ইভিএম নিয়ে দ্বিতীয় চিন্তা : লড়াই হবে সমানে সমান

নিজস্ব প্রতিবেদক: ঢাকার দুই সিটিতে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলেই প্রতিদ্ব›দ্বী বড় দুই দল এবং ভোটার সাধারণও মনে করছেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মেয়র পদে প্রতিদ্ব›িদ্বতাকারীরা ব্যক্তিগত, শিক্ষাগত যোগ্যতা, মেধা, আন্তরিকতা, গণযোগাযোগসহ বিভিন্ন দিক বিবেচনায় কেউ কারো চেয়ে কম নন। রাজনৈতিক-সাংগঠনিক অবস্থানগত দিক থেকেও একপক্ষ আরেক পক্ষকে ফেলে দেয়ার মতো নয়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল আরো মনে করেন ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণের অনেক ভোটারই মনে করেন ভোটার সাধারন ভোট কেন্দ্রে এলে এবং নিজের ইচ্ছেমতো ভোট দিতে পারলে সঠিক জনমতের প্রতিফলন ঘটবে। সেক্ষেত্রে বিজয় তিলক কার ভাগ্যে জুটবে নিশ্চিত নয়। লড়াই হবে সমানে সমান। তবে এর বিপরীত ধারার আলোচনাও উড়িয়ে দেয়ার মত নয়।
বিএনপি ও তার সহযোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী গত সংসদ নির্বাচন ছিল আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর তত্ত¡াবধানে মধ্যরাতে সীল মেরে ব্যালট বাক্স ভরাট করার নির্বাচন। ইভিএম নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়ে ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন ইভিএম এ না করার ঘোষণা দেয়ার পরও বিএনপি এ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। ইভিএম নিয়ে আপত্তি করার পরও শতভাগ কেন্দ্রে ইভিএম-এ অনুষ্ঠিত কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনসহ কয়েকটি স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীরা বিজয়ী হন। সামগ্রিকভাবে ইভিএম-এ বিএনপির প্রার্থীরা আওয়ামী লীগের চেয়ে পাঁচ শতাংশ ভোট বেশি পান। এরপরও ইভিএম নিয়ে বিএনপির প্রবল আপত্তি নিয়ে সাধারনের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। জয়লাভের সম্ভাবনা দেখতে না পেয়ে বিএনপি নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায় বলেই কি ইভিএম নিয়ে আগাম অভিযোগ করছে। ইভিএম এর মাধ্যমে নির্বাচন করতেই হবে এমন বাধ্যবাধকতা সরকারি দলের দিক থেকে নেই। বিএনপি ও তার সহযোগীরা নির্বাচন নিয়ে কোন প্রশ্ন তোলার সুযোগ যাতে না পায় সে ব্যাপারে সরকার ও সরকারি দল সতর্ক রয়েছে। জানা যায় সে কারনে ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে সকল কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহার না করার চিন্তাও করছে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের উচ্চতর মহল। এমনও হতে পারে ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণের বিশ থেকে পঁচিশ শতাংশ কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহার করা হতে পারে। উচ্চ পর্যায়ের সূত্রে জানা যায়, বিষয়টি নির্বাচন কমিশন ও সরকারের উচ্চতর পর্যায়ের বিবেচনায় থাকলেও আওয়ামী লীগ , বিএনপিসহ অন্যান্য দলের মতামত বিবেচনায় নিয়েই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। দল বিশেষের দাবি অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নেবেনা।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাজধানীর এই নির্বাচনকে সরকারি এবং বিরোধী দল ও তাদের জোট বিশেষ গুরুত্বে সাথেই দেখছে। বড় দুই দলই তাদের শীর্ষস্থানীয় দুইজন করে নেতাকে নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। ড.কামাল হোসেনসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোট বিএনপির প্রার্থীদের সমর্থন দিয়েছেন। প্রার্থীদের নিয়ে বৈঠকে নির্বাচনী কৌশল নির্ধারন করছেন। অপরদিকে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থীদের ১৪ দল সমর্থন দিয়েছে। বিএনপি নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার ব্যাপারে গভীরভাবে আশাবাদী হলেও তাদের বড় ফায়দা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলের ওয়ার্ড-পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা মাঠে নামার ও জোর রাজনৈতিক তৎপরতা, প্রচার-প্রচারনা চালানোর সুযোগ পাচ্ছেন। বিএনপি অবশ্য অভিযোগ করেছে যে, পুলিশ তাদের প্রার্থী, কর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হানা দিয়ে তাদের মনোবল ভেঙ্গে দিচ্ছে । সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, মামলা ছাড়া তেমন কিছু করা হচ্ছেনা বলে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ থেকে পাল্টা বক্তব্য দেয়া হচ্ছে।
