কিছু ভুল করেছে। এখন সবাইকে নতুন করে ভাবতে হবে। এ সময়, দ্বিতীয় দফা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সফল না হলেও প্রক্রিয়া চালু থাকবে বলে জানান আব্দুল মোমেন। ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধন শুরু হলে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। ১৯৭৮ সালে শুরু হয় রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ। বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখের বেশি।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here