হলি আর্টিজানে হামলা : ৭ আসামির মৃত্যুদন্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক : গুলশানে হলি আর্টিজান ক্যাফেতে বহুল আলোচিত জঙ্গি হামলা মামলার রায়ে সাতজনের মৃত্যুদন্ড দিয়েছে আদালত। গতকাল ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান এ রায় ঘোষণা করেন। একইসঙ্গে মৃত্যুদÐপ্রাপ্তদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা ও বড় মিজান নামে অভিযুক্ত একজনকে খালাসের আদেশও দিয়েছে আদালত। মৃত্যুদÐপ্রাপ্তরা হলেন-জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজিব গান্ধি, মাহমুদুল হাসান মিজান, সোহেল মাহফুজ, রাশিদুল ইসলাম ওরফে রায়াশ, হাদিছুর রহমান সাগর, মামুনুর রশিদ রিপন ও শরিফুল ইসলাম খালেদ। রায় শুনে আসামিদের কারও চেহারাতেই অনুশোচনার কোনো চিহ্ন দেখা যায়নি। তারা উচ্চস্বরে বলতে থাকেন, “আল্লাহু আকবর, আমরা কোনো অন্যায় করিনি।” অপরাধে সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত না হওয়ায় এ মামলায় বিচারের মুখোমুখি করা আরেক আসামি মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজানকে খালাস দেওয়া হয়েছে রায়ে। তাকে রায় শুনে উচ্ছ¡াস প্রকাশ করতে দেখা যায়। চাঞ্চল্যকর এ মামলায় পুলিশ আট অভিযুক্ত জঙ্গির বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের ২৩ জুলাই অভিযোগপত্র জমা দেয়। একই বছরের ২৬ নভেম্বর অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল।
গত বছরের ৩ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী রিপন কুমার দাসের ট্রাইব্যুনালের সামনে জবানবন্দি দেয়ার মাধ্যমে এ চাঞ্চল্যকর মামলার আনুষ্ঠানিক বিচারকাজ শুরু হয়। ২০১৬ সালের ১ জুলাই ওই ক্যাফেতে সশস্ত্র জঙ্গিরা হামলা চালিয়ে ১৭ বিদেশিসহ ২২ জনকে হত্যা করে। তাদের মধ্যে ইতালির নয়, জাপানের সাত, ভারতের এক, বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত আমেরিকান এক, বাংলাদেশি দুজন নাগরিক এবং দুজন পুলিশ সদস্যও নিহত হন। হামলার পর জিম্মি অবস্থার অবসানে সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযানে নিহত হয়েছিলেন পাঁচ জঙ্গি। তারা হলেন- মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ ওরফে মামুন, নিবরাস ইসলাম, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম উজ্জল। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের সময় নিহত হয়েছেন নব্য জেএমবির আরও ৮ সদস্য। তাদের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবুল হাসনাত রেজা করিমও অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পান।
ওই ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গুলশান থানায় একটি মামলা করেন ওই থানার উপপরিদর্শক রিপন কুমার দাস। পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের পরিদর্শক হুমায়ুন কবির মামলাটি তদন্ত করে ২০১৮ সালের ১ জুলাই আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। একই বছরের ২৬ নভেম্বর অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান। এক বছরের বিচারকালে মামলার মোট ২১১ জন সাক্ষীর ১১৩ জন আদালতে সাক্ষ্য দেন। এরপর আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন এবং রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের মাধ্যমে গত ১৭ নভেম্বর এ মামলার বিচারকাজ শেষ হয়। ওইদিনই আদালত রায় ঘোষণার জন্য ২৭ নভেম্বর দিন ধার্য করেন।
