সব দোষ পেঁয়াজের : আমদানিতে সুখবর নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক: ঢাকায় বাজারে বৃহস্পতিবার সকালের দিকে পেঁয়াজের দাম ছিল কেজি প্রতি ১৯০ টাকার মতো। পারদ গরম দিলে যেমন এর তাপ বাড়ে সে রকমভাবেই দিনভর একটু একটু করে পেঁয়াজের দাম বেড়ে দিন শেষে ২২০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। বিক্রেতারা সরাসরি বলছেন, কাল এই দাম আরও বাড়বে। ঢাকার সুপারশপগুলোতেও ইতিমধ্যেই দু’শর উপরে দাম নেয়া হচ্ছে। সেপ্টেম্বর থেকে ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ রাখার পর থেকে সরকার বেশ কিছু উদ্যোগের কথা বললেও এর দাম কিছুতেই পড়ছে না। আমদানি থেকে শুরু করে বেচা-কেনার কয়েক ধাপে কথা বলে বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে কী বিষয় দাম না কমার পেছনে কাজ করছে।
লাগাম ছাড়াই চলছে পেঁয়াজের দাম। কোনো ভাবেই কমছে না। দেশিয় পেঁয়াজের সঙ্গে মিয়ানমার সহ কয়েকটি দেশ থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ বাজারে আসলেও দাম নিয়ন্ত্রণে গতকাল শুক্রবার সকাল পর্যন্তও কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যটি আমদানিতেও সুখবর পাচ্ছেন না ব্যবসায়িরা। ফলে ভারতের পেঁয়াজ ছাড়াই দেশের উৎপাদিত ও যৎ সামান্য আমদানি পেঁয়াজেই ভোক্তাদের চাহিদা মেটাতে হচ্ছে কম-বেশি। আর এসব কারণে দামের অস্থিরতা নিয়েই পেঁয়াজ কিনতে হচ্ছে তাদের। অভ্যন্তরীণ সংকট দেখিয়ে গত ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয় ভারত সরকার। এরপর থেকে বাড়তে থাকে ভারতীয় পেঁয়াজের পাশাপাশি দেশিয় পেঁয়াজের দামও। গতকাল পর্যন্ত গত দেড় মাসের ব্যবধানে কেজিতে ১৪০ টাকা করে বেড়েছে। বর্তমানে  পেঁয়াজ প্রতি কেজি প্রকার ভেদে বিক্রি হচ্ছে ১৮০-২২০ টাকায়। আর পাতাসহ দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৮০-১০০ টাকার মধ্যে। শুধু মিয়ানমার থেকে যৎ সামান্য পেঁয়াজ আমদানি করে বাজার সামাল দেওয়া কোনো ভাবেই সম্ভব নয়। বলা যায় পেঁয়াজের বাজার এখন পাগলা ঘোড়া হয়ে গেছে। এখনই লাগাম ধরে না টানলে সামনে আরও খারাপ হতে পারে? গতকাল শুক্রবার হিলি বাজারে ভারতীয় পেঁয়াজ প্রতি কেজি ১৮০-২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মিয়ানমারের পেঁয়াজের দাম একই। আর পাতাসহ দেশিয় পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৮০-১০০ টাকায়। প্রতিদিনই যেভাবে পেঁয়াজের দাম বাড়ছে, তাতে তরকারিতে আর পেঁয়াজ দিয়ে খেতে হবে না। এখনই সরকারকে দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।
বিদেশ থেকে নাকি পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে। তাহলে কেন এই দাম কমছে না? নিশ্চয়ই কোনো সিন্ডিকেট রয়েছে, যারা এই পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে আর দাম বাড়াচ্ছে। খুব তাড়াতাড়ি পেঁয়াজের দাম ক্রেতাদের নিয়ন্ত্রণে আনা দরকার।
দাম কেন বেড়েছে জানতে চাইলে বিক্রেতা জানান, বাজারে ভারতীয় পেঁয়াজ নেই। দেশি পেঁয়াজের মজুতও প্রায় শেষ। তার ওপর ঘূর্ণিঝড়ে পেঁয়াজ পরিবহনে বিঘœ ঘটায় বাজারে সরবরাহ কমে গেছে। তাই দাম বেড়েছে।কাওরানবাজারের পাইকারি বিক্রেতা মো. হান্নান বলেন, ‘চাহিদার বিপরীতে যোগান একদম কম। দেশি পেঁয়াজ এখনো ওঠেনি। ভারতীয় পেঁয়াজের আমদানি নেই। তাই বাজারে পেঁয়াজের দাম এত বেশি।
ভারত থেকে আমদানি বন্ধই কী একমাত্র কারণ?
