আক্রমণেই ধ্বংস ইউক্রেনের বিমান, তবে ভুল করে, জানাল ইরান

নিউজ ডেস্ক: ইরানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, অনিচ্ছাকৃতভাবে ইউক্রেনের যাত্রীবাহী বিমানটিকে ভূপাতিত করেছে তারা। যাতে ১৭৬ আরোহী নিহত হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের প্রতিবেদনে এ কথা জানানো হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের একটি স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ সাইটের কাছাকাছি যাত্রীবাহী বিমানটি চলে আসলে “মানব ত্রæটি”র কারণে বিমানটি ভূপাতিত হয়। বিমানটিকে “শত্রæ টার্গেট” মনে করে ভুল করা হয় এবং ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়, বিবৃতিতে বলা হয়। বিবৃতিতে আরো বলা হয়, এ ঘটনায় জড়িতদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে। এর আগে ইরান অস্বীকার করে যে, দেশটির একটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বিমানটি বুধবার রাজধানী তেহরানের কাছে বিধ্বস্ত হয়। কিন্তু ইরান হয়তো ভুল করে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বিমানটি ভূ-পাতিত করেছে- যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এমন দাবি তোলার পর থেকে ইরানের উপর চাপ বাড়তে থাকে।এক টুইটে ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রূহানি বলেন, বিমানটির “ভয়ংকরভাবে বিধ্বস্ত” হওয়ার ঘটনা “ক্ষমার অযোগ্য ভুল। ইরাকে মার্কিন দুটি বিমান ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরান হামলা চালানোর কয়েক ঘণ্টা পরই ইউক্রেন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট পিএস৭৫২ বিধ্বস্ত হয়। এতে ১৭৬ আরোহীর সবাই মারা যায়। ইউক্রেনের ওই ফ্লাইটটি ইউক্রেনীয় রাজধানী কিয়েভ হয়ে কানাডার টরেন্টোর দিকে যাচ্ছিল, কিন্তু উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পরেই ইমাম খোমেনি বিমানবন্দরের কাছে আছড়ে পরে এটি।
বিমান বিধ্বস্তে নিহতদের মধ্যে ইরানি ছাড়াও কানাডা, সুইডেন, ইউক্রেন, আফগানিস্তান ও জার্মানির নাগরিক ছিল। মার্কিন গণমাধ্যমে বলা হয় যে, ইরান যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল তাই তারা হয়তো ইউক্রেনীয় এয়ারলাইন্সের বিমানটিকে যুদ্ধ বিমান ভেবে ভুল করেছে। জানুয়ারির ৩ তারিখে ইরানের শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলেইমানি মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হওয়ার প্রতিশোধ হিসেবে আকাশ পথে হামলা চালায় ইরান।শনিবার এক টুইটে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফ বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের হঠকারিতা” ইউক্রেনীয় জেটটি ভূ-পাতিত হওয়ার জন্য আংশিকভাবে দায়ী। বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ৮২ জন ইরানের, ৫৭ জন কানাডার এবং ১১ জন ইউক্রেনের নাগরিক ছিলেন। এছাড়া সুইডেন, যুক্তরাজ্য, আফগানিস্তান এবং জার্মানির নাগরিক থাকার কথাও জানা যায়।
ইরানের বিবৃতিতে কী বলা হয়েছে?
শনিবার সকালে, ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে পাঠ করা সামরিক বাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়, সামরিক বাহিনী ভুল করে ফ্লাইট পিএস৭৫২ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, রেভল্যুশনারি গার্ড যা ইরানের ইসলামি ব্যবস্থা প্রতিরক্ষার জন্য তৈরি করা হয়েছে সেটির “স্পর্শকাতর একটি সামরিক কেন্দ্রের” কাছে চলে গিয়েছিল বিমানটি। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে উত্তেজনা চরমে থাকার কারণে ইরানের সামরিক বাহিনী “সর্বোচ্চ প্রস্তুতিতে ছিল। এমন অবস্থায়, মানব ত্রæটির কারণে অনিচ্ছাকৃতভাবে ফ্লাইটটিতে আঘাত হানা হয়েছিল,” বিবৃতিতে বলা হয়। এর আগে ইরান অস্বীকার করেছিল যে, ইউক্রেনীয় জেটটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে আছড়ে পড়েছে। বিমানটিকে ভূপাতিত করার কারণে বিবৃতিতে ক্ষমা চেয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী। বলেছে, ভবিষ্যতে এ ধরণের ভুল এড়ানোর জন্য তারা তাদের ব্যবস্থাকে উন্নত করবে। ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার সাথে যারা জড়িত ছিল তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানানো হয়।
ইরানের ঘোষণার আগে কী ঘটেছিল?
এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে ইরানের সামরিক বাহিনী স¤প্রতি যে অভিযোগ অস্বীকার করেছিল তা থেকে সম্পূর্ণভাবে বেরিয়ে আসলো। গত শুক্রবারও ইরান বেশ জোড়ালোভাবেই অস্বীকার করেছে যে বিমানটিকে ভূপাতিত করা হয়নি।
“আমাদের কাছে যে বিষয়টি পরিষ্কার এবং আমরা যা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি তা হলো, বিমানটিকে কোন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করেনি,” বলেন ইরানের বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা সিএওই’র প্রধান আলি আবেদজাদেহ। বৃহস্পতিবার, ইরান সরকারের মুখপাত্র আলি রাবেই অভিযোগ তোলেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা বিমান দুর্ঘটনা নিয়ে “মিথ্যাচার করছে এবং মনস্তাত্তি¡ক যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। কিন্তু প্রমাণাদি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পক্ষে জোড়ালো হওয়ায়, স্বচ্ছ তদন্তের আহŸানও জোড়ালো হয়। নিউইয়র্ক টাইমসের পাওয়া ভিডিওতে দেখা যায় যে, তেহরানের রাতের আকাশে একটি ক্ষেপণাস্ত্রের ঝলকানি দেখা যাচ্ছে এবং একটি বিমানের সংস্পর্শে আসার পর সেটি বিস্ফোরিত হচ্ছে। এর ১০ সেকেন্ড পর বিস্ফোরণের বিকট শব্দ মাটি থেকে শোনা যায়। আর আগুন ধরে যাওয়া বিমানটি উড়তে থাকে।
গত বৃহস্পতিবার, টেলিভিশনের দেখানো বিমান বিধ্বস্তের ছবিতে দেখা যায় যে, ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে ঘটনাস্থল থেকে ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ নষ্ট করা হয়েছে। প্রতিক্রিয়ায় ইরান পূর্ণ তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে। পাশাপাশি তারা তদন্তে অংশ নিতে ইউক্রেন, কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিমান দুর্ঘটনার তদন্তকারী সংস্থাগুলোকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। শুক্রবার কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া ফিলিপ শ্যাম্পেন ইরানকে হুঁশিয়ার করে বলেন, “বিশ্ব নজর রেখেছে,” এবং বিমানে থাকা নিহত আরোহীদের স্বজনেরা সত্য জানতে চায়।
বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহত কানাডার নাগরিকদের ফুল ও মোমবাতি জ্বালিয়ে স্মরণ করে স্বজন ও দেশটির সাধারণ মানুষ। এর আগে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রæডোর বলেন যে, একাধিক সূত্র থেকে তিনি যেসব গোয়েন্দা তথ্য পেয়েছেন তা এটাই নির্দেশ করে যে, ইরানের ভূমি-থেকে-আকাশে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ভূপাতিত হয়েছে বিমানটি। মিস্টার ট্রæডোর এমন মন্তব্যের পরেই এই হুঁশিয়ারি দিলেন কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী। যাত্রীবাহী বিমানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। ২০১৪ সালের জুলাই মাসে ইউক্রেনে ফ্লাইট এমএইচ১৭ নামে মালয়েশিয়ার একটি বেসামরিক এয়ারলাইনের বিমানে রাশিয়ার তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে ২৯৮ জন আরোহী নিহত হয়।

Share on Facebook