বিক্ষোভে উত্তাল আসাম

নিউজ ডেস্ক: বিক্ষোভ থামাতে আশ্বাস দিয়েছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা। টুইট করেছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও। তাতেও নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল নিয়ে বিক্ষোভ থামানো গেল না আসামে। বরং কার্ফু ভেঙেই এ বার গুয়াহাটির রাস্তায় নেমে এলেন সাধারণ মানুষ। নিরাপত্তাবাহিনীর উপস্থিতিতেই জায়গায় জায়গায় বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন তাঁরা। জ্বলন্ত কাঠ ফেলে রাস্তা অবরোধের অভিযোগ উঠেছে তাঁদের বিরুদ্ধে। এমনকি ডিব্রæগড়ে রাষ্ট্রীয় স্বয়ম সেবক সঙ্ঘের একটি দফতরে তাঁরা হামলা চালিয়েছেন বলে অভিযোগ স্থানীয় বিজেপি নেতাদের। দফতরের বাইরে বেশ কয়েকটি গাড়িও জ্বালিয়ে দেওয়া হয় বলে দাবি তাঁদের। খবর আনন্দবাজার সূত্রের।
কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে চলছে ¯েøাগানও। তার মধ্যেই ডিব্রæগড়ে রাষ্ট্রীয় স্বয়ম সেবক সঙ্ঘের একটি দফতরে আন্দোলনকারীরা হামলা চালায় বলে অভিযোগ তুলেছেন বিজেপির স্থানীয় এক নেতা। সঙ্ঘের দফতরের বাইরে বেশ কয়েকটি গাড়িতেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় বলে দাবি তাঁর। নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের প্রতিবাদে গতকালই জ্বলে উঠেছিল আসাম। কোনও সংগঠন ছাড়া সাধারণ মানুষ এবং ছাত্ররাই রাস্তায় নেমে এসেছিলেন সেইসময়। তবে এ দিন আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়িয়েছে অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (আসু) এবং কৃষক মুক্তি সংগ্রাম সমিতি। সাধারণ মানুষকে ঘর ছেড়ে রাস্তায় নামার আর্জি জানিয়েছে তারা। এ দিন আসুর তরফে একটি বিবৃতি প্রকাশ করে বলা হয়, ‘‘নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের বিরুদ্ধে লড়াই চলবে। বেলা ১১টায় গুয়াহাটির লতাশিল ময়দানে জমায়েত হয়েছে। তার জন্য সকলকে ঘর ছেড়ে রাস্তায় নামার আর্জি জানাচ্ছি আমরা।’’
এমন পরিস্থিতিতে এয়ার ইন্ডিয়া, ইন্ডিগো, স্পাইসজেট, ভিস্তারা, গো এয়ার-সহ বেশ কিছু সংস্থা অসম বিমান বন্দর থেকে তাদের একাধিক বিমানের উড়ান বাতিল করেছে। বাতিল করা হয়েছে বেশ কিছু বিমানের অবতরনও। ডিব্রæগড়ে ৯টি বিমানের উড়ান বাতিল করা হয়েছে। বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকায় কোনও ট্যাক্সিও পাওয়া যাচ্ছে না, যার ফলে যাঁরা বিমানবন্দরে পৌঁছেছিলেন, তাঁরা এখনও আটকে।
এ ছাড়াও এয়ার ইন্ডিয়ার তরফে কলকাতা থেকে ডিব্রæগড়গামী একটি বিমান বাতিল করা হয়েছে। গুয়াহাটি এবং ডিব্রæগড় থেকে দু’টি বিমানের উড়ান বাতিল করেছে ভিস্তারা। ইন্ডিগো, স্পাইসজেট এবং গো এয়ারের তরফেও একাধিক বিমান বাতিল করা হয়েছে। আবার উড়ানের সময়সূচিও বদলেছে একাধিক বিমানের। ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত গুয়াহাটি, ডিব্রæগড় এবং যোরহাটগামী এবং সেখান থেকে যত বিমান বাতিল হবে, সেই বাবদ ভাড়ার টাকা যাত্রীদের ফেরত দেওয়া হবে বলে স্পাইসজেট এবং গো এয়ারের তরফে ইতিমধ্যেই জানানো হয়েছে। বিক্ষোভ চলাকালীন ডিব্রæগড়ের ছাবুয়ার একটি রেল স্টেশন চত্বরে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষোভকারীরা। তিনসুকিয়ার পানিতোলা স্টেশন চত্বরেও আগুন ধরানো হয়, যার পর এ দিন আসামে সমস্ত লোকাল ট্রেন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ। আপাতত ডিব্রæগড় থেকে সমস্ত দূরপাল্লার ট্রেনও বন্ধ রাখা হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ইতিমধ্যেই টুইটারে অসমবাসীর উদ্দেশে বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। অসমিয়া ভাষায় তিনি লেখেন, ‘সিএবি নিয়ে আশঙ্কার কোনও কারণ নেই। কেউ আপনাদের অধিকার কাড়তে পারবে না।’ আসামের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়ালও এ দিন শান্তি বজায় রাখার আর্জি জানান সাধারণ মানুষের কাছে। বিজেপির জেলা স্তরের নেতাদের নিয়ে একটি বৈঠকে তিনি বলেন, ‘‘আমাদের হাতে যা তথ্য রয়েছে, তাতে এ রাজ্যে ৫ লক্ষের বেশি অনুপ্রবেশকারীকে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে না। তাই আমাদের সংস্কৃতির এবং ঐতিহ্যের উপর কোনও সঙ্কট দেখা দেবে না।’’

