চলমান আন্দোলনের মুখে অবরুদ্ধ জাবি উপাচার্য

0
13

জাবি প্রতিনিধিঃ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) দুর্নীতির অভিযোগে চলমান উপাচার্য অপসারণ ও আন্দোলনে ছাত্রলীগের অতর্কিত হামলার প্রতিবাদে বুধবার (০৬ নভেম্বর) সকাল থেকে বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করেছে আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। বিক্ষোভ মিছিল ও ‘সংহতি সমাবেশ’ থেকে বিশ^বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করে উপাচার্য অপসারণ পর্যন্ত আন্দোলনের ডাক দিয়ে আবারও উপাচার্যকে বাসভবনে অবরুদ্ধ করেছে আন্দোলনকারী শিক্ষক শিক্ষার্থীরা। সর্বশেষ সংবাদ অনুযায়ী আন্দোলনকারীরা উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান করছে।

বুধবার বেলা এগারোটায় বিশ^বিদ্যালয়ের নতুন কলা ভবন সংলগ্ন মুরাদ চত্ত¡র থেকে আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একটি বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। বিক্ষোভ মিছিলটি বিশ^বিদ্যালয়ের প্রীতিলতা হলের অবরুদ্ধ থাকা নারী শিক্ষার্থীদের বের করে আনে। পরে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে মিছিলটি পুরাতন রেজিস্ট্রার ভবনের সামনে গিয়ে মিলিত হয়। পরবর্তীতে রেজিস্ট্রার ভবনের সামনে শতাধিক শিক্ষক ও পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে সংহতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

এরপর সাড়ে ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন প্রশাসনিক ভবনের সামনে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর ব্যানারে আয়োজিত ‘সংহতি সমাবেশ’ থেকে শিক্ষকরা বলেন, উপাচার্য তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত রতে ভয় পান। তিনি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কোনো দাবিকে কর্ণপাত করেননি। শেষ পর্যায়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা যখন তাকে অপসারণের দাবিতে তার বাসভবনের সামনে অবস্থান করেছেন তখন ছাত্রলীগকে দিয়ে আন্দোলনকারীদের মারধর করেছেন। এই অবস্থার পর অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে থাকতে পারেন না পাশাপাশি শিক্ষক হিসেবে পাঠদান করার অধিকার হারিয়েছেন।

সংহতি সমাবেশে অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘বর্তমানে এ বিশ^বিদ্যালয়ে সরকার নিয়োগকৃত ভিসি এবং সরকারি ছাত্র সংগঠনের মাধ্যমে দুর্নীতি প্রকাশিত হয়েছে। এতোদিন ধরে আন্দোলন চলে, অথচ সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয় নি; তদন্ত কমিটি গঠন করেনি। আমাদের দাবি থাকবে আজকের মধ্যেই এ সমস্যা সমাধানে সরকার সিদ্ধান্ত নিবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ প্রক্রিয়া এখনও সম্পূর্ণ সরকারের নিয়ন্ত্রণে। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, ছাত্রলীগ, সরকারী দলের রিপোর্টের ভিত্তিতে উপাচার্য নিয়োগ হয়ে থাকে। আমরা দেখতে পাচ্ছি বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্যদের বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ। বিশ^বিদ্যালয়ের হলে হলে যাদের নির্যাতন চলে তাদের পৃষ্ঠপোষোকতায় ভিসি টিকে আছে।’
আন্দোলনের জন্য উপাচার্যকে দায়ী করে তিনি বলেন, ‘ভিসির যে অপরিকল্পনা, অসচ্ছতা ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা না নিয়ে নিজেই আন্দোলনকে ভিসি পরিবর্তনের আন্দোলনে পরিণত করেছেন।’ এসময় তিনি উপাচার্যকে অপসারণের পাশাপাশি দুর্নীতির তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদেরকে যথাযথ বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।
সংহতি সমাবেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর তপন কুমার সাহা বলেন, ‘চার বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের দায়িত্ব পালন করেছি; কিন্তু কখনো তো বিশেষ ছাত্র সংগঠনকে নামানোর প্রয়োজন হয়নি! এখন কেন হলো? ’
তিনি বলেন, শিক্ষক- শিক্ষার্থীরা লাঞ্ছিত হওয়ার পর উপাচার্য এটিকে ‘গণঅভ্যুত্থান’ বলেছেন। এটি আসলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং শিক্ষক হিসেবে দুর্ভাগ্য। জাহাঙ্গীরনগরকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমার- আপনার সকলের। অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের বিরুদ্ধে শুধু তদন্ত না বরং তাকে বিচারের মুখোমুখি হতেই হবে।’
শিক্ষার্থী তাপসী প্রাপ্তি দে বলেন, ‘গতকাল শিক্ষার্থীরা যাতে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে না পারে সেজন্য হল তালা মেরে বন্ধ করে রাখা হয়েছিলো। আমরা এই আচরণের তীব্র নিন্দা জানাই। অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম কোন ভাবেই শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না।’

আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করে সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক তানজীম উদ্দিন খান, অধ্যাপক রায়হান রাইন, অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস, অধ্যাপক মির্জা তাসলিমা সুলতানা, অধ্যাপক কামরুল আহসান, অধ্যাপক আনোয়ারুল্লাহ ভুঁইয়া, অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক, অধ্যাপক খবির উদ্দিন, অধ্যাপক কবিরুল বাশার, অধ্যাপক শরমিন্দ নীলোর্মি, ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক অনিক রায়, ছাত্রফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন প্রিন্সসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
হল ছাড়ার নির্দেশ: চলমান উপাচার্য অপসারণ আন্দোলনে বিশ^বিদ্যালয়ে বিশৃঙ্খল অবস্থা এড়াতে অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করে শিক্ষার্থীদের মঙ্গলবার বিকেল পাঁচটার মধ্যে হল ছাড়ার নির্দেশ দেয়া হয় । যদি ও অধিকাংশ শিক্ষার্থীকেই হল এ অবস্থান করতে দেখা যায়।  এরমধ্যেই পুনরায় শিক্ষার্থীদের বুধবার বেলা সাড়ে তিনটার মধ্যে হল ছাড়ার বিষয়ে কঠোর নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন। এই সময়ের মধ্যে হল না ছাড়লে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ার করা হয়েছে। বুধবার দুইটার দিকে হল প্রভোস্ট কমিটির বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি অধ্যাপক বশির আহমেদ এই তথ্য জানান।  খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিভিন্ন হলের প্রভোস্ট আবাসিক শিক্ষার্থীদের রুমে রুমে গিয়ে হল ছাড়ার জন্য হুমকি দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। প্রভোস্ট কমিটির  বৈঠকে হল ও হল সংলগ্ন সকল খাবারের দোকান পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এদিকে প্রশাসনের হুশিয়ারি উপেক্ষা করে এখনো হলে অবস্থান করছেন শিক্ষার্থীরা। তবে বেশ কয়েকটি হল ঘুরে দেখা গেছে, আতঙ্কের কারণে রাত বাড়ার সাথে সাথে হলে অবস্থানকারী শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমতে শুরু করেছে। অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা হল না ছাড়ার বিষয়ে অনড় রয়েছে।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here