আমেরিকা জ্বলছে, বিক্ষোভের মুখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লুকিয়ে ছিলেন বাঙ্কারে

0
59

নিউজ ডেস্ক: জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে হোয়াইট হাউসের বাইরে যে বিক্ষোভ হয়েছে তাতে নাইন-ইলেভেন হামলার পর প্রথমবারের মত আমেরিকান প্রেসিডেন্টের বাসভবনের জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।হোয়াইট হাউসের ঘনিষ্ঠ একজন রিপাবলিকান সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্কাই নিউজকে জানিয়েছেন হোয়াইট হাউসের বাইরে বিক্ষোভের দৃশ্য মি. ট্রাম্পকে বিচলিত করে দিয়েছে। মি. ট্রাম্পকে তড়িঘড়ি বাঙ্কারে সরিয়ে নেবার জন্য গোয়েন্দা দপ্তরের এই আকস্মিক পদক্ষেপ থেকে হোয়াইট হাউসের ভেতর অস্বস্তির বিষয়টি পরিস্কার হয়েছে। ২৫ মে মিনিয়াপোলিসে কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডকে পা দিয়ে গলা টিপে খুন করা হয়। পুলিশি অত্যাচারের সেই ছবি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে দুনিয়া জুড়ে। সেই ঘটনার পর ছ’দিন কেটে গিয়েছে। এখন পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসা দূর অস্ত, বরং গোটা মার্কিন মুলুক জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে প্রতিবাদের আঁচ। দেশের অন্তত ১৪০টি শহরে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে প্রতিবাদের আগুন। একাধিক শহরে বিক্ষোভ হিংসাত্মক চেহারা নিয়েছে। অন্তত পাঁচ জনের মৃত্যুও হয়েছে।
জর্জ ফ্লয়েডের খুনের প্রতিবাদে বিক্ষোভ-অশান্তি আরও ছড়িয়ে পড়ছে আমেরিকা জুড়ে। বিক্ষোভকারীরা পৌঁছে গিয়েছেন হোয়াইট হাউসের দোরগোড়া পর্যন্ত। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কিছুক্ষণের জন্য বাঙ্কারেও ঢুকে পড়তে হয়। চলছে গোটা আমেরিকা জুড়ে। প্রতিদিন নতুন নতুন শহরে ছড়াচ্ছে বিক্ষোভের আগুন। ২৫ মে মিনিয়াপোলিসে কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডকে পা দিয়ে গলা টিপে খুন করা হয়। পুলিশি অত্যাচারের সেই ছবি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে দুনিয়া জুড়ে। সেই ঘটনার পর ছ’দিন কেটে গিয়েছে। এখন পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসা দূর অস্ত, বরং গোটা মার্কিন মুলুক জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে প্রতিবাদের আঁচ। দেশের অন্তত ১৪০টি শহরে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে প্রতিবাদের আগুন। একাধিক শহরে বিক্ষোভ হিংসাত্মক চেহারা নিয়েছে। অন্তত পাঁচ জনের মৃত্যুও হয়েছে। আগে থেকেই হোয়াইট হাউসের কাছাকাছি এলাকায় প্রতিবাদীদের বিক্ষোভ প্রদর্শন চলছিল। পরিস্থিতি ঘোরাল হয়ে উঠতে পারে এই আঁচ করে শুক্রবার রাতেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আন্ডারগ্রাউন্ড বাঙ্কারে সরিয়ে নিয়ে যান নিরাপত্তারক্ষী ও গোয়েন্দারা। ঘণ্টাখানেকের জন্য বাঙ্কারে ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এর পর হোয়াইট হাউসের কাছাকাছি এলাকায় ফের প্রতিবাদ দেখান বিক্ষোভকারীরা। আগুন জ্বালিয়ে চলে বিক্ষোভ প্রদর্শন। পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তিতেও জড়িয়ে পড়েন তাঁরা। দেশ জুড়েই কোথাও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ চলছে। কোথাও ঘটছে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুঠপাটের মতো ঘটনাও। পুলিশের সঙ্গে মারপিটেও জড়িয়ে পড়ছেন বিক্ষোভকারীরা। নিউ ইয়র্ক, শিকাগো, ফিলাডেলফিয়া এবং লস অ্যাঞ্জেলসের মতো শহরে পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক ধস্তাধস্তিতে জড়িয়ে পড়েন বিক্ষোভকারীদের একাংশ। কোথাও পুলিশের গাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ডেট্রয়েট, ইন্ডিয়ানাপোলিসে। সেখানে গুলি চালানোর মতো ঘটনা ঘটেছে বলে জানাচ্ছে ওয়াশিংটন পোস্ট সংবাদপত্র। তারা জানাচ্ছে, অন্তত পাঁচ জনের মৃত্যু হয়েছে। লস অ্যাঞ্জেলেস, ওয়াশিংটন, শিকাগো, মায়ামি, নিউ ইয়র্কের মতো দেশের অন্তত ৪০টি শহরে জারি করা হয়েছে কার্ফু। কিন্তু তা উপেক্ষা করেই পথে নেমেছেন মানুষ।
