ভারত জুড়ে জনতার স্বতঃস্ফূর্ত কার্ফু

নিউজ ডেস্ক: একশো ত্রিশ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার একটা দেশে সব মানুষকে যেন গতকাল রাস্তাঘাট থেকে বেমালুম সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, মুছে ফেলা হয়েছে স্বাভাবিক জনজীবনের প্রতিটি ছোটখাটো চিহ্ন। বিধ্বংসী করোনাভাইরাসের মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আহŸানে এভাবেই গতকাল ‘জনতা কারফিউ’ পালন করছে সারা দেশ। ভারতীয়দের গতকাল রবিবার সকাল সাতটা থেকে রাত ন’টা পর্যন্ত টানা চোদ্দ ঘন্টা কঠোরভাবে বাড়ির ভেতরে থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। আর স্বেচ্ছা গৃহবন্দিত্বের এই সময়কালটুকু বর্ণনা করতে তিনি নিজেই চয়ন করেছেন এই ‘‘জনতা কারফিউ’’ শব্দটি। অত্যাবশ্যকীয় বিভাগের সেবাকর্মীরা ছাড়া কেউ যেন এই কারফিউ-র মধ্যে বাইরে না-বেরোয়, সেটা নিষেধ করেছেন। শুধু তা-ই নয়, গতকাল রবিবার ঠিক বিকেল পাঁচটায় নিজেদের বাড়ির দরজা বা জানালার সামনে এসে কিংবা ব্যালকনিতে বেরিয়ে সজোরে হাততালি দিয়ে, শঙ্খনাদ করে, দরকারে থালা-বাসন বাজিয়ে সম্মিলিতভাবে কলতান সৃষ্টিরও অনুরোধ করেছিলেন তিনি। করোনাভাইরাস সঙ্কট সামলানোর চেষ্টায় যে স্বাস্থ্যকর্মীরা ও আপৎকালীন পরিষেবা বিভাগের লোকজন নিরলস পরিশ্রম করে চলেছেন, তাদের সারা দেশের পক্ষ থেকে অভিবাদন ও কৃতজ্ঞতা জানাতেই এই সমবেত করতালি আর শঙ্খনাদের আয়োজন। অনেকে বলছেন, স্পেনে যেভাবে স¤প্রতি জরুরি বিভাগের কর্মীদের সারা দেশ একটা নির্দিষ্ট সময়ে হাততালি দিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছে-ঠিক সেটার অনুকরণেই ভারতেও প্রধানমন্ত্রী মোদী এই পদক্ষেপ নিয়েছেন। করোনা সংক্রমণ আটকাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ডাকে সারা দিয়ে গতকাল রবিবার সকাল ৭টা থেকেই দেশ জুড়ে জনতা কার্ফু শুরু হয়। মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু, পশ্চিমবঙ্গ, গুজরাত, রাজস্থান সমস্ত রাজ্যেই সকাল থেকে রাস্তাঘাট একেবারে শুনশান। গতকাল জনতা কার্ফু শুরুর আগে সকালেই প্রধানমন্ত্রী টুইট করেন, “আর কিছু ক্ষণের মধ্যেই ’জনতাকার্ফু শুরু হবে। সবাইকে এতে অংশ নিতে অনুরোধ জানাচ্ছি, যা কোভিড ১৯-এর বিরুদ্ধে লড়ার শক্তি জোগাবে। এই পদক্ষেপটাই আগামী দিনে আমাদের সাহায্য করবে। বাড়িতে থাকুন এবং সুস্থ থাকুন। ;ইন্ডিয়াফাইটসকরোনা।”
চোদ্দ ঘন্টার ‘জনতা কারফিউ’ করোনাভাইরাস ছড়ানো রোখার ক্ষেত্রে ‘চেইন’-টা ভাঙতে পারবে কি না, তা নিয়েও ভারতে শুরু হয়েছে তর্কবিতর্ক। কেউ কেউ বলছেন, এটা একটা দারুণ পদক্ষেপ-আবার কারও মতে এত অল্প সময়ে আসলে তেমন কিছুই হবে না। সোশ্যাল মিডিয়াতে অনেকেই আবার মন্তব্য করছেন, ভারত অবধারিতভাবে একটা সম্পূর্ণ লকডাউনের দিকে এগোচ্ছে-তার আগে গতকাল রবিবারের এই জনতা কারফিউ আসলে একটা মহড়া বা ‘ড্রেস রিহার্সাল’! তবে এটা ঠিক, ‘সামাজিক দূরত্ব’ বজায় রাখার প্রশ্নে কিংবা নিজেকে ঘরে আটকে রাখার প্রশ্নে মাত্র কদিন আগেও ভারতজুড়ে যে এক ধরনের গা-ছাড়া মনোভাব দেখা যাচ্ছিল, গতকালকের জনতা কারফিউ সেই মানসিকতাকে সমূলে আঘাত করেছে। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া দেশের ভেতরেও এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সফর করার যে কোনও দরকার নেই-সরকার সেটা বার্তা দিয়ে দেশবাসীকে বুঝিয়ে দিয়েছে।
সারা ভারতের ‘লাইফলাইন’ বলে ধরা হয় যে ভারতীয় রেলকে, তারাও গতকাল জনতা কারফিউ-র দিনে কোনও যাত্রীবাহী ট্রেন চালাচ্ছে না। শুধু যে দূরপাল্লার ট্রেনগুলো গতকালই রওনা দিয়েছে, সেগুলো চলছে-তবে মাঝের কোনও স্টেশনে যাত্রাবিরতি ছাড়াই। ওদিকে ইন্ডিগো, গো-এয়ার, ভিস্তারার মতো ভারতীয় এয়ারলাইনগুলো সারাদিনের বহু ফ্লাইট বাতিল করেছে। দিল্লি বা ব্যাঙ্গালোরের মতো শহরে থেমে গেছে মেট্রো রেলের চাকাও। বড় বড় মেট্রো শহরের বহুতল আবাসনগুলোতেও লক্ষ লক্ষ মানুষ স্বেচ্ছায় নিজেদের ঘরের ভেতর আটকা পড়ে আছেন। সব সময় গম গম করা এই সোসাইটিগুলোতে গতকাল ছিল অদ্ভুত নিস্তব্ধতা-দোকানপাট বন্ধ, পার্কে পর্যন্ত বাচ্চারা খেলছে না।। সকালে খবরের কাগজ বা দুধের প্যাকেটও বিলি করা হয়েছে ভোরের আলো ফোটার অনেক আগেই। কিন্তু এই সব আয়োজন কি মাত্র এক দিনের জন্য, না কি আগামীতে এরকম আরও প্রলম্বিত ‘জনতা কারফিউ’-র জন্য মানুষকে প্রস্তুত থাকতে হবে, ভারত তা এখনও ঠাহর করে উঠতে পারছে না।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here