উত্তাল বুয়েটে ৭ দফায় ভিসির একাত্মতা

0
16

নিজস্ব প্রতিবেদক: আবরার  হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তিসহ সাত দফা দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। গতকাল সকাল ১০টা থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান নেন পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী। সকাল ৯টার দিকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বুয়েট ক্যাফেটেরিয়ার সামনে জড়ো হন। সাড়ে ১০টার দিকে তারা সাত দফা দাবির কথা জানিয়ে ক্যাম্পাসে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি শহীদ মিনার হয়ে শেরে বাংলা হলের ভেতরে প্রদক্ষিণ করে আহসান উল্লাহ হল,  কাজী নজরুল ইসলাম হলের সামনের চত্বর ঘুরে শহীদ মিনারে আসে।
এসময় আবরার হত্যার বিচারের দাবিতে বিভিন্ন ¯েøাগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো ক্যাম্পাস। মিছিল থেকে আবরার ফাহাদ হত্যার বিচার চাওয়ার পাশাপাশি বলা হয় ‘খুনিদের ঠিকানা, এই বুয়েটে হবে না’।
সাত দফা দাবিগুলো হলো- ফাহাদ হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত ও খুনিদের ছাত্রত্ব আজীবনের মতো বাতিল, দায়ের করা মামলা দ্রæত বিচার ট্রাইবুনালের অধীনে স্বল্পতম সময়ে নিষ্পত্তি, ঘটনার ৩০ ঘণ্টার মধ্যেও ঘটনাস্থলে ভিসি কেন উপস্থিত হননি তার জবাবদিহিতা, আবাসিক হলগুলোতে র‌্যাগের নামে ও ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর সব ধরনের শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন বন্ধে জড়িত সবার ছাত্রত্ব বাতিল, একই সঙ্গে আহসানউল্লা হল এবং সোহরাওয়ার্দী হলের পূর্বের ঘটনাগুলোতে জড়িত সবার ছাত্রত্ব বাতিল, রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে আবাসিক হল থেকে ছাত্র উৎখাতের ব্যাপারে অজ্ঞ থাকা এবং শেরে বাংলা হলের প্রভোস্টকে ১১ নভেম্বরের মধ্যে প্রত্যাহার। সর্বশেষ দাবিটি হচ্ছে, আবরারের পরিবারের ক্ষতিপূরণ ও সব মামলার খরচ বুয়েট প্রশাসনকে বহন করতে হবে।
এদিকে, বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েন বুয়েটের ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান। বেলা ১১টার দিকে বুয়েটের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে এ ঘটনা ঘটে। এসময় অধ্যাপক মিজানুর রহমানকে আবরার ফাহাদ হত্যার বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্নেবাণে জর্জরিত করেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীরা তার কাছে জানতে চান, রাত ২টার সময় হলে পুলিশ ঢুকল কীভাবে? এ প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, সেটা হলের প্রভোস্টকে জিজ্ঞেস করেন। এ সময় শিক্ষার্থীরা তাকে ‘ভুয়া, ভুয়া, পদত্যাগ, পদত্যাগ’ বলে ¯েøাগান দিতে থাকেন। ছাত্রদের তোপের মুখে এক সময় পদত্যাগ করবেন বলেও জানান তিনি। শিক্ষার্থীদের দাবিগুলোর বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বুয়েটের ভিসি অধ্যাপক সাইফুল ইসলামের ওপর চাপিয়ে দেন। অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, আমার মনে হয় না কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতির কোনো প্রয়োজন আছে। বিশেষ করে বর্তমান প্রেক্ষাপটে। বুয়েটেও নিষিদ্ধ করা উচিত। কবে নিষিদ্ধ হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি এখানে বসে লিখে দিলে কিংবা বলে দিলে হয়ে যাবে না। তবে ভিসি মহোদয়ের সঙ্গে এসব বিষয়ে যত দ্রæত সম্ভব কথা বলবেন বলে শিক্ষার্থীদের আশ্বাস দেন তিনি।
এদিকে, বুয়েট ক্যাম্পাসে শিক্ষক সমিতির সভাপতি এ কে এম মাসুদ বলেছেন, অতীতে যেসব বেআইনি ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর কোনো বিচার হয়নি। তারই খেসারত হিসেবে আজকের এই হত্যাকাÐ। আগের ঘটনার কোনো ব্যবস্থা নিলে এ ঘটনা ঘটত না। শিক্ষক সমিতির সদস্যরা গতকাল ভিসির সঙ্গে দেখা করেন। তিনি বলেছিলেন ব্যবস্থা নেবেন। তারপর আর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। শিক্ষক সমিতি ছাত্রদের এই আন্দোলনের সঙ্গে একমত। এটি যৌক্তিক বলে মনে করে।
টিএসসি চত্বরে গায়েবানা জানাজা
ওদিকে, গতকাল দুপুরে ফাহাদের গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে। গায়েবানা জানাযা শেষে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে। এতে অংশ নিয়ে ঢাবি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ভিপি নুরুল হক ?নুরু শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রলীগের দৌরাত্ম্য প্রতিহত করার জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হবার আহŸান জানান। ছাত্রলীগ কর্তৃক বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে দু’দিনের প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি’র ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, আবরার হত্যার প্রতিবাদে