রাজ্যসভায় শাহের রাখঢাক নেই
‘মুসলিমদের কেন নাগরিকত্ব দেব?’,

নাগরিকত্ব বিল প্রসঙ্গে লোকসভায় যা ঊহ্য রেখেছিলেন, রাজ্যসভায় তা স্পষ্ট করে দিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তাঁর কথায়, গোটা পৃথিবী থেকে যদি মুসলমানেরা এসে এ দেশের নাগরিকত্ব চান, তা হলে তা দেওয়া সম্ভব নয়। এ ভাবে চলতে পারে না। বিরোধীদের মতে, এই বিল হল সরকারের আগ্রাসী হিন্দুত্ব নীতির পরিচায়ক। যদিও বিজেপির পাল্টা যুক্তি, দলের ইস্তাহারেই বিলটি আনার কথা ছিল। সেই প্রতিশ্রæতি রক্ষা করা হয়েছে। শাহের আশ্বাস, ‘‘কোনও ভাবেই মুসলিম মুক্ত হবে না ভারত।’’ বিরোধী শিবিরের তীব্র প্রতিবাদ, হাড্ডাহাড্ডি লড়াই সত্তে¡ও রাজ্যসভায় পাশ হয়ে গেল নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল (সিএবি)। রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষর করলেই বিলটি আইনে পরিণত হবে। এর ফলে আরও মসৃণ হবে পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসা অ-মুসলিম শরণার্থীদের নাগরিকত্ব পাওয়ার পথ। ২০১৪-র ৩১ ডিসেম্বর বা তার আগে থেকে তাঁরা ভারতে শরণার্থী হিসেবে বাস করলে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন জানাতে পারবেন। অবৈধ ভাবে বসবাস করার জন্য আবেদনকারীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্ত হবে না বলে ভরসা দিয়েছেন শাহ। এ দিন বিল পাশ হতেই প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য, ‘‘সমবেদনা ও সৌভ্রাতৃত্বের যে-সংস্কৃতি আমাদের রয়েছে, এই বিলটি তার মাইলফলক।’’
তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে এ দিন জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) নিয়ে একটি শব্দও খরচ করেননি শাহ। অসমে হওয়া এনআরসির ব্যর্থতা ঢাকতে ও বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু ভোটব্যাঙ্ককে বার্তা দিতে তড়িঘড়ি সিএবি আনার সিদ্ধান্ত নেয় মোদী সরকার। ওই বিলে কেন কেবল অ-মুসলিমদের (হিন্দু, শিখ, পার্সি, খ্রিস্টান, জৈন ও বৌদ্ধ) কেন সুবিধে দেওয়া হল, তা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন তুলে আসছেন বিরোধীরা। তাঁদের অভিযোগ, মুসলিমদের সঙ্গে বিভাজনের রাজনীতি করার উদ্দেশ্যেই বিলটি আনা হয়েছে।
লোকসভায় এই অভিযোগের স্পষ্ট জবাব না দিলেও, শাহ পাল্টা প্রশ্নে বলেন, গোটা দুনিয়া থেকেই যদি মুসলিমরা এসে এ দেশে নাগরিকত্ব চান, তাঁদের সবাইকে কি নাগরিকত্ব দিয়ে দেব? কী করে দেব। দেশ কী ভাবে চলবে, এ ভাবে চলতে পারে না।’’ এর পরেই তাঁর যুক্তি, ‘‘প্রতিবেশী তিন দেশের রাষ্ট্রধর্ম হল ইসলাম। সেই কারণে শরণার্থী হিসেবে আসা তিন দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। না হলে উৎপীড়নের শিকার ওই মানুষেরা কোথায় যাবেন।’’

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here