আসামী রাকিবুল ইসলাম রিগ্যান ওরফে রাফিউল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে নিষিদ্ধ সত্তার সদস্য পদ গ্রহণ, সমর্থন, অর্থ গ্রহণ, হামলায় জড়িতদের প্রশিক্ষণ দিয়ে হত্যাকাÐে সহায়তা ও প্ররোচিত করা। হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলাকারী জঙ্গিদের প্রশিক্ষক। বসুন্ধরার যে বাসা থেকে হামলাকারীরা হোলি আর্টিজানের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছিলেন, সে বাসায় যাতায়াত ছিল। ২০১৪ সালে বগুড়া আজিজুল হক কলেজে পড়ার সময় জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হন। পরের বছর ঢাকায় চলে আসেন। মোট ছয়টি বাসায় ছিলেন। ২৭ জুলাই কল্যাণপুরের জাহাজ বিল্ডিংয়ে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের অভিযানে গুরুতর আহত অবস্থায় গ্রেপ্তার হন। দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দি অনুযায়ী গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারির হামলা ছিল প্রকৃত ইসলাম কায়েমের একটি দৃষ্টান্ত।
রাজীব গান্ধী ওরফে জাহাঙ্গীর আলম এর বিরুদ্ধে অভিযোগ, নিষিদ্ধ সত্তার সদস্য পদ গ্রহণ, সমর্থন, অর্থ গ্রহণ, পরিকল্পনা হামলায় জড়িতদের সহায়তা, ঘটনাস্থল রেকি, সার্বিক বিষয়ে অবগত থেকে হত্যাকাÐে সহায়তা সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালে রাজীব গান্ধী ওরফে জাহাঙ্গীর আলম হোলি আর্টিজানে হামলাকারী খায়রুল ইসলাম পায়েল ওরফে, শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বলকে সরবরাহের কথা স্বীকার করেছেন। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছেন, তিনি নব্য জেএমবির উত্তরবঙ্গের ‘ইসাফা’ গ্রæপের প্রধান। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৪টি জেলায় একযোগে বোমা বিস্ফোরণের পর সক্রিয়ভাবে জেএমবিতে যুক্ত হন। ২০১৬ সালের ফেব্রæয়ারি মাসের শেষ দিকে গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা থানাধীন বোনারপাড়ার একটি বাসায় তামিম চৌধুরী, মেজর জাহিদ, সারোয়ার জাহান মানিক, তারেক, মারজান, শরিফুল ইসলাম খালিদসহ তিনি আত্মঘাতী হামলার পরিকল্পনা করেন। ওই পরিকল্পনা বৈঠকেই সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়া হয় তামিম চৌধুরী ওরফে তালহাকে। হোলি আর্টিজানে হামলাকারী সরবরাহ করেছেন।
মোহাম্মদ আসলাম হোসেন ওরফে র‌্যাশ এর বিরুদ্ধে অভিযোগ : নিষিদ্ধ সত্তার সদস্য পদ গ্রহণ, সমর্থন, অর্থ লেনদেন, হামলাকারীদের তুলে নিয়ে প্রশিক্ষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া ও বোমা ছোড়ার প্রশিক্ষণ দেওয়া, ঘটনাস্থল রেকি করা, অস্ত্র বহন করে নিয়ে আসা। মোটের ওপর হামলার পরিকল্পনায় অংশ নিয়ে হত্যাকাÐে সহায়তা ও প্ররোচনা দেওয়া হোলি আর্টিজানে হামলার পরিকল্পনায় যুক্ত থাকার কথা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন। ২০১৪ সালের ১ রমজান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র শরিফুল ইসলাম খালেদের হাতে হাত রেখে বায়াত নেন। ২০১৫ সালের ফেব্রæয়ারিতে তামিম চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর নব্য জেএমবিতে যোগদান। হামলাকারীদের ঢাকার বিভিন্ন জায়গা থেকে তুলে নিয়ে প্রশিক্ষণের জন্য পৌঁছে দেন। তাঁদের প্রস্তুত করে অস্ত্র, গুলি ও ম্যাগাজিন সরবরাহ করেন। হোলি আর্টিজান বেকারি রেকি করেন। বসুন্ধরায় হামলাকারীদের অবস্থানের জন্য বাসা ভাড়ার সন্ধান করেন।
আবদুস সবুর খান ওরফে সোহেল মাহফুজ শুরা সদস্য হয়ে টাকা গ্রহণ, অস্ত্র ও বিস্ফোরক পদার্থ সংগ্রহ, তৈরি ও সরবরাহ করে হোলি আর্টিজান বেকারির হত্যাকাÐে সহায়তা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছেন, জেএমবিতে যুক্ত ২০০২ সাল থেকে। সিদ্দিকুর রহমান ওরফে বাংলা ভাইয়ের সহযোগী ছিলেন। নওগাঁর আত্রাইতে বোমা বানানোর সময় হাত উড়ে যায়। তাঁর সরবরাহকৃত অস্ত্র ও গ্রেনেড গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারির হামলায় ব্যবহার হয়েছিল। ২০১৬ সালের মে মাসে নব্য জেএমবিতে যোগ দেন। মিরপুরের একটি বাসায় তামিম চৌধুরী ও বাশারুজ্জামান চকলেটের সঙ্গে সাক্ষাৎ। সেখানেই গুলশানে বড় হামলার পরিকল্পনা। এ জন্য লোক সংগ্রহ, অস্ত্র ও গ্রেনেড সরবরাহের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ছোট মিজান ও আসলামকে অস্ত্র বুঝিয়ে দেন।
