রাখাইন গভীর সমুদ্র বন্দর চীন বিনিয়োগ করছে ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার

নিজস্ব প্রতিবেদক: মায়ানমারের রাখাইন গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণে চীন প্রথম পর্যায়ে ছয় বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করছে। এরমধ্যে চীন মায়ানমারকে ২ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার নগদ দিয়েছে। নিজস্ব বাণিজ্যিক স্বার্থে ভারতও রাখাইন গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণে মায়ানমারকে ৭শ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দিয়েছে।
রাখাইন গভীর সমুদ্র বন্দরে ২১ মিটার গভীরতার জাহাজ ঢুকতে পারবে। বিশ্বের বৃহত্তম আধুনিক ও সবচেয়ে বেশি গভীরতার জাহাজ অনায়াসেই এখানে ঢুকবে। এই বন্দরে নয়টা টারমিনাল থাকবে। এই গভীর সমুদ্র বন্দর দৈনিক ১ হাজার ৮শ থেকে ২ হাজার কিউসি পণ্য হ্যান্ডেল করবে। চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর দৈনিক সর্বোচ্চ ২শ কিউসি পন্য হ্যান্ডল করতে পারছে। এই গভীর সমুদ্র বন্দর দিয়ে যে আমদানী-রফতানী পণ্য হ্যান্ডেল করা হবে তার ষাট থেকে সত্তর শতাংশই হবে চীনের। বাণিজ্যিক স্বার্থের চেয়েও অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ভারত মহাসাগরে চীনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা। এ উদ্দেশ্যে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণে চীন আগ্রহী হয়। কিন্তু এর প্রবল বিরোধী ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ভারত মহাসাগরে চীনা কর্তৃত্ব ও আধিপত্য যাতে প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে মুলত সে উদ্দেশ্যেই চীনের আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতায় সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের বিপক্ষে অবস্থান নেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে পাশে টেনে নেয়।
শ্রীলঙ্কার সর্ববৃহৎ গভীর সমুদ্র বন্দর হাম্বানটোটা, কলম্বো গভীর সমুদ্র বন্দর, এখানে ছয়টি টারমিনাল নির্মাণ, পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা চীনের হাতে। পাকিস্তানের গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ ছাড়াও শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মালদ্বীপের সমুদ্র মুলত চীনের নিয়ন্ত্রণে। ভারত মহাসাগরে চীনের আধিপত্য রোধ করতেই যুক্তরাষ্ট্র নানাভাবে চেষ্টা করছে। মায়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর সেখানকার কর্তৃপক্ষ, সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি কঠোর অবস্থান নিয়েছে। রাখাইন গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ করতে চীনা প্রস্তাবে মায়ানমার কর্তৃপক্ষের সম্মতিই এর কারণ বলে ক‚টনৈতিক মহল মনে করেন। চীন সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণে প্রয়োজনীয় আর্থিক ও কারিগরি সহায়তার প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে এসেছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, ভারতের আপত্তির কারণে সরকারকে সোনাদিয়া প্রকল্প থেকে সরে আসতে হয়। নিরুপায় হয়ে চীনও রাখাইনে যায়। অপরদিকে সরকার মুলত ভারতকে সন্তুষ্ট করতে বঙ্গোপসাগরে উনিশটি নেভিগেশনাল রাডার স্থাপনের সুবিধা ভারতকে দিয়েছে। চীনের ডুবোজাহাজের চলাচল আনাগোনা সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা যাবে এর মাধ্যমে। যুক্তরাষ্ট্রও ভারতের কাছ থেকে এ তথ্য পাবে।
এদিকে চীন ও ভারতের আমদানী-রফতানী পণ্য দ্রæত পরিবহনের সুবিধার্থে বাংলাদেশ চট্টগ্রাম মোহনায় ১৪টি টারমিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে। এইসব টারমিনাল হয়েই রাখাইন সমুদ্র বন্দরে চীনা ও ভারতীয় পণ্য পরিবহন করা হবে। রাখাইন গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ কাজের সাথে সমন্বয় রেখেই মোহনায় টারমিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। টারমিনাল নির্মাণে সৌদি আরব, সিঙ্গাপুর, আরব আমিরাতের সঙ্গে সরকারের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে। চীন ও ভারতকে এতে বাংলাদেশকে আর্থিক সহযোগিতা করবে বলে জানা যায়।
রাখাইন থেকে আট কিলোমিটার দূরত্বে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর। চট্টগ্রাম মহিসোপানে ও রাখাইন গভীর সমুদ্রবন্দরে মাদার ভেসেল থেকে ছোট ছোট কার্গোজাহাজে করে চীনে এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়সহ বিভিন্ন রাজ্যে পণ্য পরিবহন করা হবে। গার্মেন্টস, ইলেকট্রনিক্স, চামড়া জাত সামগ্রীসহ ইউরোপ, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রের চাহিদার বৃহত্তম অংশ চীন এককভাবে সরবরাহ করে থাকে। মাল্টা প্রণালীর দীর্ঘপথ ঘুরে যেতে হয় বলে সময় লাগে বেশি, খরচও পড়ে অনেক বেশি। সমুদ্র পথে দ্রæত, স্বল্প সময়ে পণ্য পরিবহন করা সম্ভব হবে বলে চীনা পন্যের দামও অনেক কমে আসবে। আন্তর্জাতিক বাজারের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে চলে আসবে। সেই সাথে মায়ানমার, বাংলাদেশও লাভবান হবে।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here