সিটি নির্বাচন : বড় দুই দলের জন্যই বড় পরীক্ষা

0
29

নিজস্ব প্রতিবেদক :  আগামী ডিসেম্বরে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন হতে যাচ্ছে। অক্টোবরের প্রথম দিকে নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষনা করবে। ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন একযোগে অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচন সরকারি দলের জন্য যেমনি প্রধান বিরোধী শক্তি বিএনপির জন্যও চ্যালেঞ্জ হয়ে আসছে। বিএনপি ও তার সহযোগীদের প্রমান করতে হবে গত সংসদ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা, সরকারের ভাবমূর্তি জনপ্রিয়তা সম্পর্কে তারা যেসব অভিযোগ করে আসছেন, প্রশ্ন তুলছেন তার যথার্থতা প্রমানের অন্যতম মাধ্যম হবে এই নির্বাচন। অপরদিকে সরকার, সরকারি দলকে প্রমান করতে হবে যে তাদের জনপ্রিয়তা হ্রাস পায়নি। মানুষ উন্নয়ন, শান্তি সমৃদ্ধির পক্ষে। এ লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সরকারের নিরলস পরিশ্রমের মূল্যায়ন করতে কুণ্টা করবেন না রাজনীতিক সচেতন তিন মহানগরের ভোটার সাধারণ।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন সিটি নির্বাচনে কারচুপি, জালিয়াতি হলে তা দেশে বিদেশে সরকারকে বিব্রতই নয়, রাজনৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। উভয় পক্ষই এ নির্বাচনকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে নিয়ে কর্মপরিকল্পনা করছে। যোগ্যতম, বিতর্কের উর্ধ্বে থাকা কর্মী ও জনসাধারনের কাছে গ্রহণযোগ্যদেরই মনোনয়ন দেবে। বিএনপি, ড. কামালের গণফোরাম চেষ্টা চালাচ্ছে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ ও বাংলাদেশস্থ বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের সার্বক্ষনিক নির্বাচন পর্যবেক্ষনের ব্যবস্থা করতে। ড. কামালের স্ত্রীর ডেমোক্রেসি ওয়াচ এ ব্যাপারে বিশেষ ভূমিকা নিচ্ছে।
জানা যায়, ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের মেয়রদের নিজেদের হৃত ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে কিছু সময় দেয়ার জন্যই নির্বাচন পিছিয়ে ডিসেম্বরে নেয়া হয়েছে। ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবেলা তাদের আগাম প্রস্তুতি না নেয়া নগরবাসীর মধ্যে লাগাতার আতঙ্ক এবং তা দূর করতে কর্পোরেশনের সীমাহীন ব্যর্থতা মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। যার প্রতিফলন এই নির্বাচনে হতে পারে। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে কর্পোরেশনের ব্যর্থতার মাশুল মেয়রকে দিতে হতে পারে।
তিন সিটি কর্পোরেশনেই আওয়ামী লীগ ও বিএনপির যোগ্য, শক্তিশালী প্রার্থী রয়েছেন। বর্তমান তিন মেয়রই সরকার দলীয়। তাদের আরেকটা সুযোগ প্রত্যাশা করছেন। কিন্তু র্শীষ নেতৃত কারো কোন আবদার সুপারিশ বিবেচনায় না নিয়ে সর্বদিক থেকে যোগ্যতম প্রার্থীকেই বেছে নেয়ার পক্ষে। মেয়র সাঈদ খোকনের প্রতি শীর্ষ মহলের দুর্বলতা তার প্রায়ত পিতার অবদান কেন্দ্রিক। নতুন প্রজন্মের এই তরুন মেয়র নগরবাসীর আশা-আকাঙ্খা কতটা পূরণ করতে পেরেছেন তার ভাবর্মূতি জনপ্রিয়তা কর্মীও নগরবাসীর মধ্যে কতটা অবশিষ্ট আছে তা বিচার বিবেচনা করা হবে। দক্ষিনের মেয়র আতিকুল ইসলামের বেলায় অবস্থা অনেকটা তার অনুকূলে। মেয়র হিসেবে তিনি পুরো মেয়াদে দায়িত পালন করেননি। তিনি শিক্ষিত মার্জিত ও কর্মী ও সাধারনের প্রতি অনেক বেশি সহানুভূতিশীল। উত্তর ও দক্ষিনে -দুই কর্পোরেশনেই বেশ কয়েকজন প্রার্থী রয়েছেন। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী মোফাজ্জ্বল হোসেন চৌধুরী মায়া প্রার্থী হতে চাচ্ছেন। তাদের কারো ব্যাপারেই উচ্চ পর্যায়ে উচু ধারনা নেই। সাংসদ ব্যারিস্টার তাপসও আগ্রহী। অপর সিটিতে সাবের হোসেন চৌধুরী নির্বাচনে প্রার্থী হতে গভীরভাবে আগ্রহী। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও তার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল।
জানা যায়, একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার মাধ্যমে এরিমধ্যে জরিপ চালানো হয়েছে। আওয়ামী লীগ থেকে দলীয়ভাবেও জরিপ চালানো হচ্ছে। জরিপ ফলাফল প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্ব পাবে।