পেঁয়াজের ব্যবসায়ীদের একটি সমিতি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছে, পেঁয়াজের চাহিদার ৬০% মেটানো হয় দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজ থেকে। বাকি ৪০% আমদানি করা হয়। আর ভারত থেকেই সিংহভাগ আমদানি করা হয়। বাংলাদেশে পেঁয়াজের বাজার অনেকটাই ভারতের ওপর নির্ভরশীল। এই মুহূর্তে ভারত বাংলাদেশকে পেঁয়াজ দেবে না। সে কারণে এই অবস্থা। সহসা দাম কমার কোন সম্ভাবনা নেই। ভারত-কেন্দ্রিক আমদানি যারা করেন তারা অন্য কোন জায়গা থেকে পেঁয়াজ আনার ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না।  স¤প্রতি মিশর, পাকিস্তান, চীন, মিয়ানমার, তুরস্কসহ বেশ কটি দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই কয়েকটি দেশ থেকে কিছু পেঁয়াজ এসেছেও।
“ভারত থেকে পেঁয়াজ আনতে যত কম খরচ অন্য যায়গা থেকে আনতে গেলে জাহাজে অনেক বেশি খরচ। মিশর বা পাকিস্তান থেকে আনলে দামে কুলাচ্ছে না।” “ভারতে দাম দেয়ার পর বাংলাদেশের ভেতর পর্যন্ত সেটি আনতে খরচ কেজি প্রতি সর্বোচ্চ আড়াই টাকা। কিন্তু মিশর থেকে আনতে পরবে বিশ থেকে পঁচিশ টাকা।”ঢাকায় মশলা জাতীয় পণ্যের প্রধান আড়ত সদরঘাটের কাছে শ্যামবাজারে। আমাদানিকারকদের কাছ থেকে আনা পেঁয়াজ এখান থেকে ঢাকার বিভিন্ন বড় বাজারে যায়।বিভিন্ন বড় আমদানিকারক ভারত ছাড়া অন্য যায়গা থেকে পেঁয়াজ আমদানি করার জন্য এলসি খুলেছে। এলসি খোলা, ওসব দেশে ব্যবসায়ীদের সাথে যোগাযোগ করা, তারপর জাহাজে করে আনা এসবতো সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। আরও দিন পনেরো সময় লাগবে আসতে। এখন দেশে পেঁয়াজ কম।” ভারত ছাড়া অন্য দেশগুলো থেকে যতটুকু এসেছে তা যথেষ্ট নয়।
মুনাফার লোভে বাজার নিয়ন্ত্রণ?
শ্যামবাজারের কমিশনিং এজেন্টরা যাদের কাছে আমদানিকারকদের পণ্য বিক্রি করে কমিশন পান তারা হলেন আড়তদার।  কাওরানবাজার কাঁচামাল ক্ষুদ্র আড়তদার ব্যবসায়ী সমিতির প্রেসিডেন্ট ওমর ফারুক অভিযোগ করছেন, ইচ্ছা করে বাজারে কম পেঁয়াজ ছাড়া হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করছেন, “কিছু ব্যক্তি বিশেষে পেঁয়াজ আমদানি করতে দেয়া হয়েছে। ওনারা লাভ না করা পর্যন্ত পেঁয়াজ ছাড়বে না। একধরনের সিন্ডিকেট-বাজি হচ্ছে।”তিনি আরও বলছেন, “সেপ্টেম্বর মাস থেকে এখন নভেম্বরের মাঝামাঝি। আমদানিকারক ছাড়াও সরকার যদি নিজের উদ্যোগে এতদিন ব্যবস্থা নিতো আর সাথে বেসরকারিভাবে একসাথে কাজ হতো তাহলে এই অবস্থা হতো না।”তিনি বলছেন, মিয়ানমার ও চীন থেকে আনা কিছু পেঁয়াজ তারা পাচ্ছেন কিন্তু তা চাহিদার তুলনায় অনেক কম।এছাড়া নতুন মৌসুমের দেশি পেঁয়াজ এখনো বাজারে আসতে শুরু করেনি। গত বছরের যে উৎপাদন সেটিই এই মৌসুমে বিক্রি হয়।সেটি পরিমাণে কমে গেছে। অন্যদিকে তারও মজুদ রেখে বেশি মুনাফা করার চেষ্টা চলছে বলে মি. ফারুক অভিযোগ করছেন।এছাড়া দেশি পেঁয়াজ স্থানীয় পর্যায়েই বেশি দামে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। নতুন পেঁয়াজ আসতে আরও একমাস সময় লাগবে।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here