সিটি নির্বাচনে দুই দলের প্রার্থী ঘোষণা

নিজস্ব প্রতিবেদক : তফসিল ঘোষণার সাথে সাথেই ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচন জমে উঠতে শুরু করেছে। দলগতভাবে প্রার্থিতা চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া শেষ। দল মনোনীত সমার্থিতদের নাম ঘোষণার সাথে শুরু হলো আনুষ্ঠানিক পুরোদমের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে প্রতিদদ্বীতা হবে প্রধান দুই দলের মধ্যেই। দুই দলই নির্বাচনের মানসিক প্রস্তুতিও আগে থেকেই নিয়ে রেখেছে। মেয়র পদে উত্তরে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে বর্তমান মেয়র আতিকুল ইসলামকে। দলের মাঝে চার-পাঁচজন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করলেও আতিককেই সবচেয়ে সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখা হচ্ছে। মেয়র হিসেবে পুরো মেয়াদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাননি আতিক। বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ড, নগরজীবনের সমস্যা নিরসনে তাঁর আন্তরিক প্রয়াস প্রভৃতি আতিকের পক্ষে ভূমিকা রাখছে। সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী, মিরপুরের এমপি আসলাম মোল্লা প্রার্থী হতে চাইলেও উত্তরের অধিকাংশ নেতা-কর্মীর মধ্যেই তারা আলোচিত নন।
অপরদিকে প্রধান রাজনৈতিক বিরোধী শক্তি বিএনপি’র প্রার্থী হয়েছেন তাবিথ আউয়াল। গত মেয়র নির্বাচনেও তিনি শক্ত প্রার্থী ছিলেন। কিন্তু দলের আকস্মিক নির্দেশে তিনি ভোটের দিন মাঝপথে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। এখানে বিএনপিরও কয়েকজন প্রার্থী ছিলেন। তবে তাদের কর্মী, ভোটার সাধারণের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগসহ আরো কিছু বিষয়ে তাবিথ এগিয়ে রয়েছেন। কেন্দ্রীয় নেতা কাউন্সিলর কাইয়ুম মনোনয়ন প্রত্যাশী এবং জোর লবিংও করছেন। কিন্তু তার মনোনয়ন লাভের সম্ভাবনা ছিল না।
ঢাকা দক্ষিণে এমপি ফজলে নূর তাপসের মনোনয়পত্র সংগ্রহের ঘটনা মেয়র সাঈদ খোকনের মনের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। একপর্যায়ে তিনি কেঁদে উঠেন। টেলিভিশনে খোকনের কান্নার দৃশ্য দেখে তার ভাষায় সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে সাঈদ খোকনকেও নির্বাচনী মাঠে নামতে বলা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন পেলেন ব্যারিষ্টার ফজলে নুর তাপস। সাঈদ খোকন, ডাক্তার মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, হাজী সেলিম বরাবরের মতো এবারও মেয়র পদে মনোনয়নপত্র কিনেছেন। দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। দলীয় ও অন্য মাধ্যমে পরিচিত ব্যারিষ্টার তাপস। তার প্রতি কর্মী-সমর্থক ও ভোটার সাধারণের নিরঙ্কুশ বা ব্যাপক সমর্থন প্রতিফলিত হবে বলে আশা করছেন তিনি। প্রত্যেকের ব্যাপারেই পক্ষে-বিপক্ষে মত এসেছে। এসব জরিপ প্রতিবেদন ও সার্বিক দিক বিবেচনায় দলীয় মনোনয়ন দেয়া হয়। দলীয় সূত্রে তাই ব্যারিষ্টার তাপসকে এবার মনোনয়ন দেয়া হলো।
