গতকাল বইমেলায় প্রাণ পেল পহেলা ফাল্গুন

রনি অধিকারী : গতকাল ছিলো অমর একুশে গ্রন্থমেলার ১৩তম দিন। মেলা চলে সকাল ১১ টা থেকে রাত ৯ টা পর্যন্ত। গতকাল শুক্রবার বেলা ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত সেই শিশুপ্রহরে পুরো মেলা প্রাঙ্গণ ছিল শিশুদের পদচারণায় মুখরিত। বাবা-মায়ের হাত ধরে মেলায় আসা আয়মান জানালো, গতবছর সে মেলায় এসেছিল, বইমেলায় আসতে তার ভালো লাগে। বই পড়তে ভালো লাগে। আয়মানের বাবা মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, শিশুপ্রহরে অন্য অনেক বাচ্চারা আসে। ওদের দেখে আয়মান খুশি হয়, বইকেনে, বই দেখে। এটা আমাদের কাছেও ভালো লাগে। মোহাম্মদপুর চিলড্রেন গার্ডেন স্কুলের শিক্ষার্থী বিবর্ত ভৌমিক মেলায় এসেছে বাবাকে নিয়ে, কিনেছে দীপু মাহমুদের লেখা ‘হাতির সাথি’, দেওয়ান আজিজের ‘নিনিয়া’সহ এক ডজন বই। সে জানালো, বইমেলার তার ঘুরতে ভালো লাগে। বই সে শুধু নিজের জন্য কিনছে না, বন্ধুদেরও উপহার দেবে। বিবর্তের বাবা সৌমেন ভৌমিক বলেন, সকালে মেলার শুরুতেই ওকে নিয়ে এসেছি। ঘুরে ঘুরে ওর পছন্দে বই কিনে দিয়েছি। কিন্তু ওর আরও কেনা চাই। মেলাপ্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, শিশু-কিশোরদের অনেকেই স্টলে স্টলে ঘুরে বই দেখছে, বাছাই করছে। আবার কেউ কেউ স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলিয়ে নিচ্ছে। কোনো কোনো অভিভাবক বাচ্চাদের নিয়ে সেলফি তোলায় ব্যস্ত। সিসিমপুর স্টলের পাশে দেখা গেল সিসিমপুরের চরিত্র ‘ইকরি’, ‘টুকটুকি’, ‘হালুম’দের সাথে খেলায় মেতেছে শিশুরা। তাদের উচ্ছ্বাস মোবাইলে ক্যামেরাবন্দি করছেন অভিভাবকরা। মেলার বিক্রেতা ও প্রকাশকরা বলেন, বইমেলা ছয় দিন আগে শুরু হলেও শিশুদের কোলাহলে শুক্রবারই যেন প্রাণ পেল। আর শিশুপ্রহরে বিক্রিও বেশ ভালো হয়েছে। চলন্তিকা বইঘরের বিক্রয়কর্মী ইকবাল হোসেন বলেন, মেলায় আজকে শিশুদের ভিড়। শিশুরা অভিভাবকদের নিয়ে স্টলে আসছে, বইয়ের পাতা উল্টেপাল্টে দেখেছ, প্রচ্ছদ আর ছবি দেখছে। বই পছন্দ হলে কিনে দেওয়ার জন্য অভিভাবকদের কাছে আবদার করছে। শিশুতোষ রচনার লেখক ও পঙ্খিরাজের প্রকাশক দেওয়ান আজিজ বলেন, শিশুপ্রহর উপলক্ষে আজকে বইমেলা প্রাণ ফিরে পেয়েছে। শিশুরা প্রচুর বই কিনছে। স্টল ঘুরে দেখছে। বইমেলার আগের দিনগুলোর তুলনায় আজকে বেশ ভালোই বিক্রি হচ্ছে। সিসিমপুরের বিক্রয় প্রতিনিধি ইমরান হোসেন বলেন, আজকে শিশু প্রহরের মেলা যেমন দেখছেন, এমনটাইতো আমরা আশা করি। আমাদের বিক্রিও ভালো। স্টলে এসে বাচ্চারা খুব খুশি। কেবল ছোটদের বই নয়, তাদের সঙ্গে আসা অভিভাবকদের কল্যাণে অন্যসব প্রকাশনীতেও বইপ্রেমীদের ভিড় আর বিক্রি বেড়েছে বলে জানান বিক্রয়কর্মীরা। কথা প্রকাশের বিক্রয়কর্মী ইয়াসিন রহমান বলেন, শিশুদের জন্য বই কেনার পাশাপাশি অভিভাবকরা অন্য সব স্টলেও ভিড় করছেন। সবমিলে অন্যদিনের তুলনায় আজ আমাদের বিক্রি ভালো। আশা করছি বিকেলে আরও বাড়বে।কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে বইমেলা প্রাঙ্গণ। বইমেলা বাঙালির প্রাণের মেলা, লেখক-পাঠক-প্রকাশকদের মিলন মেলা। মেলার পরিচ্ছন্ন-সুন্দর, বর্ণোজ্জ্বল থরে থরে সাজানো থাকে নতুন পাতার গন্ধে মোড়ানো নতুন নতুন বই। এ বই গ্রন্থ প্রেমিকদের যে শুধু বিমোহিত করে তাই নয়, এখানে এসে লেখক-পাঠক-প্রকাশকগণ পরস্পর ভাব বিনিময়ের সুযোগ পায়। বইমেলার অংশ হিসেবে এখানে অনুষ্ঠিত হয় নতুন প্রকাশিত বইয়ের উপর আলোচনা, বিখ্যাত লেখকদের আলোচনা। বইমেলা আনন্দমুখর পরিবেশ কর্মব্যস্ততার চাপে পড়ে আমাদের দেশে অভিভাবকগণ তাদের নিজেদের তাদের ছেলেমেয়েদের জন্য পছন্দের বই, প্রিয় লেখকদের বই কিনতে পারেন না। কিন্তু বইমেলার আয়োজনে তারাও নেন সময়, ছেলেমেয়েদের নিয়ে চলে আসেন বইমেলায়। বই কেনার সাথে সাথে বেড়ানোর আনন্দটাও তারা উপভোগ করেন। বইমেলার ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ পুররো বন্ধু-বান্ধবের সাথে দেখা হয়ে যাওয়া, জ্ঞানী-গুণীদের সান্নিধ্য লাভও কম