গো-খামারিদের পরিবারে চাপা কান্না

0
70

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি : পর পর তৃতীয়বারের মত এবারো কুষ্টিয়া অঞ্চলের গরু খামারি ও ব্যবসায়ীরা কোরবানীর গরু বিক্রিতে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কেউ লোকসানের মধ্যদিয়ে গরু বিক্রি করেছে, আবার কেউ গরু নিয়ে বাড়ি ফিরেছে। এই অঞ্চলের গরু খামারী ও গরু ব্যবসায়ী পরিবারের মধ্য চলছে চাপা কান্না। অনেকেরই রয়েছে ব্যাংকের চড়া সুদের ঋণ। গোখাদ্যের মূল্য বেশি হওয়ায় তারা কোরবানীর গরু ফেরত এনে পড়েছেন বিপাকে। এবার বিপর্যয়ের মূল কারণ হিসেবে স্থানীয়রা মিডিয়ার অপপ্রচারকে বেশি দায় করছেন।
গো-খামারি এবং ব্যবসায়ীদের মতে, দেশে বিগত ১০ বছরের বেশি সময় ধরে দেশে গরু মোটা তাজাকরণের মাধ্যমে পশু উৎপাদনে যে রেকর্ড তৈরি হয়েছিল, অসাধুপন্থায় মোটা তাজাকরণকারীদের বিরুদ্ধে প্রচারণার ধাক্কা সে রেকর্ডে আঘাত হেনেছে। তার ধাক্কা বিপর্যস্ত হয়েছেন সাধারণ গো-খামারিরাও।
কুষ্টিয়া জেলার সব উপজেলায় কম বেশি কোরবানীর গরু পালন হয়ে থাকে। বিশেষ করে সদর উপজেলা, মিরপুর ও কুমারখালী উপজেলায় বেশি গরু পালন করা হয়। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি রাজধানী ঢাকা, চট্রগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জ এলাকার কোরবানীর হাটগুলোর বড় একটি অংশ কুষ্টিয়া এলাকার গরুর দখলে থাকে।
এবারও ঢাকার হাটগুলোতে প্রতিবারের মত কুষ্টিয়ার গরুর প্রাধান্য ছিল। কিন্তু ঢাকার হাটগুলোতে ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর প্রচুর আমদানীর কারণেই কোরবানীর বাজারের মূল্য ক্রেতাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে, আর গো-খামারি ও ব্যবসায়ীরা পড়ে যায় বেকায়দায়।
এ অবস্থায় ছোট ও মাঝারি গরু বিক্রিতে ব্যবসায়ী ও গো-খামারিরা বাজার পরিস্থিতি দেখে বেশি লাভ না করেই বিক্রি করে দিয়েছে। অনেকেই ঈদের আগের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করে গরুর দাম না পেয়ে ট্রাকে গরু তুলে আবার বাড়িতে ফিরে এসেছেন।
হররা গ্রামের গো-খামারি মোজাম্মেল হোসেন জানান, ২৫টি গরু ঢাকায় নিয়েছিলেন। হাটের বেচা-বিক্রির অবস্থা দেখে লাভের আশা বাদ দিয়ে  গরুগুলো বিক্রি করে বাড়ি ফিরেছেন।
তিনি বলেন, ‘বাজারে এত বেশি গরুর আমদানীতে আমরা অবাক হয়েছি। কুষ্টিয়া অঞ্চল থেকে বড় এবং মাঝারি আকারের গরু বেশি গিয়েছিল ঢাকার হাটে। আমাদের প্রত্যাশা ছিল এবার গরুর আমদানী কম হবে আর বাজার দর ভাল পাবো কিন্তু সে আশার গুড়ে বালি।’
এবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন জেলার বড় বড় গরু নিয়ে গড়ে ওঠা কাজী খামারের মালিক কাজী শওকত।
তিনি জানান, অর্ধ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে তার। ১৪টি বিশালাকার গরু নিয়ে কোটি টাকায় বিক্রি করবেন এমন আশা নিয়ে বাড়ি থেকে ঢাকায় গিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ মুহুর্তে পানির দরে গরু বিক্রি করে বাড়ি ফিরেছেন।
তিনি আরো জানান, বিধিবাম এবারো হাটের অবস্থা বড় গরুর জন্য ছিল খুবই নাজুক, তাই শেষ মুহুর্তে লোকসানে বিক্রি করে বাড়ি ফিরেছেন। তিনি ব্যাংকের ঋণ ও স্থানীয় দেনা মেটাতে সর্বশান্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন।
স্থানীয় পশু সম্পদ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, শওকত কাজীর সবচেয়ে বড় গরুর ওজন ছিল ৪১ মন। এই গরুটি দেশের সর্ববৃহৎ গরু হিসেবে তিনি দাবী করেছিলেন। স্থানীয় ব্যাপারীরা গরুটির দাম চেয়েছিল ১৩ লাখ টাকা, ঢাকায় নিয়ে ১৮ লাখ টাকায় বিক্রি করবেন এমনই আশা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১০ লাখের অনেক কমে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন।
ঈদের পর এলাকায় ঘুরে ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি বাড়িতেই কৃষক এবং খামারিদের পরিবারের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে বিষন্নতা। পরিবারগুলোর সদস্যদের সাথে কথা বলে চাপা কান্নার সুর লক্ষ্য করা গেছে। এই কোরবানীকে ঘিরে এলাকার হাজার হাজার কৃষক পরিবারের মাঝে হাজারো স্বপ্ন ছিল কিন্তু কোরাবানীর হাটের বেচা বিক্রি মন্দার কারনেই সব স্বপ্নই যেন মুহুর্তে ভেঙ্গে গেছে।
এদের কারোর ব্যাংক ও এনজিওর ঋণ পরিশোধ, গো-খাদ্যের দোকানের বাকী মেটানো, ছেলে মেয়ের বিয়ে, সুন্নাতে খাতনাসহ পারিবারিক নানান সমস্যা মেটানো কিন্তু আজ সব কিছু শুধু স্বপ্নই থেকে গেল।
পরপর তিনবারের মত এলাকার কৃষক এবং গো-খামারিরা কোরবানীর পশু বিক্রিতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আগামী দিনগুলোতে এই গরু পালনে অনীহা প্রকাশ করেছেন অনেকে। আর সেই কারণে আগামী বছরগুলোতে এলাকায় কোরবানীর পশু আমদানী একেবারে শূন্যের কোটায় নেমে আসবে বলে অনেকে মনে করছেন।
মোজাম্মেল গো-খামারের মালিক নজরুল ইসলাম জানান, এবার ঢাকার গরুর হাটে ছোট এবং মাঝারী আকারের গরুর প্রচুর আমদানী ছিল। বড় গরুর কদর ছিল না। তাছাড়া মিডিয়াগুলোর অপপ্রচার বাজারে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাধারণ কৃষকেরা। তাই বড় গরুর মালিকেরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাছাড়া গরু-ছাগল বিক্রির অবস্থা দেখে মনে হয়েছে এবার ঢাকার মানুষেরা কোরবানী দিয়েছে কম।
তিনি জানান, কোরবানীর গরু কুষ্টিয়া অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি, সেই সঙ্গে বেকারত্ব দূরীকরণ ও স্বাবলম্বী হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করেছিল। সর্বশেষ অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানে কুষ্টিয়া জেলা দেশের মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছে। এসব কিছুর মূলে ছিল এই গরু শিল্প। পর পর তিনবার মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির কারণে এই শিল্প যেমন হুমকির মুখে পড়েছে।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here