রওশন আউট-কাদের ইন

0
15

নিজস্ব প্রতিবেদক: এরশাদের ছোটভাই জি এম কাদের একজন সজ্জন, আদর্শবান, নীতিনিষ্ঠ রাজনীতিবিদ হিসেবে জাতীয় পার্টির পাশাপাশি অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কাছেও সমাদৃত। কিন্তু তা সত্তে¡ও পারিবারিকভাবে সৌহার্দ্যময় সম্পর্ক থাকলেও এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদ ও তার একান্ত অনুগত কতিপয় নেতা-কর্মীর কাছে জি এম কাদের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি। দলের রাজনীতি, স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে কেবল ব্যক্তি-গোষ্ঠী স্বার্থের রাজনীতিকে জি এম কাদের বরাবর ঘৃণার চোখে দেখেন। তাঁর এই আদর্শনিষ্ঠা, নীতি নৈতিকতা এবং ব্যক্তি স্বার্থবাদীদের সাথে আপষরফা না করার মন-মানসিকতাই জাতীয় পার্টির চলমান বিরোধ ও বিভক্তির প্রধান কারণ বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন।
সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নুসহ গুটিকয়েক নেতাকে সামনে নিয়ে রওশন এরশাদ পাল্টা জাতীয় পার্টি গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। জি এম কাদের ও রওশন এরশাদের মধ্যে বেশ কয়েকটি বিষয়ে বিরোধ রয়েছে। এরশাদের জীবদ্দশা থেকেই এর শুরু। জরুরি কারণ হিসেবে এসেছে রংপুরে এরশাদের আসনে এরশাদ-পুত্র সাদকে মনোনয়ন দেয়া এবং সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা হিসাবে জি এম কাদেরের নাম প্রস্তাব করার ঘটনা।
রওশনের একান্ত ইচ্ছা ছিল সাদ এরশাদকে এরশাদের আসনে মনোনয়ন দেয়া। রাজনৈতিকভাবে সাদকে প্রতিষ্ঠা করতে চান তিনি। সংসদ সদস্য নির্বাচিত করে আনার মাধ্যমে দলীয়ভাবেও নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা সহজসাধ্য হবে বলে মনে করেন রওশন। কিন্তু পার্টির কেন্দ্রীয় ও জেলার নেতা-কর্মীদের কাছে সাদের কতটা গ্রহণযোগ্যতা আছে, আদৌ আছে কিনা বিবেচনায় নেননি রওশন। এরশাদের উত্তরাধিকার হিসেবে সাদের প্রতি রংপুরের সকল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সহজাত স্নেহ, মমতা আছে কিনা তাও পরখ করেননি তিনি। তবে নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন নিয়েই সে পরীক্ষা হয়ে গেল। রংপুরের সর্বস্তরের নেতা-কর্মীরা সাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার। তারা সাদকে মেনে নিতে পারছে না। তাকে তারা বহিরাগত মনে করেন। এরশাদের জীবদ্দশায় রংপুরে সাদের ন্যুনতম যোগাযোগও ছিল না। রংপুরের নেতা-কর্মীরা মনে করেন এরশাদের মৃত্যুর পর রওশন এরশাদ সাদকে তাদের উপর চাপিয়ে দিচ্ছেন। যা তারা একেবারেই মেনে নিতে পারছেন না। রংপুরে সাদের কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়েছে। ঝাড়– মিছিল হয়েছে রওশনের বিরুদ্ধে। একদিকে পারিবারিক সম্প্রীতি রক্ষা করা এবং অপরদিকে দলের দীর্ঘদিনের নিবেদিতপ্রাণ নেতা-কর্মীদের প্রচÐ চাপের মধ্যে চরম বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছিল জি এম কাদের। রওশনও কার্যকর চাপ রাখতে পাল্টা জাতীয় পার্টি গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মতামত উপেক্ষা করে তাদের আশা-আকাক্সক্ষার বিপরীতে কোন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়ার পক্ষে নন জিএম কাদের। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী একক সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার থাকলেও পার্টিপ্রধান কাদের মনোনয়ন বোর্ডকে ডিঙ্গিয়ে কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রবল বিরোধী। সাদকে মনোনয়ন দিয়ে ভাবীর মনরক্ষা করার কঠিন মূল্য দিতে হবে পার্টিকে, জি এম কাদেরকে এ বিষয়টি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, বিচলিত করে রেখেছে। সাদকে মনোনয়ন দেয়া হলে রংপুরে জাতীয় পার্টির সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া হবে। এমনও হতে পারে তারা স্বতন্ত্র প্রার্থী দিয়ে তাঁকে বিজয়ী করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করবেন। তাদের একটা অংশ আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর পক্ষেও প্রকাশ্যে মাঠে নামতে পারে, ভোটও দিতে পারে। এ অবস্থাটা এরশাদের দূর্গ বলে পরিচিত রংপুরে জাতীয় পার্টির অস্তিত্বের উপরও আঘাত হানতে পারে। শেষ পর্যন্ত দলীয় প্রেসিডিয়াম মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দলের