অনেকেই বলছেন, বর্ণবিদ্বেষের প্রতিবাদে এমন বড়সড় আন্দোলন ১৯৬৮-তে মার্টিন লুথার কিংয়ের মৃত্যুর পর আর দেখেনি আমেরিকা। সারা দেশ জুড়ে করোনাভাইরাসের আতঙ্ক রয়েছে। কিন্তু তার মধ্যেই বহু জায়গায় লকডাউন না মেনে পথে নেমেছেন মানুষ। তাঁরা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিধিও তোয়াক্কা করছেন না। করোনার প্রকোপে কিছু দিন আগেই বহু রাস্তা কার্যত জনমানবহীন হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর ঘটনার পর সেখানে পথে নেমেছেন প্রতিবাদীরা। কৃষ্ণাঙ্গদের উপর পুলিশি জুলুমের অভিযোগ নিয়ে আমেরিকায় ধিকি ধিকি আগুন জ্বলছিলই। ফ্লয়েডের মৃত্যু তাতে আরও ইন্ধন জুগিয়েছে।
দেশের একাধিক জায়গায় এই সুযোগে লুঠপাটের ঘটনাও ঘটেছে। ফিলাডেলফিয়া, স্যান্টা মনিকা, ক্যালিফোর্নিয়ার মতো কিছু জায়গায় লুঠপাটের ঘটনা ঘটেছে। এই পরিস্থিতিকে অনেকে ২০১১ সালে ঘটে যাওয়া ‘লন্ডন হিংসা’র সঙ্গে তুলনা টেনেছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে অন্তত আটটি প্রদেশে নামানো হয়েছে পাঁচ হাজার ‘ন্যাশনাল গার্ড’। রবিবার সন্ধ্যার পর থেকে ঘটনাস্থল মিনিয়াপোলিসের প্রায় সব রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এই প্রথম বার প্রদেশে ন্যাশনাল গার্ডের পুরো বাহিনীই এখন রাস্তায়। চার হাজার জনকে ইতিমধ্যেই গ্রেফতার করা হয়েছে। অভিযোগ, বিক্ষোভ ঠেকাতে দেদার লাঠিচার্জের পাশাপাশি রবার-প্লাস্টিক বুলেট, কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটিয়েছে পুলিশ।মিনিয়াপোলিস প্রশাসনের দাবি, ঝামেলা পাকাচ্ছে বহিরাগতেরাই। ট্রাম্প দুষছেন অতি-বাম চরমপন্থীদের। অতি-বাম গোষ্ঠী ‘অ্যান্টিফা’-কে ‘জঙ্গি সংগঠন’ বলে ঘোষণা করেছেন তিনি। বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, বর্ণবিদ্বেষের আগুন জ্বলছিলই, করোনায় বঞ্চনার ছবি আরও স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। বেকারত্বের জ্বালা বাড়তি ঘি ঢেলেছে আগুনে।
কে এই জর্জ ফ্লয়েড?
যে জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যু নিয়ে উত্তাল আমেরিকা, সেই জর্জ ফ্লয়েডের ওপর পুলিশি নির্মমতার ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায় নিঃশ্বাস নেবার জন্য হাঁসফাঁস করছেন তিনি। তাকে মাটিতে শুইয়ে তার গলার ওপর নিজের হাঁটু দিয়ে চেপে ধরেছেন একজন শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসার। জর্জ ফ্লয়েড বারবার বলেছেন, “আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।” জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুতে ব্যাপক প্রতিবাদের পর শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে এখন হত্যার মামলা আনা হয়েছে।পুলিশি নির্মমতায় জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যু আমেরিকা জুড়ে প্রতিবাদের ঢেউ তুলেছে যা ছড়িয়ে পড়েছে ইউরোপেও। কিন্তু কে এই কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান তরুণ যার মৃত্যুর ঘটনায় আমেরিকা জুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। টেক্সাসের হুস্টনে বড় হয়ে ওঠেন জর্জ ফ্লয়েড শহরের কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত এলাকায়।
