বাংলাদেশের সাথে সীমান্তের পুরোটাতেই কাঁটাতারের বেড়া দিতে চায় ভারত

বিবিসি বাংলা: বাংলাদেশের সীমান্তে গত কয়েকদিনে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের গুলিতে কমপক্ষে পাঁচজন বাংলাদেশী নিহত হওয়ার পর এনিয়ে বিজিবি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির কর্মকর্তারা বলেছেন, বাংলাদেশিদের হত্যার ঘটনা নিয়ে ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফ আত্মরক্ষায় গুলি চালানোর যে বক্তব্য দিয়ে থাকে তা গ্রহণযোগ্য নয়। তারা আরও বলেছেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের কাছে প্রতিটি ঘটনার প্রতিবাদ করা হচ্ছে। মানবাধিকার কর্মীরা বলেছেন, সীমান্ত হত্যা বেড়ে যাওয়ার কারণ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন এবং তা করতে হবে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে।
‘বিএসএফ’এর বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়’
সীমান্তে গুলিতে বাংলাদেশী নিহত হওয়ার সর্বশেষ ঘটনা ঘটেছে গত ২৩শে জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ভোরে। উত্তরাঞ্চলীয় জেলা নওগাঁর পোরশা উপজেলার একটি সীমান্তে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফ সদস্যদের গুলিতে তিনজন বাংলাদেশী নিহত হয়। এর আগে গত বুধবার লালমনিরহাট জেলার একটি সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে দুইজন নিহত হয়। পর পর এই দু’টি ঘটনা ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এই জানুয়ারি মাসের তিন সপ্তাহেই বিএসএফের গুলিতে হতাহতের আরও কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে এবং সীমান্তে মানুষ হত্যা বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির অপারেশন বিভাগের পরিচালক লে: কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, সীমান্তে বাংলাদেশিদের হত্যার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় তারাও উদ্বিগ্ন। তবে এসব ঘটনার ব্যাপারে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয় বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। “তথ্য অনুযায়ী আসলে সংখ্যাটা বেড়েছে। বিষয়টা নিয়ে আমরাও উদ্বিগ্ন। প্রতিটা ঘটনার পর পরই আমরা বিএসএফকে জোরালো প্রতিবাদ জানাই।” তিনি আরও বলেছেন, “বিভিন্ন চুক্তিতে বলা আছে এবং নিয়ম আছে, কেউ অবৈধভাবে সীমান্তে গেলে তাকে ধরে আমাদের কাছে হস্তান্তর করবে এবং আমরা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবো। কিন্তু সেটা না করে বিএসএফ কিছু কিছু ক্ষেত্রে গুলি বর্ষণ করছে।” বিজিবির কর্মকর্তা লে: কর্নেল আহমেদ বলেছেন, “যখন আমরা বিএসএফকে প্রতিবাদ জানাই, তার জবাবে তারা আমাদেরকে জানায় যে, তারা আত্মরক্ষার্থে অর্থাৎ যখন আমাদের দেশের নাগরিকরা তাদেরকে আক্রমণ করে কেবল তখনই ননলিথাল উইপেন (প্রাণঘাতী নয়) ব্যবহার করে গুলি বর্ষণ করে। যেটা আসলে গ্রহণযোগ্য নয়।” বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বলেছেন, সীমান্তে বাংলাদেশিদের হত্যা বন্ধের ব্যাপারে বিজিবি এবং বিএসএফের শীর্ষ পর্যায়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। সেসব আলোচনার প্রেক্ষাপটে প্রাণঘাতী নয় এমন অস্ত্র ব্যবহার করার ব্যাপারে দুই পক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে রাজনৈতিক পর্যায়ের বিভিন্ন আলোচনাতেও সীমান্তে হত্যা শূণ্যের কোঠায় নামিয়ে আনার প্রতিশ্রæতি ভারত বিভিন্ন সময় দিয়েছিল। সে অনুযায়ী সীমান্তে হত্যা কয়েক বছর কম থাকলেও স¤প্রতি আবার বেড়েছে বলে কর্মকর্তারা বলছেন।
বেড়ে চলছে সীমান্তে মানুষ হত্যা
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ২০১৯ সালে সীমান্তে ৩৮জন বাংলাদেশি নিহত হয় এবং প্রাণহানির এই সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় তিনগুণ বেশি। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজা বলছিলেন, বেড়ে যাওয়ার কারণ বের করা প্রয়োজন। “সীমান্তে মানুষ হত্যা কেন বেড়েছে, সেটাই আসলে প্রশ্ন। এই হত্যা কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়।” “এমন হতে পারে যে বাংলাদেশের মানুষ অনেকেই সীমান্তের ওপারে আছে, যারা কাজ করতে যাওয়া আসা করে। ভারতের নাগরিকত্ব আইন বা তালিকার কারণে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে যদি তারা সীমান্ত পার হন, সে সময় কিছু হচ্ছে কিনা- এগুলো খতিয়ে দেখা দরকার।” সীমান্তে মানুষ হত্যা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনায় এসেছে। বিরোধী দল বিএনপি পর পর কয়েকটি ঘটনার ব্যাপারে নিন্দা এবং প্রতিবাদ জানিয়েছে। গত বছরের অক্টোবরে রাজশাহী জেলায় পদ্মা নদীতে বিজিবি এবং বিএসএফের মধ্যে গোলাগুলিতে বিএসএফ একজন সদস্য নিহত হয়েছিল। সেই ঘটনার পর সীমান্তে বিএসএফের পক্ষ থেকে গুলি চালানোর ঘটনা বেড়েছে কিনা, এমন প্রশ্নও তুলছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। তবে এই প্রশ্ন মানতে রাজি নন বিজিবি’র লে: কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশিরাও যেনো অবৈধভাবে সীমান্তে না যায় সে ব্যাপারেও সীমান্ত এলাকার মানুষকে সতর্ক করার কর্মসূচি জোরদার করা হয়েছে। “এর সাথে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। বিএসএফতো বাংলাদেশের ভিতরে এসে গুলি করছে না। বাংলাদেশি নাগরিক যখন সীমান্তে যাচ্ছে, তখন গোলাগুলিটা হচ্ছে।” “সেজন্য আমরা সীমান্ত এলাকাগুলোতে সতর্কতামূলক কর্মসূচি চালাই, যেনো বাংলাদেশিরা অবৈধভাবে সীমান্তে না যায় এবং এমন সমস্যার মুখোমুখি না হয়।” এদিকে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা বলেছেন, পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক পর্যায়েও ভারতের সাথে বাংলাদেশ আলোচনা করবে।
সীমান্তে হত্যার বিষয়ে ভারত কী বলছে?
ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফ বলছে যে রাজশাহী সীমান্তে বিজিবির গুলিতে তাদের যে সদস্য মারা গিয়েছিলেন, তার প্রতিশোধ নেওয়ার প্রশ্নই নেই। এবং তার পর থেকে বিএসএফের গুলিতে ৫/৬ জন মারা গেছেন ঠিকই, কিন্তু সেগুলির সঙ্গে ওই ঘটনার কোনও সম্পর্ক নেই। কলকাতায় বিবিসি বাংলার সংবাদদাতা অমিতাভ ভট্টশালীকে বিএসএফের দক্ষিণবঙ্গ সীমান্ত অঞ্চলের ইন্সপেক্টর জেনারেল ওয়াই বি খুরানিয়া বলেছেন, “ওই ঘটনাটি খুবই দুর্ভাগ্যজনক।” “আমরা দুই বাহিনীই ঘটনার তদন্ত করেছি এবং কেন, কীভাবে ওই ঘটনা হয়েছিল আর ভবিষ্যতে যাতে এধরনের ঘটনা এড়ানো যায়, তার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেসব বিস্তারিত ভাবে সংবাদমাধ্যমকে জানাতে চাই না।” বিএসএফ কর্মকর্তারা আরও বলছেন, সীমান্তে গরু পাচারসহ অন্যান্য অপরাধ রুখতে যেসব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তাতে পাচারকারীদের কাজকর্ম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এখন শুধু যে সীমান্তে আসার পরে গরু আটকানো হচ্ছে, তা নয়। স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে যৌথভাবে সীমান্ত থেকে ১০/১১ কিলোমিটার দূর অবধি গিয়েও গরু পাচার রোধ করা হচ্ছে। ২০১৮ সালে পাচার হওয়ার সময়ে গরু আটক করা হয়েছিল প্রায় ৪০ হাজার, আর ২০১৯ এ সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৩১ হাজারের কিছু বেশিতে। “এই সব ব্যবস্থার ফলেই পাচারকারীরা অনেক সময়ে বেপরোয়া হয়ে উঠছে। যে কোনও ভাবেই তারা গরু পাচার করার চেষ্টা করতে গিয়ে বিএসএফ সদস্যদের ওপরে হামলা করতেও দ্বিধা করছে না। এরকম হামলা হলে তো বিএসএফ সদস্য নিজের প্রাণ বাঁচাতে তার যা করণীয়, সেটাই করবেন,” বলছিলেন মি. খুরানিয়া। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৮ সালে ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে ১৪ জন মারা গিয়েছিলেন, অথচ ২০১৯-এ সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩৮। মি. খুরানিয়াকে প্রশ্ন করা হয় যে এটিই কী প্রমাণ করে না যে সীমান্তে হত্যার সংখ্যা বাড়ছে? জবাবে তিনি বলেন, “বাহিনীর সদস্যদের পরিষ্কার নির্দেশ দেওয়া আছে যে শুধুমাত্র আত্মরক্ষার্থেই বলপ্রয়োগ করা যাবে, আর সেটাও যতটা সম্ভব কম বলপ্রয়োগ করেই করতে হবে। এরজন্য দক্ষিণবঙ্গ সীমান্তে অনেক পাম্প অ্যাকশন গান ব্যবহার করা হয়, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রাণঘাতী নয়।” বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, বিএসএফের নজরদারির ফলে গরু পাচার অনেকাংশে কমে যাচ্ছে দেখে পাচারকারীরা নিত্যনতুন পদ্ধতি বার করছে। এর আগে গলায় কলার ভেলা বেঁধে সেগুলো নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। সেই কায়দা ধরা পড়ার পরে ওই গরুগুলির গায়ে এমনভাবে বোমা বেঁধে দেওয়া হচ্ছিল যাতে বিএসএফ সেগুলি আটক করে জল থেকে উদ্ধার করতে গেলেই বিস্ফোরিত হয়। বিএসএফ বলছে, পাচারকারীরা আরো কিছু কায়দা বার করেছে, যেখানে মৃত গরুর শরীরের কিছুটা অংশ কেটে তার ভেতরে একটি বা দুটি ছোট বাছুর ভরে দেওয়া হচ্ছে। বাছুরগুলির শ্বাস নেওয়ার জন্য তাদের মুখে অর্ধেক কাটা জলের বোতল লাগানো থাকছে, যা জলস্তরের ওপরে রাখা হচ্ছে। মৃত পশু ভেসে যাচ্ছে দেখে বিএসএফ সদস্যরা নজর করছিলেন না। কিন্তু স¤প্রতি একটি মৃত পশুর শরীর থেকে দুটি বাছুর খুঁজে পাওয়ার পরে পাচারকারীদের নতুন কায়দার কথা জানা গেছে।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here