রোহিঙ্গা গণহত্যা: তদন্তের অনুমতি দিলো আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত

নিউজ ডেস্ক: রাখাইনের গ্রামগুলো যে জ্বলছে তা বাংলাদেশ মিয়ানমারের সীমান্ত থেকে স্পষ্ট দেখা গেছে। দুই দেশের সীমান্তবর্তী নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান করছে রোহিঙ্গা মুসলিমরা। ৪ঠা সেপ্টেম্বর, ২০১৭ সালে উখিয়া এলাকার ছবি। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে এই তদন্ত বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের পরিস্থিতি বলে গণ্য হবে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার পরিস্থিতি আইসিসির এখতিয়ারের আওতায় কথিত অভিযোগসমূহ তদন্তে এগিয়ে যেতে প্রসিকিউটরকে অনুমতি দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারকরা। আইসিসির প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে চলতি বছর জুলাইয়ে মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংগঠিত অপরাধের বিষয়ে আইসিসির এখতিয়ারের মধ্যে থেকে প্রসিকিউটর তদন্ত শুরুর জন্য যে আবেদন করেছিলেন সেটিই অনুমোদন করছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রি ট্রায়াল চেম্বার-৩।
চেম্বার ঘটনার শিকার অসংখ্য মানুষের পক্ষ থেকে আসা অভিযোগ সমূহের বিষয়ে মতামত পেয়েছে বলেও এতে উল্লেখ করা হয়েছে। আইসিসির রেজিস্ট্রি অনুযায়ী নির্যাতনের শিকার হওয়া বিভিন্ন ব্যক্তি সর্বসম্মতভাবে তদন্ত শুরু করার দাবি করেছেন। “এবং তাদের অনেকের মতামত অনুযায়ী একমাত্র বিচার ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা গেলেই এই ধরনের সহিংসতা ও নির্যাতনের অবসান হতে পারে। চেম্বারের বক্তব্য হলো যে আদালত সদস্য দেশের ভূখÐে কোনো অপরাধ মূলক কর্মকাÐের অংশ হিসেবে হওয়া অপরাধ এখতিয়ার ভুক্ত হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। যদিও মিয়ানমার সদস্য দেশ নয়, তবে বাংলাদেশ আইসিসি রোম সনদ ২০১০ সালে অনুস্বাক্ষর করেছে। আর প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা করে আদালত মনে করেছে যে এটা বিশ্বাস করার কারণ আছে যে ব্যাপক ভিত্তিক বা সিস্টেমেটিক সহিংসতা হয়েছে যার কারণে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জোরপূর্বক দেশত্যাগের মতো ঘটনা মানবতা বিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
আদালত মনে করে এখতিয়ারে নেয়ার মতো অন্য অপরাধ হয়েছে কিনা তা আর পর্যালোচনার প্রয়োজন নেই যদিও এ ধরণের কথিত অপরাধ ভবিষ্যতে কৌসুলিদের তদন্তের অংশ হতে পারে”।প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয় কথিত অপরাধের যেখানে বহু মানুষ ঘটনার শিকার তার ভয়াবহতা বিবেচনায় নিয়ে চেম্বার মনে করে পরিস্থিতি ভয়াবহ পর্যায়ে উপনীত হয়েছে।তথ্য প্রমাণ অনুযায়ী প্রায় ছয় লাখ থেকে দশ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম মিয়ানমার থেকে বাস্তুহারা হয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশে গেছে এমন জবরদস্তিমূলক কার্যক্রমের কারণেই।এর ধারাবাহিকতায় এমন অপরাধ বা ভবিষ্যতেও হতে পারে এমন অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আদালত তদন্ত শুরুর অনুমতি দিয়েছ।এক্ষেত্রে দেখা হবে সেটি আদালতের এখতিয়ার ভুক্ত কিনা বা অন্তত এটি বাংলাদেশের ভূখÐের কোথাও সংশ্লিষ্ট কিনা বা অন্য সদস্য দেশের ভূখÐের মধ্যে কিনা বা এটা বাংলাদেশ রোম সনদে স্বাক্ষরের পর হয়েছে কিনা। কৌঁসুলির অফিস এখন নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে, স্বাধীন এবং নিরপেক্ষভাবে তথ্য প্রমাণ সংগ্রহের কাজ শুরু করবে। প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহের জন্য এই তদন্ত দল যতদিন প্রয়োজন সময় নিতে পারবে।
আইসিসি বলছে যদি কোন ব্যক্তির সম্পৃক্ততার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণাদি সংগ্রহ হয়, তাহলে তদন্ত কৌসুলি প্রি-ট্রায়াল চেম্বার তিন এর বিচারকের কাছে ঐ ব্যক্তির নামে আদালতে হাজির হবার জন্য সমন জারি করা অথবা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করতে পারবেন।চেম্বার বিচারকের ইস্যুকৃত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা যাবে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের কাছে।রোম সনদের নীতিমালা অনুযায়ী ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই আদালত বিচারের মাধ্যমে যে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনকে দোষী সাব্যস্ত করতে পারে।এমনকি গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করতে পারে সংস্থাটি।
তবে এর নিজস্ব কোনো বাহিনী না থাকায় অভিযুক্তদের আটক বা গ্রেপ্তার করতে বা দÐ কার্যকর করতে পারে না।
এ জন্য তারা সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র ও অন্যান্য রাষ্ট্রকে অভিযুক্তকে গ্রেফতারের আহŸান জানায়।এর আগে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মানবতা বিরোধী অপরাধের দায়ে মিয়ানমারের বিচারের এখতিয়ার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের আছে বলে সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর প্রাথমিক তথ্য প্রমাণ সংগ্রহের কাজ শুরু হয়েছিলো।এ বছরের মার্চে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রধান প্রসিকিউটর ফাতো বেনসুদা, স্ব-উদ্যোগে মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেন।এরপর জুলাই মাসের চার তারিখে রোহিঙ্গাদের ওপর যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়েছে কিনা তা নিয়ে তদন্ত শুরু করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত আইসিসির অনুমতি চান প্রসিকিউটর ফাতো বেনসুদা।জুলাই মাসে তার তদন্ত দল বাংলাদেশে এসে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কাছ থেকে ব্যাপক তথ্য সংগ্রহ করে।এরপর প্রাথমিক তদন্ত শেষে পূর্ণ তদন্তের জন্য আবেদন করেন ফাতো বেনসুদা যাতে সায় দিলো আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারকরা।ফলে এই প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গা মুসলিমদের নিপীড়নের ঘটনায় কোনো আন্তর্জাতিক আদালতে তদন্ত হতে যাচ্ছে।
যদিও শুরু থেকেই অনেকে এ প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।কারণ মিয়ানমার আইসিসির সদস্য রাষ্ট্র নয়। একই ভাবে আইসিসির প্রতিনিধি দলকেও রাখাইনে পরিদর্শনে যাবার অনুমতিও দেয়া হয়নি।এদিকে, আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরুর অনুমোদন পাবার পর আইসিসির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন প্রসিকিউটর বেনসুদা।এক বিৃবতিতে তিনি জানিয়েছেন, মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের কাছে আইসিসির এ সিদ্ধান্ত একটি ইতিবাচক বার্তা দেবে।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here