চীনে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ অব্যাহত

নিউজ ডেস্ক: চীনের হুবেই প্রদেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪১ জনে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন লাফিয়ে বাড়ছে সংক্রমিতের সংখ্যা। এছাড়া নতুন এই ভাইরাসে দেশটিতে আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ছাড়িয়েছে। দেশটির কর্তৃপক্ষ গতকাল এ তথ্য জানিয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে,শুধু গতকাল শনিবারই এই ভাইরাসে ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদিকে অসমর্থিত অন্যান্য সূত্র জানিয়েছে, চীনে এই ভাইরাসে ২ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। এই ভাইরাসের কারণে চীনা নাগরিকরা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে দেশটিতে যাতায়াতকারী অন্যান্য দেশের মানুষও। পাকিস্তান সরকার দেশটি থেকে চীনের বিভিন্ন শহরগামী সব ফ্লাইট বাতিল করে দিয়েছে।
হুবেই প্রদেশের স্বাস্থ্য বিভাগ বলেছে, ভাইরাসে নতুন করে মারা যাওয়ার সবাই উহান অঞ্চলের বাসিন্দা। এই অঞ্চলেই প্রথম এই ভাইরাসের আবির্ভাব ঘটে। এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে ইতিমধ্যে উহানসহ দেশটির ১৪ টি শহর অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। ১৪টি শহরের পরিবহণ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিল বেজিং সরকার। এদিকে এই ভাইরাসে ইতিমধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। গত ডিসেম্বরে চীনের উহান শহরে করোনা ভাইরাসের আবির্ভাব ঘটে। প্রতিনিয়ত এই ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের শরীরে প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে শ্বাসকষ্ট, জ্বর, সর্দি ও কাশির মত সমস্যা দেখা দেয়।
হুবেই প্রদেশের উহান-সহ আরও মোট ১৪টি শহরের প্রবেশদ্বার কার্যত ‘তালাবন্ধ’ করে দিয়েছে চিন প্রশাসন। সরকারের নির্দেশ, বাইরের কেউ ভিতরে ঢুকবে না, শহরের ভিতরে থাকা কেউ বেরোবে না। এর মধ্যে কিছু শহরে সিনেমা হল, রেস্তোরাঁ, কারাওকে বারের মতো বিনোদন স্থানগুলোও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কারণ একটাই, মারণ ভাইরাসটি শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ছড়ায়। ফলে যে কোনও ধরনের জমায়েতেই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে প্রশাসন। চিনের ভারতীয় দূতাবাসের পক্ষ থেকে গতকাল জানানো হয়েছে, এ বছর ২৬ জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠান পালন করা হবে না বেজিংয়ের দূতাবাসে। সোশ্যাল মিডিয়ায় জানানো হয়েছে, ‘‘পরিস্থিতির দিকে নজর রেখে এই সিদ্ধান্ত। চিন সরকার যে কোনও অনুষ্ঠান, জনসমাবেশ বাতিল করার কথা বলছে। তাই এই সিদ্ধান্ত।’’
চীনের মিডিয়াগুলো বলছে, নতুন এক হাজার শয্যার হাসপাতালটি ছয় দিনের মধ্যে প্রস্তুত হয়ে যাবে। এটি নির্মাণে ৩৫টি খনন যন্ত্র এবং ১০টি বুলডোজার কাজ করছে। এই প্রকল্পটি “চিকিৎসা ব্যবস্থার যে সংকট তৈরি হয়েছে সেটির সমাধান করবে” এবং “দ্রæত নির্মাণে খরচও তেমন হবে না কারণ এটি আগেই তৈরি করা ভবনে নির্মাণ করা হচ্ছে,” চ্যাংজিয়াং ডেইলি-তে বলা হয়। করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের সেবার জন্য চীনে নতুন হাসপাতাল তৈরি করা হচ্ছে। উহানের ফার্মেসিগুলো ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামাদির সংকটে পড়েছে এবং হাসপাতালগুলোতে বেড়েছে ভীত মানুষের সংখ্যা। এই ভাইরাসে কেউ আক্রান্ত হলে প্রথমে তার জ্বর হয়, এরপর দেখা দেয় শুকনো কাশি এবং সপ্তাহ খানেক পরে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। এ অবস্থায় অনেকেরই হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়া জরুরী হয়ে পড়ে। প্রতি চার জন আক্রান্তের একজনের অবস্থা মারাত্মক হয়ে পড়ছে।
হুবেই-তে কী ধরণের বিধি-নিষেধ রয়েছে?