যুগ্ম মহাসচিব এস এম ইয়াসিরকে রংপুর-৩ উপনির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে জি এম কাদেরের নাম প্রস্তাবের বিষয়টিও মনেপ্রাণে মেনে নেননি রওশন এরশাদ এবং ব্যারিস্টার আনিস ও তাদের সহযোগীরা। গঠনতান্ত্রিক বিধান মত পার্টির চেয়ারম্যানকে স্পিকারের কাছে বিরোধী দলীয় নেতার নাম প্রস্তাব করতে হয়। সে অনুযায়ী জি এম কাদের তাঁর নাম প্রস্তাব করেন। তিনি অবশ্য দলের ২২ এমপির মধ্যে ১৫ জনের সমর্থন পেয়েছেন। রওশন বিভক্ত জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে স্পিকারের কাছে সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা পদে নিজের নাম প্রস্তাব করতে পারেন। তবে স্বল্পসংখ্যক এমপির সমর্থন থাকায় তার সাংবিধানিক গ্রহণযোগ্যতা পাবে না।
জাতীয় পার্টির চেয়ারপার্সন পদটি কখনোই হাতছাড়া করতে চাননি রওশন। জীবনের শেষবেলায় এরশাদ রওশনের দাবি অগ্রাহ্য করে ছোটভাই কাদেরকে তাঁর অবর্তমানে দলের শীর্ষপদের দায়িত্ব দিয়ে যান। রওশন এরশাদ স্বামী এরশাদের এই সিদ্ধান্তের প্রবল বিরোধীতা করায় এরশাদ প্রথম দফায় কাদেরকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়ার পূর্ব ঘোষিত সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। পরে রাজনৈতিক বাস্তবতায় এরশাদ আগের ঘোষণাই ফিরে যান। এরশাদের ঐকান্তিক কামনা ছিল তাঁর মৃত্যুর পর যেন দলের নেতা-কর্মীরা তাঁকে স্মরণ করেন, মৃত্যুবার্ষিকী পালন করেন। দলকে সুসংগঠিত করেন। বয়োবৃদ্ধ রওশনের পক্ষে শারীরিক প্রচÐ সীমাবদ্ধতার কারণেই তা সম্ভব নয়। বিশাল সংগঠন ধরে রাখা, নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, সাক্ষাৎ দেয়া, তাদের সমস্যার সমাধান; জেলা, মহানগর, উপজেলা পর্যায়ে সাংগঠনিক সফর Ñ প্রভৃতি রওশনের জন্য কঠিন এবং অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। এসব ছাড়াও ব্যক্তিগত আচার-আচরণ প্রভৃতি বিবেচনায় এরশাদ তাঁর ছোটভাই জি এম কাদেরকেই উত্তরাধিকারি হিসেবে বাছাই করেন। কাদের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই জেলা, উপজেলায় সাংগঠনিক যোগাযোগ, নেতৃবৃন্দ, কর্মীদের মতামত নেয়ার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। জি এম কাদের, প্রেসিডিয়াম, কেন্দ্রীয় কমিটিসহ জেলা, উপজেলার নেতা-কর্মীদের গ্রহণযোগ্যতা স্বল্পসময়ের মধ্যেই কুড়িয়েছেন। তাঁর বিপক্ষে রাজনৈতিক-সাংগঠনিক বাস্তবতায় যারা ছিলেন তারাও এখন কাদেরের একনিষ্ঠ সমর্থক ও অনুসারী। এদের পরামর্শ, সহযোগিতা নিয়ে কাদের পার্টিকেও অনেকটা গুছিয়ে এনেছেন। রওশন এরশাদ ও তাঁর সহযোগীদের বিভিন্নমুখী কার্যক্রম পার্টির এই বিকাশমান ধারাকে অনেকক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত করছে।
বিগত সংসদেও জাতীয় পার্টি সরকারে থাকার পাশাপাশি বিরোধী দলের ভ‚মিকায় ছিল। বিরোধী দলীয় নেত্রী ছিলেন রওশন এরশাদ। গত সংসদের পুরো মেয়াদে রওশন এমন কোন ভ‚মিকা রাখেননি যা কার্যকর বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টির ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছে। বরং সংসদে তাঁর বক্তব্যে, ভ‚মিকায় জাতীয় পার্টিকে সরকারের অনুগত দল হিসেবেই প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। অন্যান্য বিরোধী দলের মতে রওশনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি গৃহপালিত বিরোধী দল হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছে। জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীদের কাছেও রওশনের এই ভ‚মিকা নন্দিত ছিল না। সরকারের গঠনমূলক সমালোচনাসহ কার্যকর বিরোধী দল হিসেবে সরকার ও সরকারি দলও জাতীয় পার্টিকে দেখতে চায়। এক্ষেত্রে রওশন এরশাদ ও জাতীয় পার্টির ব্যর্থতা তাদেরও হতাশ করে। সংসদে বিরোধী দলের অকার্যকর ভ‚মিকা সংসদ সম্পর্কেই জনেমনে অসন্তোষ, হতাশা সৃষ্টি করে। চলতি সংসদের শুরুতেই এই অনাকাক্সিক্ষত ধারায় লক্ষণীয় পরিবর্তনের সূচনা করেন জি এম কাদের। সংসদীয় রাজনীতি, রীতিনীতিতে দক্ষ হয়ে ওঠার পাশাপাশি সংসদে সরকারের তীর্যক সমালোচনা করতেও কুণ্ঠিত না হওয়া, জনজীবনের দুর্ভোগ, সমস্যাসমূহ জোরালোভাবে তুলে ধরার ঘটনা জি এম কাদের এবং জাতীয় পার্টির ভাবমূর্তি অনেকাংশে উজ্জ্বল করেছে। দলের মানুষও এরশাদহীন জাতীয় পার্টি নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here