ভাইরাস আতঙ্কে কাঁপছে চিন

নিউজ ডেস্ক: করোনাভাইরাসের হানায় লাফিয়ে লাফিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে চিনে। সে দেশের জাতীয় স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব বলছে, রবিবার পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৫৬। গত ২৪ ঘণ্টায় ফের নতুন করে মৃত্যু হয়েছে ১৫ জনের। তাঁদের মধ্যে ১৩ জনই হুবেই প্রদেশের। শুধুমাত্র হুবেই প্রদেশেই এখনও পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৫২ জনের। অন্্য দিকে, সাংহাইয়ে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এক জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যাটাও বাড়ছে হু হু করে। এই সংখ্যাটা প্রায় দু’হাজার। গতকাল ছিল চিনা নববর্ষ। নতুন বছরের এই সময়টা উৎসবে সাজে গোটা দেশ। চিনে ফেরেন লক্ষ লক্ষ প্রবাসী। কিন্তু এ বারে কোথায় কী! রাস্তাঘাট জনশূন্য, দোকানপাট বেশির ভাগ সময়ই ঝাঁপ বন্ধ, সিনেমা হলে লোক নেই, ফাঁকা রেস্তরাঁ। ওষুধের দোকানগুলোয় শুধু লম্বা লাইন। আতঙ্কিত চিন দিশাহারা কী ভাবে এই ভাইরাস-হামলার মোকাবিলা করবে। গত কাল পর্যন্ত ১৩টি শহরকে ‘বন্দি’ করা হয়েছিল। আজ সেই সংখ্যাটা আরও বাড়ানো হল। মোট ১৮টি শহর এখন ‘তালাবন্ধ’। আটক অন্তত ৫ কোটি ৬০ লক্ষ বাসিন্দা। পরিবহণ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়ে বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে ওই শহরগুলোর। বেশ কিছু গাড়ি বন্দি শহরগুলো ছেড়ে বেরনোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ব্যর্থ হয়। মাঝপথ থেকে ইউ-টার্ন করে ফিরে যেতে হয় তাদের। কড়া পাহারা। এক পুলিশকর্তা বলেন, ‘‘কেউ পালাতে পারবেন না।’’ চিন এখনও সরকারি ভাবে ঘোষণা না করলেও ‘জরুরি অবস্থা’ জারি করে দিয়েছে হংকং।
কিন্তু এত সব করেও মৃত্যুমিছিল থামছে না। এ পর্যন্ত চিনে মৃত ৪১ জনেরই মৃত্যু হয়েছে নিউমোনিয়ার মতো উপসর্গ নিয়ে। এর মধ্যে ৩৯ জনই হুবেই প্রদেশের বাসিন্দা। সরকারি নির্দেশ মেনে বিমানবন্দর, রেল স্টেশন, বাস স্ট্যান্ডগুলোয় নজরদারি শিবির তৈরি করা হয়েছে। কারও মধ্যে এতটুকু নিউমোনিয়ার মতো উপসর্গ দেখা গেলেই তাঁকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। চিকিৎসক-নার্সদেরও সাবধান থাকতে বলা হয়েছে। সব সময় মাস্ক পরে থাকতে বলা হচ্ছে তাঁদের। শ্বাসপ্রশ্বাসে এই রোগ ছড়ায়। ফলে সব চেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে কাজ করতে হচ্ছে তাঁদের। ইতিমধ্যেই হুবেই প্রদেশ থেকে এক চিকিৎসকের মৃত্যুর খবর মিলেছে। শনিবার তিনি মারা যান। মৃত ৬২ বছর বয়সি লিয়াং উডং শিনহুয়া হাসপাতালের শল্যচিকিৎসক ছিলেন। ভাইরাসের উৎসস্থল উহান শহরের একটি হাসপাতালে তাঁকে পাঠানো হয়েছিল। গত সপ্তাহে তিনি সংক্রমিত হন। এই প্রথম ভাইরাস-হানায় কোনও চিকিৎসকের মৃত্যুর খবর মিলল।
চিনের সরকারি সংবাদমাধ্যম শনিবার জানিয়েছে, উহান শহরে সেনাবাহিনীর চিকিৎসক মোতায়েন করা হয়েছে। তাঁরা স্থানীয় হাসপাতালের চিকিৎসকদের সাহায্য করছেন। এর পাশাপাশি উহানে হাজার-শয্যার একটি বিশেষ হাসপাতাল তৈরি করা হচ্ছে। দশ দিনের মধ্যে ২৫ হাজার বর্গফুটের হাসপাতালটি নির্মাণ করতে ডজনখানেক কর্মী দিনরাত এক করে কাজ করে যাচ্ছেন। রোগের উৎস বলে সন্দেহ করা হচ্ছে সি-ফুড ও মাছ-মাংসের বাজারকে। অভিযোগ বিভিন্ন ধরনের বন্যপ্রাণীর মাংস বেআইনি ভাবে বিক্রি করা হত এই সব বাজারে। সব চেয়ে বেশি সন্দেহ, কালাচ ও কোবরা থেকে নোভেল করোনাভাইরাস ছড়িয়েছে। এখানেই প্রশ্ন উঠছে, ২০০২-২০০৩ সালে সার্সের অভিজ্ঞতার পরেও কী ভাবে এক পরিস্থিতি। সার্সও একই ভাবে বুনো জন্তু-জানোয়ার খাওয়া থেকেই ছড়িয়েছিল চিনের গুয়াংঝৌয়ে। সাড়ে আটশো লোক মারা গিয়েছিলেন সে বার। চিনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অভিযোগ, তাদের খাদ্যাভাসের জন্য বহু প্রজাতির প্রাণী নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। এ বারের ভাইরাস হানার পরে বন্যপ্রাণী নিয়ে ব্যবসায় কড়া নিয়ন্ত্রণের কথা ঘোষণা করেছে বেজিং সরকার।
ইতিমধ্যেই এই ভাইরাস চিনের গÐি ছাড়িয়ে পৌঁছে গিয়েছে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, নেপাল, মালয়েশিয়ায়। সংক্রমণ ছড়িয়েছে ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া এবং আমেরিকাতেও। যে গতিতে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে চিনে, তা সামাল দিতে রীতিমতো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে সরকারকে। প্রেসিডেন্ট শি চিনফিং ‘গম্ভীর পরিস্থিতি’ আখ্যা দিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কী ভাবে এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায় প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে তা নিয়ে জরুরি বৈঠকও করেছেন শি। চিন প্রশাসন সূত্রে খবর, সংক্রমণ যাতে নতুন করে দেশের অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে না পড়ে তার জন্য ছোট ছোট দলে বিভিন্ন মেডিক্যাল টিম গঠন করে নজরদারি চালানো হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের সংখ্যা উহান ও হুবেই প্রদেশে। আরও বেশ কয়েকটি শহরেও দ্রæত গতিতে সংক্রমিত হচ্ছে এই ভাইরাস। ইতিমধ্যেই ১৮টি শহরকে নজরবন্দি করেছে চিন। চিনের জাতীয় স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, উহানের এই পরিস্থিতি সামাল দিতে ১২৩০ জনের ৬টি মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে। হুবেই প্রদেশে ছয় দিনের মধ্যে হাজার শয্যার হাসপাতাল তৈরি করে আক্রান্তদের চিকিৎসা চালানো হচ্ছে। হুবেই প্রদেশে আক্রান্তের সংখ্যা ৬৫৮। তাঁদের মধ্যে ৫৭ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here