বিজয় নিশ্চিত করতে আওয়ামী লীগ জোটগত নির্বাচনের প্রতি জোর দিচ্ছে। ছোট ছোট শরিকদের স্থানীয়ভাবে যোগ্য, জনপ্রিয় প্রার্থীকে ছাড় দেয়া হবে। তবে এ সংখ্যা হবে খুবই স্বল্প। প্রার্থীদের বিজয়ের উপর দেশে-বিদেশে সরকারের জনপ্রিয়তা ও ভাবমূর্তি অনেকটা নির্ভরশীল বলে উচ্চতর মহল মনোনয়নের ব্যাপারে কঠোরনীতি নিয়েছে।
অপরদিকে বিএনপি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে বিশেষ গুরুত্বের সাথে নিয়েছে। গত সংসদ নির্বাচনকে তারা মধ্যরাতে ব্যালটবাক্সে ভরার নির্বাচন বলে আখ্যা দিয়েছিল। অবশ্য দলের ছয় নির্বাচিত সদস্য শেষ পর্যন্ত শপথ নিয়ে সংসদ অধিবেশনে যোগ দেয়ার পর তাদের অভিযোগ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তবে সাধারণভাবে অনেক ভোটারই ভোট দিতে না পারায় তাদের মধ্যে চাপা অসন্তোষ রয়ে গেছে।। ধারণা করা হচ্ছে ভোটাররা ভোট দিতে পারলে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন তার প্রতিফলন ঘটতেও পারে। ঢাকা, চট্টগ্রামের ভোটাররা রাজনীতি সচেতন বলে তারা ভোটকেন্দ্র গেলে ভোট কোনদিকে দেন সে সম্পর্কে অনিশ্চয়তা কাজ করছে সরকারি দলের অনেকের মধ্যে। বিএনপি প্রার্থীও দেবে জনপ্রিয় যোগ্যতম ব্যক্তিকেই। এখানে কোনরকম বিভেদ, দলাদলিকে স্থান দেয়া হবেনা। বিজয়ের স্বার্থে তারাও নির্বাচন করবেন ২০ দলীয় জোটগতভাবে। কর্ণেল ড. অলির এলডিপিকেও কাছে টানা হচ্ছে।  কাউন্সিলর পদে তার দু’একজন প্রার্থীকে চট্টগ্রামে ছাড় দেয়াও হতে পারে। বিএনপির সমস্যা হচ্ছে জামায়াতকে নিয়ে। তারা তিন সিটি কর্পোরেশনেই মেয়র পদে প্রার্থী দেবে। প্রত্যেক কর্পোরেশনের অর্ধেক সংখ্যক ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে মনোনয়ন দেবে। বিএনপির সাথে শক্ত দরকষাকষি করাই তাদের উদ্দেশ্য। জামায়াত চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদটি দখলে নিতে চায়। তিন কর্পোরেশনেই কমপক্ষে এক চতুতাংশ কাউন্সিল পদে ছাড় না দিলে তাদের অবস্থান নিয়ে শঙ্কিত বিএনপি। সরকারি মহলও জামায়াতকে দিয়ে বিএনপিকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে পারে বলে বিএনপির নেতারা মনে করেন।
বিএনপির মূল ভরসা দলীয় কর্মী-সমর্থকরা। তারা সর্বশক্তি নিয়ে নির্বাচনী মাঠে থাকবেন এবং জনমত প্রভাবিত করতে ভূমিকা রাখবেন বলেই আশা করছেন বিএনপির নেতারা। বিএনপি মহাসচিব বলেছেন, আগামী সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখেই সিটি নির্বাচনে মাঠে নামতে হবে। কিন্তু দলটির মাঠের কর্মীরা নির্বাচনকে সেভাবে দেখছেন বলেও মনে হয়না। নতুন সংসদ নির্বাচন হতে আরো সাড়ে চার বছর। সে সময় পর্যন্ত তাদের টিকে থাকার প্রশ্ন রয়েছে। সরকারি দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের বিপক্ষে গিয়ে জোরালো কোন ভূমিকায় নামার রাজনৈতিক-প্রশাসনিক পরিনামের দিকও তাদের ভাবতে হচ্ছে। বিরোধে নাগিয়ে স্থানীয় এমপি, সরকার দলীয় প্রভাবশালী নেতাদের সাথে ভাব রেখে, কোনরকম বিরোধে না জড়িয়ে তারা নিরাপদে থাকার চেষ্টা করছেন। নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে জোরালো ভূমিকা নিয়ে তাদের চক্ষুশূল হতে চাননা। থানা পুলিশের খাতায় চাপা রাখা নাম নতুন করে চাঙ্গা করতে রাজি নন তারা। নতুন জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত নিরাপদে টিকে থাকাকেই তারা তাদের পরিবারের লোকজন বড় করে দেখছেন। অপরদিকে ভোটার সাধারনের মধ্যে সরকারের প্রতি কিছু বিষয়ে অসন্তোষ থাকলেও বিএনপি, ২০ দলীয় জোটের জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রতি হতাশা, অনাগ্রহ ও রয়েছে। গত সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এদের নির্বাচন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী ভূমিকা তাদের হতাশা করেছে। বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীলরাও ভোটের দিন ভোট দিতে কেন্দ্রে আদৌ যান কিনা সে সংশয়ও রয়েছে। নেতৃত্ববিহীন বিএনপির মধ্যে জনমনে হৃত আস্থা ফিরিয়ে আনাও চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।এমনি অবস্থায় বিএনপি সিটি নির্বাচনে দেশি বিদেশি পর্যবেক্ষক, ঢাকাস্থ বিদেশি দূত, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহকে কিভাবে কতটা কাজে লাগাতে পারবে। সরকারি দল বড় রকমের প্রশ্ন উঠতে পারে এমন কোন ভূমিকায়ও অবর্তীণ হওয়ার কথা ভাবছেনা। ভোটার সাধারণ তাদের প্রার্থীদেরই বেছে নেবে বলে তাদের বিশ্বাস।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here