মোহাম্মদ হাদিসুর রহমান সাগর ওরফে সাগর এর বিরুদ্ধে অভিযোগ : নিষিদ্ধ সত্তার সমর্থন, সদস্য পদ গ্রহণ, অর্থ গ্রহণ, হামলার জন্য অস্ত্র গ্রেনেড সরবরাহ করে হত্যাকাÐে সহায়তা ও প্ররোচিত করা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছেন, ঝিনাইদহে অবস্থানের সময় হোলি আর্টিজানে হামলায় প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী নিবরাস ও মোবাশ্বেরের সঙ্গে সাংগঠনিক কাজে যুক্ত ছিলেন। ঢাকার ক‚টনৈতিক পাড়ায় হামলা ও প্রস্তুতি হিসেবে টার্গেট কিলিং সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। হোলি আর্টিজানে হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্র নিজেদের জিম্মায় রেখেছিলেন। হোলি আর্টিজানে হামলার ২০–২২ দিন আগে তামীম আহমেদ চৌধুরীর নির্দেশে একটি কালো ব্যাগে করে হাদিসুর চারটি গ্রেনেড ঝিনাইদহ থকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। ওই গ্রেনেড হোলি আর্টিজান বেকারির হামলায় ব্যবহৃত হয়েছিল।
মামুনুর রশিদ রিপন এর বিরুদ্ধে অভিযোগ : জেএমবির দায়িত্বশীল নেতাদের মৃত্যুদÐ কার্যকরের পর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। সারোয়ার জাহান, ডাক্তার নজরুল ও অন্যদের নিয়ে অঞ্চলভিত্তিক উদ্বুদ্ধকরণ মিটিং ও সদস্য সংগ্রহের কাজ অব্যাহত রাখেন। তামিম আহমেদ চৌধুরী ও সারোয়ার জাহানদের সঙ্গে মিলে আইএসপন্থী নব্য জেএমবি গঠনে যুক্ত ছিলেন। ২০১৪ সালের মে মাসে জয়পুরহাটে বৈঠক করে আইএস ভাবাদর্শ অনুসারে কাজের সিদ্ধান্ত নেন। ২০১৬ সালের ফেব্রæয়ারি মাসের শেষের দিকে গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়া বাজার কলেজ মোড়সংলগ্ন একটি বাড়িতে সারোয়ার জাহান মানিক, নুরুল ইসলাম মারজান, আসলাম হোসেন ওরফে র‌্যাশ, বাশারুজ্জামান চকলেট, মেজর (অব) জাহিদ, রাজীব গান্ধী, শরিফুল ইসলাম খালেদ, রায়হানুল কবির রায়হানদের সঙ্গে বৈঠক। ওই বৈঠকেই ঢাকার হোলি আর্টিজানে হামলার প্রাথমিক পরিকল্পনা হয়ে যায়। হাদিসুর রহমান সাগরের সঙ্গে তিনটি একে-২২ রাইফেল, গুলি, চারটি গ্রেনেড, দুটি ৭.৬২ পিস্তল ও ১২ রাউন্ড গুলি মারজানের মাধ্যমে তামিম আহমেদ চৌধুরীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।
শরিফুল ইসলাম খালেদ এর কাজ ছিল সদস্য পদ গ্রহণ, সমর্থন, অর্থ লেনদেন, প্রশিক্ষণে সহায়তা, হামলা পরিকল্পনায় অংশ নিয়ে হামলাকারীদের যথাস্থানে পৌঁছে দেওয়াসহ হত্যাকাÐে সহায়তা ও প্ররোচিত করা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী। অধ্যাপক এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকী হত্যা মামলার মৃত্যুদÐপ্রাপ্ত আসামি। ২০১৬ সালের ২৩ এপ্রিল নিজ বিভাগের অধ্যাপককে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করেন। ২০১৬ সালের ফেব্রæয়ারিতে গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়া বাজার কলেজ মোড়ে হামলার পরিকল্পনা বৈঠকে হাজির ছিলেন। হামলাকারী জঙ্গিদের দলে অন্তর্ভুক্তিকরণ, প্রশিক্ষণসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। এই মামলায় মোট আসামি ছিলেন আটজন। এর মধ্যে মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান খালাস পেয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল নিষিদ্ধ সত্তার সদস্য পদ গ্রহণ, বিস্ফোরক পদার্থ (জেল জাতীয় পদার্থ), যা বোমা তৈরির উপাদান সরবরাহ করে হত্যাকাÐে সমর্থন দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে মিজান বলেছিলেন, তিনি মাছ ব্যবসায়ী। ২০১৬ সালের মার্চ মাসের শেষের দিকে জামাল নামের এক ব্যক্তি তাঁর জিম্মায় বড় ব্যাগ রেখে যায়। ওই ব্যাগে জেল বোমা ছিল বলে পরে জানতে পেরেছেন।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here