এক শহর থেকে আরেক শহরের মধ্যে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞায় পার্থক্য রয়েছে। উহানকে মূলত অচল করে দেয়া হয়েছে: সব ধরণের বাস, মেট্রো এবং ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে। এছাড়া সব ধরণের বিমান এবং ট্রেন চলাচলও বাতিল করা হয়েছে। বাসিন্দাদের অন্য কোথাও চলে না যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং রাস্তা বন্ধ করে দেয়ার খবর পাওয়া গেছে। ইঝাউ- যা কিনা হুবেই প্রদেশের একটি ছোট শহর, সেটি এর রেল চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। এনশি শহর সব বাস চলাচল বন্ধ করেছে।
চীনের অন্য স্থানের কী অবস্থা?
স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমগুলো বলছে, রাজধানী বেইজিং এবং সাংহাইয়ে নির্দেশনা রয়েছে যে, যেসব বাসিন্দা ভাইরাস আক্রান্ত স্থান থেকে ভ্রমণ করে এসেছে তাদেরকে ১৪ দিন বাড়ির বাইরে বের না হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়ে যাতে ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকানো যায়।
উহান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার সব ধরণের ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। প্রধান প্রধান পর্যটন এলাকা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে যেমন বেইজিংয়ের ফরবিডেন সিটি এবং গ্রেট ওয়ালের এক অংশ। এছাড়া দেশের অন্যান্য এলাকায় বড় ধরণের প্রধান প্রধান অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে যার মধ্যে রয়েছে: সাংহাইয়ের ডিজনি রিসোর্ট সামযয়িকভাবে বন্ধ করা হচ্ছে। পাঁচটি শহরে বন্ধ করা হচ্ছে ম্যাকডোনাল্ডেসের রেস্টুরেন্ট। বৃহস্পতিবার, হুবেই প্রদেশের উত্তরাঞ্চলে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত এক রোগী মারা যায়- যা হুবেইয়ের বাইরে এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রথম মৃত্যু। পরে উহান থেকে দুই হাজার কিলোমিটার দূরের হেইলংজিয়াং প্রদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আরো একটি মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। এর আগে, যখন মৃতের সংখ্যা ১৭ ছিল, চীনের জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন বলে যে, এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃতদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী ছিল ৪৮ বছর বয়সী এবং বয়োজ্যেষ্ঠ ছিল ৮৯ বছর বয়সী। কিন্তু ১৭ জনের মধ্যে ১৫ জনই ছিল ৬০ বছরের বেশি বয়সী এবং অর্ধেকেরও বেশি অন্য রোগ যেমন পারকিনসন্স ডিজিস এবং ডায়াবেটিসে ভুগছিল। এদের মধ্যে মাত্র চার জন ছিল নারী।
বিশ্বের অবস্থা কী?
ফ্রান্সের স্বাস্থ্যমন্ত্রী অ্যাঙ্গনেস বুজিন বলেন, আক্রান্তদের মধ্যে ৪৮ বছর বয়সী একজন চাইনিজ বংশোদ্ভূতকে উহান থেকে ফিরে আসার পর বোরডক্সের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। দ্বিতীয় জন সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায়নি। তবে সে চীন থেকে ফিরে আসার পর প্যারিসের একটি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। মিস বুজিন বলেন, “ইউরোপে সংক্রমণের আরো অনেক ঘটনা সামনে আসবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।” শুক্রবার সন্ধ্যায় তিনি প্যারিসে আরো একজন আক্রান্ত হয়েছে বলে জানান। সিঙ্গাপুরে শুক্রবার তৃতীয় আরেক জন আক্রান্ত হওয়ার কথা নিশ্চিত করেছে। এই ব্যক্তি আক্রান্ত এক রোগীর ছেলে বলে জানানো হয়। একই দিনে নেপালে একজন আক্রান্ত হওয়ার কথা জানা যায়। থাইল্যান্ডে এ পর্যন্ত পাঁচ জন আক্রান্ত হয়েছে; জাপান, ভিয়েতনাম এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় দুই জন করে আক্রান্ত হয়েছে; এবং তাইওয়ানে একজন আক্রান্ত হয়েছে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডায় কেউ আক্রান্ত হয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ভাইরাসটিকে এখনো “আন্তর্জাতিক জরুরী অবস্থা,” বলে ঘোষণা করেনি কারণ বিশ্ব জুড়ে এখনো এতে আক্রান্তের সংখ্যা কম। “এটি এখনো বড় হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে,” বলেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক ডা. টেড্রোস আঢানম ঘেব্রেয়েসাস।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here