তার ৪৬ বছরের জীবন ছিল ভাল-মন্দের সংমিশ্রণ। খেলাধূলায় আগ্রহ ছিল জর্জের। তরুণ বয়সে হুস্টনে আমেরিকান ফুটবল খেলোয়াড় হিসাবে বেশ নামডাক হয়েছিল তার। ১৯৯২ সালে টেক্সাস স্টেট চ্যাম্পিয়ানশিপে রানার্স আপ হয়েছিল তার স্কুলের দল- ইয়েটস হাই স্কুল লায়ন্স। ১৯৯০এর দশকে হুস্টনে হিপহপ সঙ্গীত গোষ্ঠির সদস্য হিসাবেও তিনি বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু দারিদ্র, বর্ণবৈষম্য, এবং অর্থনৈতিক অসাম্য তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সামাজিক বঞ্চনার শিকার বহু আফ্রিকান আমেরিকান তরুণের মত জর্জ ফ্লয়েডও জড়িয়ে পড়েন গোষ্ঠি সহিংসতা, এবং আফ্রিকান আমেরিকান গোষ্ঠির বাসস্থানের সংকট নিয়ে নানা সামাজিক আন্দোলনে। তার ছেলেবেলার বন্ধুরা বলেছেন বিশাল দীর্ঘদেহী ছিলেন জর্জ ফ্লয়েড। ছয় ফুট ছয় ইঞ্চি উচ্চতার জর্জ একজন প্রতিভাবান অ্যাথলেট ছিলেন। তার বন্ধুরা বলেছেন আমেরিকান ফুটবল আর বাস্কেটবলে তিনি তুখোড় ও দক্ষ খেলোয়াড় ছিলেন। তার এক বাল্যবন্ধু জনাথান ভিল বলেছেন, “এত লম্বা কাউকে আমি দেখিনি। ১২ বছর বয়সে জর্জ ছয় ফুট দুই ইঞ্চি লম্বা ছিল।” তার বর্ণনায় জর্জ ছিলেন, “দৈত্যকায় নরম মনের মানুষ।”
জর্জ ফ্লয়েডের জীবন সাফল্য ও ব্যর্থতার এক করুণ ইতিহাস।
সিএনএন বলছে জর্জ ফ্লয়েড যখন পরে ফ্লোরিডা স্টেট কলেজে পড়তে যান, তখন ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৫ তিনি স্কুলের বাস্কেটবল দলে ফ্লোরিডা রাজ্যের তরুণ টিমে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। পরে তিনি আবার ফিরে যান হুস্টনে তার স্কুলের শেষ বছরে, এরপর টেক্সাস এ অ্যান্ড এম ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলেও তিনি ডিগ্রি কোর্স শেষ করেননি। এসময় জর্জ অপরাধ জগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। চুরি এবং অবৈধ মাদক রাখার অভিযোগে বেশ কয়েকবার তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০০৭ সালে সশস্ত্র ডাকাতির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং তাকে পাঁচ বছরের জন্য কারাভোগ করতে হয়। তবে জেল থেকে ছাড়া পাবার পর জর্জ নিজের জীবন শোধরাতে চেষ্টা করছিলেন। স্থানীয় এক গির্জার মাধ্যমে সামাজিক কাজে নিজেকে জড়ান তিনি। ২০১৭ সালে তিনি তরুণদের সহিংসতা বন্ধের ডাক দিয়ে একটি ভিডিও তৈরি করেন, যে ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হয়। তিনি তরুণদের উদ্দেশ্যে বলেন সহিংসতা ছেড়ে দিয়ে “ঘরে ফিরে এসো”, জানিয়েছেন তার সহপাঠী ও বন্ধু ক্রিস্টোফার হ্যারিস। “মি. ফ্লয়েড আবার নতুন করে জীবন গড়ে তোলার, নতুন করে বাঁচার সংগ্রাম শুরু করেছিলেন, তার প্রচেষ্টা নিয়ে তিনি খুশি ছিলেন,” আমেরিকার মিডিয়ায় বলেন মি. হ্যারিস। স্যালভেশন আর্মির একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানে তিনি নিরাপত্তা গার্ডের কাজ নিয়েছিলেন। পরে লরি চালকের কাজ নেন এবং একটি পানশালায় নিরাপত্তা কর্মীর কাজ করেন। সেখানে সবাই তাকে ডাকত ‘বিগ ফ্লয়েড’ বা দীর্ঘদেহী ফ্লয়েড নামে। কিন্তু করোনাভাইরাস মহামারি শুরু হবার পর পানশালা বন্ধ হয়ে যাবার ফলে বহু আমেরিকানের মত জর্জ ফ্লয়েডকেও ছাঁটাই করা হয়। যেদিন তাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে, যেদিন পুলিশের অত্যাচারের কারণে তাকে প্রাণ দিতে হয়, সেদিন পুলিশের অভিযোগ ছিল জর্জ ফ্লয়েড বিশ ডলারের একটা জাল নোট ব্যবহার করে সিগারেট কেনার চেষ্টা করছিলেন।

Share on Facebook