আজ দেশব্যাপী সকল জেলা, মহানগর ও বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে এবং আগামী ১০ অক্টোবর বৃহস্পতিবার দেশব্যাপী সকল থানা, পৌর ও কলেজসমূহে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। ইতোমধ্যে এ হত্যাকাÐের ঘটনায় ১৯ জনকে আসামি করে সোমবার সন্ধ্যার পর চকবাজার থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন নিহত আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ্। এদিকে বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের হত্যাকাÐের ঘটনার প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সহ-সভাপতিসহ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা কমিটির ১১ জন নেতাকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে।
জাবিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচী পালন করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের পাদদেশে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন এই কর্মসূচী পালন করেন। এ সময় তারা দোষীদের শাস্তির আওতায় আনার জোর দাবি জানান। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারের কঠোর সমালোচনাও করেন তারা। প্রসঙ্গত, ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেওয়ার জের ধরে আবরার ফাহাদকে রোববার (৬ অক্টোবর) রাতে ডেকে নিয়ে যায় বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী। এরপর রাত ৩টার দিকে শেরেবাংলা হলের নিচতলা ও দুইতলার সিঁড়ির করিডোর থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরদিন সোমবার দুপুর দেড়টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গে আবরারের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ লাশের ময়নাতদন্ত করেন। তিনি বলেন, ‘ছেলেটিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এই ঘটনায় আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ বাদী হয়ে ১৯ জনকে আসামি করে রাজধানীর চকবাজার থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত ৯ জন ছাত্রলীগ নেতাকে আটক করেছে পুলিশ। নিহত আবরার বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি শেরেবাংলা হলের ১০১১ নম্বর কক্ষে থাকতেন। এদিকে, এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে শাখা ছাত্রলীগের ১১ নেতাকর্মীকে স্থায়ী বহিষ্কার করেছে সংগঠনটি। অভিযোগের সত্যতা উদ্ঘাটনে গঠিত দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি আজ তাদের সংশ্লিষ্টতার পেয়েছে বলে জানিয়েছে।
প্রতিবাদে উত্তাল রাবি
বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে (২১) পিটিয়ে হত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ  করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করে। এ নিয়ে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। আন্দোলনে অংশ নেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বলেন, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী দেশ নিয়ে চিন্তা করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাকে হত্যা করা হবে এটা কোন আইনে আছে? আমরা দেখেছি আবরারের মা- বাবার আহাজারি।  কেন তাদের সন্তানকে হত্যা করা হলো। প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে শিক্ষার্থীরা বলেন, দেখুন আপনার সোনার ছেলেরা দেশ প্রেমিককে কিভাবে নির্মমভাবে হত্যা করলো। অনতিবিলম্বে খুনিদের বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে বহিষ্কার করে দ্রæত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করার পাশাপাশি সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
প্রসঙ্গত, আবরার ফাহাদ বুয়েটের ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। গত রোববার রাত ২টায় বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অচেতন অবস্থায় শেরে বাংলা হলের দ্বিতীয়তলা থেকে মরদেহ উদ্ধার করে কর্তৃপক্ষ। রহস্যজনক মৃত্যুর ৮ ঘণ্টা আগে ভারতকে সমুদ্র বন্দর, পানি ও গ্যাস দেয়ার চুক্তি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ।এই ঘটনায় আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ বাদী হয়ে ১৯ জনকে আসামি করে রাজধানীর চকবাজার থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত ৯ জন ছাত্রলীগ নেতাকে আটক করেছে পুলিশ। নিহত আবরার বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি শেরেবাংলা হলের ১০১১ নম্বর কক্ষে থাকতেন। এদিকে, এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে শাখা ছাত্রলীগের ১১ নেতাকর্মীকে স্থায়ী বহিষ্কার করেছে সংগঠনটি। অভিযোগের সত্যতা উদ্ঘাটনে গঠিত দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি আজ তাদের সংশ্লিষ্টতার পেয়েছে বলে জানিয়েছে।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here