ইউনিসেফের প্রতিবেদন : বাংলাদেশে নিউমোনিয়ায় প্রতিদিন ৩০ শিশুর মৃত্যু, চিকিৎসকের প্রতিক্রিয়া

নিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গড়ে প্রতিদিন মারা যায় ৩০টি শিশু। এ দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুমৃত্যুর অন্যতম কারণ হচ্ছে এই ব্যাকটেরিয়াজনিত অসুখ নিউমোনিয়া। জাতিসংঘের শিশু সংস্থা ইউনিসেফ প্রকাশিত ‘ফাইটিং ফর ব্রেথ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। ইউনিসেফের সদ্য প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ২০১৮ সালে মৃত্যুবরণকারী শিশুদের ১৩ শতাংশই মারা গেছে নিউমোনিয়ায়। গতবছর নিউমোনিয়ায় মারা গেছে ১২ হাজারেরও বেশি শিশু। ইউনিসেফের প্রতিবেদন মতে, দেশের চর ও হাওরাঞ্চল বা পাহাড়ি এলাকায় যেখানে হাতের নাগালে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র নেই বা স্বাস্থ্যসেবা সহজে মেলে না, সেসব এলাকায় শিশুরা বেশি ভুগছে।
অপুষ্টি এবং পরিবেশগত কারণ ছাড়াও এখন অ্যান্টিবায়েটিককের অধিক ব্যবহারের কারণে ওষুধের কার্যকরিতা হ্রাস পাবার ফলে ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ নিউমোনিয়ায় শিশু বেশী মারা যাচ্ছে। মায়েরা সহজেই বুঝতে পারবেন, জ্বর ও কাশি থাকবে, বাচ্চাদের শ্বাসকষ্ট হবে, শিশুর বুক আর পেটের অংশ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বা দ্রæত ওঠা-নামা করছে, এ সময় শিশু খাওয়া-দাওয়া করবে না, কান্নাকাটি করবে বা নিস্তেজ হয়ে থাকবে- এসব লক্ষণ দেখা গেলে শিশুকে দ্রæত হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিতে হবে। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত টিকা নেয়া, ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো, পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাসহ কিছু সচেতনতামূলক পদক্ষেপের মাধ্যমেই নিউমোনিয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে শিশুর পুষ্টির অবস্থা খারাপ বা অপুষ্ট শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে, তারা সহজেই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। সর্দি-কাশির জীবাণু পরিবেশে থাকে। বর্তমানে যে ঠান্ডা ও শুষ্ক আবহাওয়া বিরাজ করছে, সেটা শিশুদের সর্দিকাশিতে আক্রান্ত হবার জন্য বিশেষ সহায়ক। সর্দিকাশি হওয়া মানে ইনফেকশন হওয়া। আর এই ইনফেকশনের চিকিৎসা না নিলে ইনফেকশন বেড়ে গিয়ে নিউমোনিয়া হয়।
পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মুজাহেরুল হক গণমাধ্যমকে বলেছেন, যে সমস্ত জীবাণুর মাধ্যমে নিউমোনিয়া হয়, তার সবগুলোই আমাদের পরিবেশে আছে। বিশেষ করে শহরের বস্তি কিংবা গ্রামের গরিব জনগোষ্ঠীর মধ্যে দূষণের মাত্রাটা বেশি থাকে। সে কারণে তাদের বাচ্চাদের বেশি নিউমোনিয়া হয়। তারা প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা নেয় না। অবহেলা করে এবং আলটিমেটলি নিউমোনিয়া যখন মারাত্মক আকার ধারণ করে, তখন শিশু মারা যায়। তবে সচেতন হলে নিউমোনিয়া সহজে ভালো করা সম্ভব।
ইউনিসেফের প্রতিবেদনে নিউমোনিয়ায় শিশুমৃত্যুর বৈশ্বিক চিত্রে বলা হয়েছে, গত বছর বিশ্বব্যাপী পাঁচ বছরের কম বয়সি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশু মারা গেছে ৮ লাখেরও বেশি। অর্থাৎ বিশ্বে প্রতি ৩৯ সেকেন্ডে একটি করে শিশুর এ রোগের কারণে মৃত্যু ঘটছে। এ ৮ লাখের মধ্যে যেসব শিশুর বয়স দুই বছরের কম, তাদের মধ্যে বেশির ভাগেরই মৃত্যু ঘটেছে বয়স এক মাস অতিবাহিত হওয়ার আগেই। প্রতিবেদনে জানানো হয়, বিশ্বব্যাপী নিউমোনিয়ায় মৃত শিশুদের অর্ধেকেরও বেশি মাত্র পাঁচ দেশের। দেশগুলো হলো নাইজেরিয়া, ভারত, পাকিস্তান, কঙ্গো ও ইথিওপিয়া। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মারা যাচ্ছে নাইজেরিয়ায়। দেশটিতে গত বছর ১ লাখ ৬২ হাজার শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ভারতে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশু মারা গেছে ১ লাখ ২৭ হাজার। তৃতীয় পাকিস্তানে গত বছর নিউমোনিয়ায় শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ৫৮ হাজার। এছাড়া কঙ্গোয় ৪০ হাজার ও ইথিওপিয়ায় ৩২ হাজার শিশু এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। প্রতিবেদনে ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক হেনরিয়েটা ফোর বলেন, যেখানে শিশুরা আছে সেখানে কেবলমাত্র সাশ্রয়ী সুরক্ষা ও প্রতিরোধমূলক সতর্কতা এবং আক্রান্ত হলে দ্রæত চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে লাখো শিশুর জীবন বাঁচানো সম্ভব।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here