বিএনপি থেকে উত্তরে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টুর পুত্র তাবিথ আউয়ালকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। তাবিথ গত মেয়র নির্বাচনেও অংশ নিয়েছিলেন। ভোটের দিন দুপুরে কেন্দ্রের নির্দেশে তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক আচার আচরণ, কর্মী সমর্থক জনসাধারনের সাথে আন্তরিক যোগাযোগসহ বিভিন্ন দিক থেকে যোগ্য বলেই তাবিথ সাধারনভাবে বিবেচিত। কিন্তু শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত তিনি নির্বাচনে থাকবেন কিনা সে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাবিথকে। ঢাকা দক্ষিনে বিএনপির প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন জনমনের এ সংক্রান্ত প্রতিক্রিয়ার দিকটি বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রচারনায় অবর্তীণ হওয়ার আগেই বলছেন যে, শেষ মুর্হুত্ব পর্যন্ত তিনি নির্বাচনী মাঠে থাকবেন। প্রয়াত মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকার পুত্র ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক ও তাবিথ আউয়াল এর চারিত্রিক স্বচ্ছতা, যোগ্যতা এখনও পর্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ নয়। নবীন অনভিজ্ঞ বলে তা প্রমান সাপেক্ষ। নগরীর ভোটার সাধারনের একটা অংশ তাদের পক্ষেও রয়েছে। অভিন্ন কারনে সরকার দলীয় দুই প্রার্থী ব্যরিস্টার ফজলে নুর তাপস ও আতিকুল ইসলাম নির্বাচনে নগরবাসীর বৃহত্তর অংশের সমর্থন আশা করতেই পারেন। উত্তরে আতিক পুরো মেয়াদে নগরবাসীর সেবা করার সুযোগ পাননি বলে ভোটারদের নৈতিক সমর্থন সহানুভ‚তি তিনি আশা করছেন। আপরদিকে ব্যরিস্টার তাপস ধানমন্ডি এলাকায় উন্নয়ন কাজে দক্ষতা, যোগ্যতার ছাপ রেখেছেন।
বিভিন্ন কারনে সরকারের প্রতি নগরের অনেক ভোটারের হতাশা, অসন্তোষ রয়েছে বলে বিএনপি ও তার সহযোগীরা মনে করেন। এ কারনে নগরবাসী বিএনপির প্রার্থীদের বিজয়ী করবে বলেই তাদের বিশ্বাস। সরকারি দলের অনেক নেতাই মনে করেন সচেতন নগরবাসী সবই প্রত্যক্ষ করছেন। সংসদ নির্বাচন বর্জন করার পর ড.কামালের নেতৃত্বে নির্বাচনে যাওয়া, নির্বাচিতদের শপথ গ্রহন, সংসদীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহন, ইভিএম ও ডিজিটাল জালিয়াতির আশঙ্কা প্রকাশ করার পরও নির্বাচনে অংশগ্রহন করেছে বিএনপি। প্রশ্ন উঠেছে বিএনপি ও তার সহযোগীদের এই দ্বিচারিতায় তাদের প্রতি দেশের সবচেয়ে রাজনীতি সচেতন রাজধানীর ভোটার সাধারনের কতটা সমর্থন বিএনপি আশা করতে পারে?
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন, নগরীতে তীব্র যানজট, পিয়াজসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির মূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতাসহ অনেক ক্ষেত্রে মানুষের হতাশা রয়েছে। একই সাথে মেট্রোরেল, দুর্নীতি অনিয়ম বিরোধী অভিযান, ক্যাসিনো কান্ড, দুর্নীতি বিরোধী তৎপরতাসহ সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ড মানুষকে আশাবাদীও করছে। স্থানীয় সরকার সংস্থাসমূহে বিশেষ করে ঢাকার দুই সিটিতে সৎ,যোগ্য,দক্ষ নেতৃত্ব চায় নগরবাসী। সে কারনে সরকার দলীয় দুই তরুন প্রার্থী-নগরবাসীর মধ্যে আশার আলো প্রজ্জ্বলিত করতেও পারেন। বিএনপির দুই প্রার্থীও যোগ্যতাসম্পন্ন হলেও তাদের দলের ও জোটের অতীতের রাজনৈতিক ভুল, অনেক ক্ষেত্রে তাদেরই মাশুল দিতে হতে পারে।

Share on Facebook