অপরদিকে ঢাকা দক্ষিণে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সফল মেয়র সাদেক হোসেন খোকার পুত্র ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনের বিএনপির মনোনয়ন লাভ প্রায় নিশ্চিত ছিল। অভিবক্ত ঢাকা সিটির মেয়র ছিলেন মির্জা আব্বাস। এবারেও প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ তারও ছিল। খোকা আর আব্বাসের একটা দ›দ্ব বরাবরই ছিল। রাজধানী শহরের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা নিয়েই এই বৈরিতা। খোকার মৃত্যুর পর তার কর্মী-সমর্থকরা গুটিয়ে যাবেন এবং আব্বাসের সাথে হাত মেলাবেন বলেই ধারণা ছিল। কিন্তু তা হয়নি। তার পুত্রকে ইশরাককে ঘিরে একতাবদ্ধ হয়েছেন। বীর মুক্তিযুদ্ধা ক্র্যাক প্লাটুনের অন্যতম সদস্য খোকার প্রতি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালনকারী সাধারণ মানুষেরও নৈতিক সমর্থন সহানুভুতি আশা করছে বিএনপি। ইশরাককে অন্যতম পুঁজি হিসেবে নিয়ে বিএনপি সক্রিয় হয়েছে। মির্জা আব্বাসও সরে দাঁড়িয়েছেন। দলীয় আরো কয়েকজনের নাম ইতিপূর্বে জোরেসোরে শোনা গেলেও তারা এখন নিষ্প্রভ।
ঢাকার দুই সিটিতে করপোরেশন নির্বাচন হলেও তা সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জিংই হবে। বিগত সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশেও বেশি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর দুই সিটি কর্পোরেশনের একটিতে কোনরকম জয়লাভ এবং অপরটি হাতছাড়া হয়ে গেলে বা সেখানেও কোনরকমে জয়লাভ করলে তাতে সরকারের দুর্বলতাই প্রকাশ পাবে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন, বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হতে না পারলেও তারা সরকারের দাবীকৃত বিপুল জনপ্রিয়তাকেই প্রশ্নের মুখোমুখি করবে। এই নির্বাচন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জিং প্রধানত এ কারণে।
অপরদিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন ইভিএমে সিটি নির্বাচন কমিশনের জন্য চ্যালেঞ্জিং। ভোটার নির্বাচন ইভিএম এর আগে অনুষ্ঠান করা হয়নি। ঢাকাতেই প্রথম। ইতিপূর্বে ইভিএমে আংশিকভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু তাও ছিল ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। রাজনৈতিক দলের কর্মীদেরও এজন্য প্রস্তুত করা হয়নি। বিভ্রাটের আশঙ্কা এতে থেকে গেল। সরকারি দলের সাধারণ সম্পাদকের মতে এ নির্বাচন তাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং। জয় নিয়ে শতভাগ নিশ্চয়তার আশঙ্কা থেকেই কি তাদের সংশয়-শঙ্কা।
রাজনৈতিক মহলে বড় প্রশ্ন হয়ে আছে যে, বিএনপি গোড়া থেকেই ইভিএম বিরোধী। ইভিএমে নির্বাচনে না ঘোষণা দিয়েছিলো তারা। সেই বিএনপিই এখন ইভিএমে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর ইভিএমে কারচুপির অভিযোগ এনে তার গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া যাবে এমন আশা কি আর বিএনপি করতে পারবে? এই অভিযোগে নির্বাচন পরবর্তি আন্দোলনে বিএনপি কি বৃহত্তর নগরবাসীকে সম্পৃক্ত করতে পারবে।
এই নির্বাচনে জয়-পরাজয় যা-ই হোক তা বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ত্বরান্বিত করতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে না। কারণ এর সঙ্গে আইনগত প্রশ্ন জড়িত। এক বছর ১০ মাস যাবৎ বেগম খালেদা জিয়া বন্দী জীবনযাপন করছেন। বিএনপির নেতা-কর্মীরা রাজধানীতে তেমন কোন শোডাউন করতে পারেননি। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ঘুমিয়ে থাকা কর্মীদের মধ্যে নতুন প্রাণ শক্তি সঞ্চার করবে বটে। তবে তাদের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি যে তিমিরে আছে সেখানেই পড়ে থাকবে।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here