আনন্দের নয়। আনন্দঘন ছোট ছোট অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বইমেলায় নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হয়। প্রতিদিনের আয়োজন সাংস্কৃতিক সন্ধ্যাও বইমেলার পরিবেশকে আনন্দমুখর করে রাখে। প্রতিবছর বইমেলাকে ঘিরে সহস্র বই প্রকাশিত হয়। নতুন নতুন বইয়ের গন্ধে পুলকিত হয় পাঠকের মন। মুজিববর্ষ উপলক্ষে এবারের বইমেলা উৎসর্গ করা হয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। আলোচনা পর্ব থেকে সাজসজ্জা- বইমেলার সবকিছুতেই গুরুত্ব পাবেন বঙ্গবন্ধু। এবার স্মরণকালের সবচেয়ে বড় আকারে বইমেলা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। মেলার আয়তন সাড়ে আট লাখ বর্গফুট। মেলায় সৃজনশীল প্রকাশনা সংস্থাগুলো থাকবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে। যেখানে ৪৩৪টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে ৬৯৮টি ইউনিট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বাংলা একাডেমি অংশে ১২৬টি প্রতিষ্ঠানকে ১৭৯টি ইউনিট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সব মিলে ৫৬০টি প্রতিষ্ঠানকে ৮৭৩টি ইউনিট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাংলা একাডেমিসহ ৩৩টি প্রকাশনা সংস্থাকে ৩৪টি প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এবারই প্রথম সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তৈরি করা হয়েছে লিটল ম্যাগ চত্বর। একই স্থানে শিশু চত্বরও করা হয়েছে। মেলা চলাকালীন শিশু প্রহর ঘোষণা হবে। এবারের মেলায় বাংলা একাডেমিসহ অংশগ্রহণকারী সব প্রতিষ্ঠান ২৫ শতাংশ কমিশনে বই বিক্রি করছে। মেলায় প্রবেশের জন্য বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে তিনটি পথ এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য ছয়টি পথ থাকছে। সে সঙ্গে থাকছে লেখক বলছি, গ্রন্থ উন্মোচনের আয়োজন। প্রাঙ্গণ এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রায় তিন লাখ বর্গফুট জায়গায় এখন চলছে হাতুড়ি-পেরেকের ঠোকাঠুকি, রং-ব্রাশের মাখামাখি। নির্মাণ, সাজগোজের এই কর্মযজ্ঞের উপলক্ষ একটিই বইয়ের মেলা।
প্রতিদিন সন্ধ্যায় থাকে কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ, আবৃত্তি এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। উপন্যাসে বঙ্গবন্ধু গ্রন্থে লেখক মিল্টন বিশ্বাস বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কেন্দ্র করে যত উপন্যাস রচিত হয়েছে, সবকটিকেই আলোচনায় রেখেছেন। মিল্টন বিশ্বাস আলোচিত উপন্যাসগুলোর প্রতিটিতে সময় ও সমকালীন রাজনীতির ঘটনাক্রমের সঙ্গে তুলনা করেছেন। এসব উপন্যাসে ঔপন্যাসিকগণ কাহিনি নির্মাণের জন্যে ভাষা এমনকি উপভাষা আর সংলাপের ক্ষেত্রে যে মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছে, তা আলোচনা করেছেন। উপন্যাসের কাহিনি উপস্থাপনায় প্রথাগত রীতির বাইরেও নানা পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে এবং কখনো ইতিহাসের উপকরণের হুবহু বর্ণনা, কখনো আবার আত্মজৈবনিক কৌশল কিংবা নিজের অনুভ‚তির প্রসারণ ঘটেছে আখ্যান বুননে। আলোচকবৃন্দ বলেন, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখিত উপন্যাসগুলোকে শৈল্পিক ও ঐতিহাসিক দুটি দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখার অবকাশ রয়েছে। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের ইতিহাস সমার্থক। তিনি হলেন সেই মহামানব যাঁর মধ্যদিয়ে আমরা স্বদেশকে উপলব্ধি করতে পারি। বাংলার ইতিহাসের এই মহান নেতাকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রেখে উপন্যাসের ভাষ্য নির্মাণ এবং সব ধরনের শিল্প মাধ্যমে তাঁর গৌরবগাথা তুলে ধরা একান্ত প্রয়োজন।
প্রতিদিন বইমেলা খোলা থাকবে বেলা ৩টা থেকে রাত ৯টা, ছুটির দিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা এবং ২১ ফেব্রæয়ারি সকাল ৮টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here